অর্বাচীন ইউনূস নজরুল ইরানের কাছে শিক্ষা নিক!
ভিসার শর্ত অনুযায়ী দলকে ম্যাচের দিনই যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে হবে এবং একই দিনে দেশটি ত্যাগ করতে হবে। এত বাধা সত্ত্বেও ইরান খেলবে বিশ্বকাপে।বাংলাদেশ ক্রিকেট দল তার যোগ্যতায় ক্রিকেটের এই বিশ্ব আসরে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। কিন্তু অন্তর্র্বর্তী সরকার ইউনূসের ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত আসিফ নজরুল ঠুনকো অজুহাতে বিশ্বকাপ বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল
অদিতি করিম : শুরু হচ্ছে বিশ্বকাপ ফুটবলের মহাযজ্ঞ। দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ। তিন স্বাগতিক দেশে ৪৮ দলের অংশগ্রহণে এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল প্রেমীদের আগামী দেড় মাস বুঁদ করে রাখবে। সবকিছু ভুলে ফুটবল উন্মাদনায় মাতবে গোটা বিশ্ব।ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে কে জিতবে তার চেয়েও আমার আগ্রহ ইরানের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের দিকে। ইরান এখন যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ। মার্কিন, ইসরায়েলের হামলায় দেশটিতে মানবতার চরম লঙ্ঘন হচ্ছে। নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে শিশুদের। ধ্বংস করা হচ্ছে হাসপাতাল। হাজারো মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে আজ নিঃস্ব। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের একতরফা হামলায় সহস্রাধিক নিরীহ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তার পরও ইরান মাথানত করেনি।
যখন বিশ্বকাপ শুরু হচ্ছে তখনো ইরানে শুরু হয়েছে নতুন করে মার্কিন হামলা। এরকম একটা সময় ইরান শেষ পর্যন্ত ফুটবল বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করবে কি না তা নিয়ে অনেকেই সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। বিশেষ করে যখন বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ইরান সিদ্ধান্ত নেয় তারা বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করবে। ইরান সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়, এটা ফিফা বিশ্বকাপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নয়। তাই তারা খেলবে। ইরান বলেছে, এটা শুধু একটি খেলা নয়, দেশের মর্যাদা এবং সম্মানের স্মারক। বিশ্ব দেখবে ইরানের দেশপ্রেম এবং দেশের প্রতি ভালোবাসা। প্রতিটি খেলায় বাজবে ইরানের জাতীয় সংগীত, উড়বে জাতীয় পতাকা। সারা বিশ্বে ইরান তার প্রিয় মাতৃভূমির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে এই বিশ্ব আসরে অংশগ্রহণের মাধ্যমে।
কিন্তু আয়োজক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে রীতিমতো অবিচার করেছে। নজিরবিহীন আচরণ করা হচ্ছে ইরানের সঙ্গে। চলতি বছরের ১৬ জুন নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে শুরু হচ্ছে ইরানের বিশ্বকাপ অভিযান। তবে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও ভিসা জটিলতার কারণে উদ্বোধনী ম্যাচের মাত্র এক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাবে ইরান জাতীয় ফুটবল দল। ইরানি ফুটবল ফেডারেশনের মুখপাত্র আমির মেহদি আলাভি এক বিবৃতিতে জানান, ‘ফিফার নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, আমাদের পুরো দল একটি চার্টার্ড ফ্লাইটে করে যুক্তরাষ্ট্রে রওনা হবে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের মাত্র একদিন আগে আমরা আয়োজক শহরে পৌঁছাব। তবে পরবর্তী দুটি ম্যাচের জন্য আমরা খেলা শুরুর দুই দিন আগেই ভেন্যুতে উপস্থিত হব।’
বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার জন্য ইরানি ফুটবলাররা ভিসা পেলেও, দলটির এক ডজনেরও বেশি প্রশাসনিক ও ম্যানেজমেন্ট কর্মকর্তা মার্কিন ভিসা পাননি। ইরানের কোনো সমর্থক ভিসা পাননি। তারা মাঠে গিয়ে নিজেদের দলকে সমর্থন জানাতে পারবে না। চলমান এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের জের ধরে ইরান তাদের প্রাথমিক পরিকল্পনা বদলে অ্যারিজোনার টুসন শহরের পরিবর্তে মেক্সিকোর সীমান্তবর্তী শহর টিজুয়ানাতে বিশ্বকাপের মূল প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপন করেছে।
মেক্সিকোতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত শনিবার জানান, তাদের ভিসার শর্ত অনুযায়ী দলকে ম্যাচের দিনই যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে হবে এবং একই দিনে দেশটি ত্যাগ করতে হবে। এত বাধা সত্ত্বেও ইরান খেলবে বিশ্বকাপে। এটি হবে বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম আসর, যেখানে আয়োজক দেশ এমন একটি দেশের দলকে স্বাগত জানাবে যার সঙ্গে তারা যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে সর্বশেষ বার্তায় বলা হয়েছে, বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ ইরানের জন্য একটি গৌরবের বিষয়। তারা যেকোনো মূল্যে ইরানের স্বার্থে এই বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করবে। এতসব প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে ইরান বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছে। এটা ইরানের খেলোয়াড় এবং জনগণের দেশপ্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সারা বিশ্বের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
