‘মৃত্যুদন্ড দাবি’ কান্না থামছে না রামিসার পিতার
আপনারা কী দিতে পারবেন? এমন একটা অন্তত সমাজব্যবস্থা দেন, যেই ব্যবস্থায় আর কোনো দিন বাবা-মায়ের বুক খালি হবে না। আর কোনো বাবা-মায়ের সারা জীবনের জন্য কান্নার পথ খোলা থাকবে না।
লাবণ্য চৌধুরী : কান্না থামছে না রামিসার পিতার। রাত পেরোলেই কাল রবিবার ৭ জুন ২০২৬ তারিখে পল্লবীর সেই নৃশংস হত্যাকাণ্ড’র স্পর্শকাতর মামলার রায় ঘোষণা করার কথা রয়েছে। কিন্তু পল্লবীর সেই হতভাগ্য শিশুর পিতার কান্না যেন থামছে না।তার আর্তনাদ আমি আজকে খণ্ডবিখণ্ড আমার খুকুর সোনার টুকরার লাশের বাবা। একি সমাজের অবহেলা, না রাষ্ট্রের অবহেলা?
ভুক্তভোগী পরিবার এবং দেশের সাধারণ মানুষ এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সর্বোচ্চ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রত্যাশা করছেন।রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুর রহমান দুলু আদালতে আসামিদের অপরাধ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন বলে জানিয়েছেন এবং প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের মৃত্যুদণ্ড (সর্বোচ্চ শাস্তি) দাবি করেছেন। গত ৪ জুন যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় প্রধান আসামি সোহেল রানা আদালতে নিজের দায় স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছে, তবে তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুন নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছে।
গত ১৯ মে পল্লবীর মিল্লাত ক্যাম্প এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে রামিসার খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মামলাটি দায়েরের মাত্র ১৯ দিনের মাথায় এবং ১ জুন আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হওয়ার পর মাত্র ৯ কার্যদিবসের মধ্যে সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া ও সাক্ষ্যগ্রহণ (বাবা-মাসহ ১৬ জনের) শেষ করে রায়ের দিন ধার্য করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে অন্যতম দ্রুততম বিচারের নজির।
শনিবার এক গোলটেবিল বৈঠকে সেই হতভাগ্য শিশুর পিতা বলেছেন, আমি আজকে খণ্ডবিখণ্ড আমার খুকুর সোনার টুকরার লাশের বাবা। একি সমাজের অবহেলা, না রাষ্ট্রের অবহেলা? এর দায়িত্ব কে নেবে? আমি কি তার জন্য দায়ী? না কে দায়ী?’আমি গর্বিত পিতা হয়ে থাকতে চেয়েছিলাম! কিন্তু একি হলো? এ কোন সমাজব্যবস্থা! এ রাষ্ট্র সমাজ ব্যবস্থা এমন হোক যেখানে আর কোনো দিন কোনো বাবা-মায়ের বুক খালি হবে না।
তিনি বলেন, ‘আমি একজন ধর্ষিতার বাবা, একজন খণ্ডিত লাশের বাবা। কিন্তু আমি তো এভাবে পরিচিত হতে চাইনি। আমি গর্বিত পিতা হয়ে থাকতে চেয়েছিলাম।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন রাজধানীর পল্লবীতে ধর্ষণ ও নৃশংসভাবে হত্যার শিকার আট বছর বয়সী শিশুর বাবা। আজ শনিবার ৬ জুন রাজধানীর শহীদ আবু সাঈদ কনভেনশন সেন্টারে ‘বাংলাদেশে শিশু নির্যাতন ও করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত হয়ে তিনি এ কথা বলেন। বিএনপির উদ্যোগে গঠিত ‘নিপীড়িত নারী ও শিশুদের আইনি ও স্বাস্থ্যসহায়তা সেল’ এ বৈঠকের আয়োজন করে।
পল্লবীর শিশুটির বাবা বলেন, ‘আমি জানতে চাই—এই দায়িত্ব কে নেবে? এই দায়িত্ব কি আমার অবহেলা, সমাজের অবহেলা, না রাষ্ট্রের অবহেলা? আমি আজকে খণ্ডবিখণ্ড আমার খুকুর সোনার টুকরা সন্তান—তার দায়িত্ব কে নেবে? আমি কি তার জন্য দায়ী? না কে দায়ী?’ বৈঠকে হাত জোড় করে সবার কাছে আবেদন জানান পল্লবীর শিশুটির বাবা। তিনি বলেন, ‘আমি তো একজন ধর্ষিতার বাবা হয়ে থাকতে চাই না। আমি তো গর্বিত পিতা হয়ে থাকতে চেয়েছি। আপনারা আমাকে সেই নাম ফিরিয়ে দেন। আমাকে সেই সম্মান ফিরিয়ে দেন।’
এই বাবা আরও বলেন, ‘যদি তা না পারেন, তাহলে আপনারা কী দিতে পারবেন? এমন একটা অন্তত সমাজব্যবস্থা দেন, যেই ব্যবস্থায় আর কোনো দিন বাবা-মায়ের বুক খালি হবে না। আর কোনো বাবা-মায়ের সারা জীবনের জন্য কান্নার পথ খোলা থাকবে না। সারা জীবন তারা জিন্দা লাশ হয়ে থাকবে না।’ ধর্ষণের শিকার শিশুটির বাবা আরও জানান, ঘটনার ১৩ দিন পরও তাঁর স্ত্রী মানসিক ট্রমায় ভুগছেন। তিনি বলেন, ‘আমার স্ত্রী কোথায় যায়, কী বলে, নিজেই জানে না। তাকে প্রতিনিয়ত দেখভাল করতে হচ্ছে। সে সুস্থ হবে কি না, আল্লাহই ভালো জানেন।’ পাশাপাশি বড় মেয়েকে নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
শুধু নিজের মেয়েরাই নয়, সব শিশুকে নিয়েই উদ্বেগ জানান এই বাবা। একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন তিনি। বলেন, গতকাল তাঁর বাড়িতে পাঁচ বছরের একটি মেয়ে এসেছিল। সে ‘ধর্ষণ’ শব্দটি শিখে গেছে, অথচ এই বয়সে তার তা জানার কথা নয়। সেই শিশুটি এখন একা টয়লেটেও যেতে পারছে না, মায়ের আঁচল ছাড়া এক পা নড়ছে না। , তিনি বলেন ‘এটাই আজকে বাংলাদেশের শিশুদের মনের অবস্থা।’ মেয়ে হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেন এই বাবা।
গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরী, জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক কাজী গোলাম মোখলেছুর রহমান, আইনজীবী রাশনা ইমাম প্রমুখ। বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলাম।
গত ১৯ মে পল্লবীর একটি ভবনের ফ্ল্যাট থেকে ধর্ষণের শিকার শিশুটির খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। ফ্ল্যাটটির বাসিন্দা আসামি সোহেল ঘটনার পর বাসার টয়লেটের গ্রিল ভেঙে পালিয়ে যান। বাসা থেকে তাঁর স্ত্রীকে তখনই আটক করা হয়। আর সেদিন সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে সোহেলকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় শিশুটির বাবা পল্লবী থানায় মামলা করেন। শিশুকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার ১৯ দিনের মাথায় রায় ঘোষণার দিন ধার্য করা হয়। আদালত ৭ জুন রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেছেন।




