• শনিবার , ২৩ মে ২০২৬

পাটোয়ারীর ওপর ডিম হামলা-মুখোমুখি-ছাত্রদল এনসিপি


প্রকাশিত: ১১:৩৬ পিএম, ২২ মে ২৬ , শুক্রবার

নিউজটি পড়া হয়েছে ৫১ বার

 

 

প্রথমে ডিম, ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়, এরপর হকিস্টিক দিয়ে অতর্কিতভাবে আঘাত করা হয়। তিনজনের মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয় এবং বেশ কয়েকজন আহত হন

ঝিনাইদহ প্রতিনিধি : ঝিনাইদহে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর ডিম হামলা হয়েছে। আজ শুক্রবার বেলা দুইটার পর ঝিনাইদহ পৌর কালেক্টরেট জামে মসজিদের সামনে এ ঘটনা ঘটে। এনসিপির ঝিনাইদহ জেলার যুগ্ম সমন্বয়কারী হামিদ পারভেজ জানিয়েছেন, হামলার পর তাঁরা এখন ঝিনাইদহ থানায় আছেন। এ বিষয়ে পরে জানাবেন।

হামলার ঘটনার বিষয়ে বেলা ৩টা ১০ মিনিটে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ফেসবুক আইডি থেকে একটি পোস্ট দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘ঝিনাইদহে পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী জেলা প্রশাসকের বাসভবনের ঠিক বিপরীতে পৌর কালেক্টর জামে মসজিদে জুমআর নামাজ আদায় শেষে বের হওয়ার পরপরই ছাত্রদল ও যুবদলের নেতা-কর্মীরা পুলিশের উপস্থিতিতে হামলা শুরু করে।

প্রথমে ডিম, ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়, এরপর হকিস্টিক দিয়ে অতর্কিতভাবে আঘাত করা হয়। তিনজনের মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয় এবং বেশ কয়েকজন আহত হন। আমাকে এবং এনসিপির যুগ্ম সদস্য তারেক রেজাকে লক্ষ্য করেও কিল-ঘুষি মারা হয়।’ হামলাকারীরা মুঠোফোন, ক্যামেরা ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে গেছে অভিযোগ করে ফেসবুক পোস্টে নাসীরুদ্দীন বলেন, ‘ঘটনার পর আমরা বর্তমানে থানায় অবস্থান করছি এবং মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছি। ছাত্রদল, যুবদল, বিএনপি আবার থানার সামনে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।’

এ ঘটনার পর- ‘সরকারি দল ভায়োলেন্স চাচ্ছে’

ঝিনাইদহে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। নাসীরুদ্দীনের ওপর হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের আজ শুক্রবার রাতের মধ্যে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যদি গ্রেপ্তার না করা হয়, আপনারা যদি ভায়োলেন্স (সহিংসতা) বেছে নেন, তাহলে আমাদেরকেও ভায়োলেন্স বেছে নিতে বাধ্য হতে হবে।’

ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারকে হুঁশিয়ার করে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘বিরোধী দল থেকে বারবার সদিচ্ছা দেখানো হলেও সরকারি দল ভায়োলেন্স চাচ্ছে। আমাদের রক্ত গরম এবং বয়স কম হলেও আমরা বুঝি যে কখন কী করতে হবে, কখন দেশ গড়ার দিকে কাজ করতে হবে। কিন্তু যদি সরকারি দল ভায়োলেন্স চায়, সেটাকেই একমাত্র রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে নিতে চায়, তাহলে এটা যে আমাদের থেকে বেশি কেউ পারবে না, সেটা ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে আমরা দেখিয়ে দিয়েছি।’

শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আসিফ মাহমুদ এ কথা বলেন। এই অনুষ্ঠানে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতাদের উদ্যোগে গঠিত রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ইউনাইটেড পিপল’স বাংলাদেশের (আপ বাংলাদেশ) ঢাকার দুই মহানগরের ২২৯ জন নেতা–কর্মী এনসিপিতে যোগ দেন।

অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানান এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থ হচ্ছে, কিন্তু তারা প্রতিপক্ষকে দমন-পীড়নের মাধ্যমে মোকাবিলার একধরনের কৌশল নিচ্ছে। এটা বাংলাদেশের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে না।

জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে বিরোধী দল বারবার সরকারকে গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের আহ্বান জানাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের শরিক দল এনসিপির নেতা আসিফ মাহমুদ। এরপর একসঙ্গে একটা নতুন বাংলাদেশ গড়ার দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বানও বিরোধী দল জানাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বিরোধী দল থেকে বারবার এই সদিচ্ছা দেখানো হলেও সরকারি দল ভায়োলেন্স চাচ্ছে।’

