মেসি জাদুতে ফাইনালের পথে আর্জেন্টিনা
৭৯তম মিনিটে মেসির অ্যাসিস্টে একটি গোল শোধ দিলেন ক্রিস্টিয়ান রোমেরো। ৮৩ মিনিটে ম্যাচে সমতা নিয়ে এলেন মেসি নিজেই। মূলত, তখনই ‘লাইফলাইন’ পেয়ে যায় আর্জেন্টিনা, জেগে ওঠে মেসির বিশ্বকাপে টিকে থাকার সম্ভাবনাও।যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে লাওতারো মার্তিনেজের ক্রসে এনজো ফার্নান্দেজের হেড করে দেয় বাকি কাজটা ৩–২ গোলে
লাবণ্য চৌধুরী : মেসি জাদু বলে ২-০ গোল থেকে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে হয়ে গেল ৩-২ গোল। এই মেসি জাদুতে ফাইনালের পথে এখন আর্জেন্টিনা!এবার আর্জেন্টিনার জয়টা ছিল ঠিক এমনই অবিশ্বাস্য। প্লান্টি মিস করে হারতে হারতে রুখে দাড়াল মেসিরা। এ প্রত্যাবর্তনের গল্পটা মেসি নিজেই লিখে দিয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে গেল আর্জেন্টিনা। দুই গোলে পিছিয়ে পড়েও শেষ পর্যন্ত মিসরকে ৩-২ গোলের ব্যবধানে হারিয়েছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।মঙ্গলবার (৭ জুলাই) আটলান্টায় বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় ম্যাচটি শুরু হয়।
জয়সূচক গোল আসে ম্যাচের যোগ করা সময়ে। কাউন্টার অ্যাটাকে উঠে এসে লাউতারো মার্তিনেজের ক্রসে মাথা ছুঁইয়ে গোলটা করেন এনজো ফার্নান্দেজ।
৭৮ মিনিট পর্যন্ত ২–০ গোলে পিছিয়েছিল আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পথ ছিল মাত্র কয়েক মিনিট দূরে। এরপরই আর্জেন্টিনার দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন, আর তা মেসির হাত ধরেই।
৭৯তম মিনিটে মেসির অ্যাসিস্টে একটি গোল শোধ দিলেন ক্রিস্টিয়ান রোমেরো। ৮৩ মিনিটে ম্যাচে সমতা নিয়ে এলেন মেসি নিজেই। মূলত, তখনই ‘লাইফলাইন’ পেয়ে যায় আর্জেন্টিনা, জেগে ওঠে মেসির বিশ্বকাপে টিকে থাকার সম্ভাবনাও।যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে লাওতারো মার্তিনেজের ক্রসে এনজো ফার্নান্দেজের হেড করে দেয় বাকি কাজটা। ৩–২ গোলে জিতে আর্জেন্টিনা উঠে গেল কোয়ার্টার ফাইনালে।
শত বছরের রেকর্ড ভঙ্গ মেসির-
এবারে দলের ভীষণ প্রয়োজনের সময় দারুণ গোল করলেন লিওনেল মেসি। প্রায় শত বছর আগের এক কীর্তি স্পর্শ করলেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। দ্বিতীয় আর্জেন্টাইন ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপের এক আসরে আট গোল করলেন মেসি। ১৯৩০ সালে উদ্বোধনী আসরে এই কীর্তি গড়েন গিয়ের্মো স্তাবিলে।আটলান্টায় মঙ্গলবার শেষ ষোলোয় মিশরের বিপক্ষে ৭৮ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা। পরের মিনিটে মেসির ক্রস থেকে ব্যবধান কমান ক্রিস্তিয়ান রোমেরো।
৮৩তম মিনিটে ডি-বক্সে জটলার মধ্যে মিশর বল ক্লিয়ার করতে ব্যর্থ হলে, গন্জালো মন্তিয়েলের কাটব্যাক পেয়ে জোরাল শটে সমতা টানেন মেসি, চলতি আসরে যা তার অষ্টম গোল।বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে নকআউট পর্বে টানা ছয় ম্যাচে গোল করার কীর্তিও গড়লেন মেসি।বিশ্ব মঞ্চে এই নিয়ে টানা ৯ ম্যাচে গোল করলেন রেকর্ড আটবারের ব্যালন দ’র জয়ী। ছয় ম্যাচের বেশি নেই আর কারো। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা মেসির মোট গোল হলো ২১টি।
প্রায় হার থেকে জয়ের আনন্দাঅশ্রু-
খেলার ৮৩ মিনিটে প্রবলভাবে জেগে ওঠার পর সমতা টেনে খানিক পরেই হিমালয় ছুঁলেন মেসি! শঙ্কার মেঘটুকু সরে গেলে সতীর্থের আলিঙ্গণে আবদ্ধ মেসির চোখে অশ্রুর ঝিলিক দেখা গেল! এর আগে কোপা আমেরিকার ব্যর্থতায়, ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ স্বপ্ন ফাইনালে গুঁড়িয়ে যাওয়ার বিষন্নতায় কেঁদেছেন তিনি, কিন্তু এবার তার চোখ দিয়ে যে, অশ্রু ঝরল জয়ের আনন্দে!