এবার চলুন বিশ্বকাপ ফুটবল থেকে বিশ্বকাপ ক্রিকেটে নজর দিই। গত ৭ ফেব্রুয়ারি ভারত এবং শ্রীলঙ্কার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্বকাপ ক্রিকেট। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল তার যোগ্যতায় ক্রিকেটের এই বিশ্ব আসরে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। এটা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য গর্বের। বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ কেবলমাত্র একটি টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ নয়, বরং দেশের সম্মান ও মর্যাদাকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরা। দেশের গৌরবের পতাকা উঁচিয়ে ধরা।
খেলার মাধ্যমে একটি জাতির ঐক্য এবং দেশপ্রেমের পরিচয় পাওয়া যায়। সব দেশ এই সুযোগ পায় না। বাংলাদেশ পেয়েছিল। কিন্তু তখন ক্ষমতায় ছিল ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্র্বর্তী সরকার। ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন ইউনূসের ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত আসিফ নজরুল। ঠুনকো এক অজুহাতে ইউনূস সরকার বিশ্বকাপ বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। যা ছিল আত্মঘাতী এবং দেশের স্বার্থের পরিপন্থি। ড. ইউনূস এবং তার ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ওপর এই হঠকারী সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছিল।
টাইগার পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তে বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জনগণের ছিল না। এটি ছিল ইউনূস এবং আসিফ নজরুলের মতো অর্বাচীনদের দেশের ক্রিকেট ধ্বংস করার জন্য একটি নিম্নমানের কাজ। অনেকেই মনে করেন, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন বানচালের জন্য এটা ছিল অন্তর্র্বর্তী সরকারের একটি ষড়যন্ত্রের অংশ। সস্তা ভারত বিরোধিতা উসকে দিয়ে তারা দেশের জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছিল। দেশে সৃষ্টি করতে চেয়েছিল বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি।বিসিসিবি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সরকারকে বোঝাতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আসিফ নজরুলের একগুঁয়েমির কারণে বোর্ড অসহায় হয়ে পড়ে। আর আসিফ নজরুলের পেছনে ছিল ড. ইউনূসের নীরব সমর্থন।
এখন ইরানের বিশ্বকাপ ফুটবলে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের বিশ্বকাপে না খেলার ইস্যুটি আবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আমাদের সামনে এখন তুলনা করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, ইরান যদি আক্রমণকারীর দেশে গিয়ে খেলতে পারে তাহলে বাংলাদেশকে কেন ভারতে খেলতে যেতে দেওয়া হলো না? এটা কি আদৌ দেশপ্রেম নাকি দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দেওয়া? বাংলাদেশে ক্রিকেট অত্যন্ত জনপ্রিয় খেলা। এই একটি খেলায় আমরা বিশ্বমান অর্জন করেছি। গত মঙ্গলবার দীর্ঘ একুশ বছর পর অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে বাংলাদেশ নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।
এরকম একটি সম্ভাবনাময় দলকে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করতে না দেওয়া শুধু ভুল নয়, অপরাধ। বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ডের নব নির্বাচিত সভাপতি তামিম ইকবাল বলেছেন, বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত ক্রিকেটের ক্ষতি করেছে। বিএনপি সরকার এ বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। ইরানের সিদ্ধান্তের পর বাংলাদেশ কেন বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করতে পারেনি তা তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কারা দেশপ্রেমের মুখোশ পরে দেশের ক্ষতি করেছে তা জানার অধিকার জনগণের আছে। ইউনূস সরকারের দেড় বছরে দেশপ্রেমের ফতোয়া দিয়ে দেশবিরোধী বহু কাজ হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অসম বাণিজ্য চুক্তি, দুর্নীতি দমনের নামে বেসরকারি খাতকে পঙ্গু করে দেওয়া এবং হামের টিকা কেলেঙ্কারি তার কিছু প্রমাণ মাত্র। দেশের মানুষ মনে করে, ইউনূস সরকারের দেড় বছরের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করার জন্য একটি বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন করা দরকার। দেশের কী কী ক্ষতি ইউনূস সরকার করেছে তা চিহ্নিত করা প্রয়োজন। যেন ভবিষ্যতে কেউ ক্ষমতা নিয়ে সবক্ষেত্রে এভাবে দেশের সর্বনাশ করতে না পারে।-অদিতি করিম একজন লেখক