আটলান্টা স্টেডিয়ামে শেষ ষোলোর শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে মিশরকে ৩-২ গোলে হারিয়েছে আর্জেন্টিনা। দুই গোল হজমের পর, প্রত্যাবর্তনের অবিশ্বাস্য গল্প লিখে, শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রেখেছে লিওনেল স্কালোনির দল।অথচ, এই শেষের সাথে শুরুর কোনো মিলই ছিল না।
মিসরের সহকারী কোচ ইব্রাহিম হাসানের কথা ‘আমাদের সালাহ ও ২৬ জন মেসি আছে’ সত্যি করতেই যেন নেমেছিল মিশর। ইয়াসির ইব্রাহিম ও মোস্তাফা জিকোর গোলে স্মরণীয় জয়ের প্রবল আশা জাগিয়েছিল দলটি। আর মেসির আর্জেন্টিনা পেনাল্টি মিসের পর থেকে ছিল যেন দিকভ্রান্ত, দিশেহারা। প্রতিপক্ষের ডি-বক্সের সামনে ভুল পাসে পজেশন হারানো, লক্ষ্যভ্রষ্ট শট, নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়ার ঘাটতি- কোনোকিছুই ঠিকঠাক হচ্ছিল না। ক্যামেরার চোখে ধরা পড়ছিল মেসির ক্লান্ত, ঘর্মাক্ত, বিষাদগ্রস্ত ছবি। সময় যত গড়ায়, শঙ্কা রূপ দিতে থাকে স্বপ্ন ভাঙার ভয়ে। কিন্তু তিনি যে হাল ছাড়ার পাত্র নন।
অনেকেই যখন মনে মনে আর্জেন্টিনার শেষ কাব্য ঘাটছেন তখন ক্রিস্তিয়ান রোমেরোকে দিয়ে গোল করালেন মেসি। ঘড়ির কাঁটায় সময় তখন ৭৯তম মিনিট। শঙ্কার মেঘ ফুঁড়ে আর্জেন্টিনার আকাশে এক চিলতে আলো উঁকি।ছিটকে পড়ার ভয় কাটেনি তখনও। চার মিনিট পরই বাম পায়ের দারুণ শটে তা দূর করে দিলেন মেসি। আনন্দে ডানা মেলে ছুটলেন বুলেট গতিতে, গ্যালারির দিকে।
বুকের ওপর এতক্ষণ ধরে চেপে থাকা পাহাড়সম পাথর সরে যাওয়ায় যেন হালকা অনুভব করলেন তিনি; বাধঁনহারা উচ্ছ্বাসে শরীরটা শুণ্যে ভাসিয়ে তাই ছুঁতে চাইলেন আকাশ। বিশ্বকাপ স্বপ্ন টিকে থাকার আনন্দে উজ্জীবিত আর্জেন্টিনা যোগ করা সময়ে মিশরের রক্ষণে চাপ দিতে থাকল মরিয়া হয়ে। কাঙ্ক্ষিত গোলও এসে গেল; এবার লক্ষ্যভেদ করলেন এনসো ফের্নান্দেস। মেসির চোখে-মুখে তখন হাসির ঝিলিক। বাকি সময়টুকু কেবল তখন পার হওয়ার অপেক্ষা।
তখন ক্যামেরার চোখে ধরা পড়ল মেসির আনন্দঅশ্রু।