সংঘাতের বিষয়ে সরকারকে সতর্ক করে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে যদি এটা করতে চান, এই লড়াইটা কোনো রাজনৈতিক দল, নির্দিষ্ট মতাদর্শ বা আদর্শের সঙ্গে হবে না; এই লড়াইটা হবে পুরো একটা প্রজন্মের সঙ্গে। এই প্রজন্মের সঙ্গে লড়াই করার ভুলটা শেখ হাসিনা করেছিলেন। আশা করি, এই ভুলটা তারেক রহমান করবেন না। আমাদের সহযোদ্ধাদের ওপর যাঁরা হামলা করেছেন, ভিডিও ফুটেজ ও ছবিতে সবার পরিচয় এসেছে। আজ রাতের মধ্যে তাঁদের সবাইকে অবশ্যই গ্রেপ্তার করতে হবে। যদি গ্রেপ্তার না করা হয়, আপনারা যদি ভায়োলেন্স বেছে নেন, আমাদেরকেও ভায়োলেন্স বেছে নিতে বাধ্য হতে হবে।’

বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতার অভিযোগ করেন জুলাই অভ্যুত্থান–পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করে আসা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের পর থেকে খুন, ধর্ষণ ও নাগরিকের নিরাপত্তার সংকট চরমভাবে বেড়েছে। আজ আমাদের মা–বোনেরা ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছেন।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে মাঝেমধ্যে প্রধানমন্ত্রী অথবা রাষ্ট্রপতি বলে মনে হয় উল্লেখ করে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করছেন না কিংবা করতে তাঁর মধ্যে একধরনের অনীহা দেখা যাচ্ছে। এভাবে দেশ চলতে থাকলে বাংলাদেশের জনগণ সামনের দিনে বাধ্য হবে এই সরকার ও ব্যর্থ রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে আসতে।’

‘দমনের চেষ্টা করলে পতন হবে’

অনুষ্ঠানের আরেক বিশেষ অতিথি এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমও নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ঘোষণা দিয়েছিলেন, ঝিনাইদহের সহযোদ্ধাদের সঙ্গে জুমার নামাজের পর মতবিনিময় করবেন। তখন তাঁর ওপর ছাত্রদল–যুবদলের নেতা–কর্মীরা সন্ত্রাসী কায়দায় আক্রমণ চালান। সেখানে জেলা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক থেকে শুরু করে সেখানকার সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রদলের আহ্বায়কেরা সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। কিছুদিন আগে শাহবাগ থানার ভেতরে ঢুকে ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা সাংবাদিক ভাইদের পিটিয়েছেন। এখন পর্যন্ত সেই হামলার কোনো ধরনের বিচার হয়নি।

ঢাকার পল্লবীতে আট বছরের শিশুকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা সম্পর্কে এনসিপি নেতা সারজিস বলেন, ‘আমাদের বোনকে ধর্ষণ করে নৃশংসভাবে হত্যার পর গতকাল আমরা দেখলাম, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেখানে গিয়ে সহমর্মিতা জানিয়েছেন। আমরা ধন্যবাদ জানাই, কিন্তু এই সহমর্মিতা যদি শুধু এক দিনের ইস্যু ধামাচাপা দেওয়ার খেলা হয়, পরের ছয় মাসেও বিচারের কোনো দিশা খুঁজে না পাওয়া যায়, তাহলে এই সহমর্মিতার কার্ড আগামীর বাংলাদেশের জনগণ আর মেনে নেবে না।’

অভিযোগ ছাত্রদল-যুবদলের বিরুদ্ধে-

বিএনপি ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্দেশে সারজিস আলম বলেন, ‘আপনার ছাত্রদল–যুবদলের নেতা–কর্মীরা অভ্যুত্থানে আমাদের সহযোদ্ধা ছিলেন। তাঁদের প্রতি আমরা শ্রদ্ধা–সম্মান দেখাতে চাই। কিন্তু তাঁরা যদি আগের ছাত্রলীগ–যুবলীগের মতো সন্ত্রাসী কায়দায় রাজনৈতিক আন্দোলনকে দমন করার চেষ্টা করেন, তাহলে তার চেয়ে খারাপভাবে তাদের পতন হবে, ইনশা আল্লাহ। আমরা স্পষ্ট করে বলছি, আগামীর বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পেটোয়া বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করে অন্য কোনো দলমতের ওপর দমন–পীড়ন আর মেনে নেওয়া হবে না।’এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ। সঞ্চালক ছিলেন এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব শাহরিন সুলতানা। বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য দেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব।

অস্ত্র নিয়ে মব সৃষ্টির অভিযোগ এনসিপির বিরুদ্ধে ছাত্রদলের

অস্ত্র নিয়ে মব সৃষ্টির অভিযোগে অবিলম্বে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে ঝিনাইদহ জেলা ছাত্রদল। শুক্রবার বিকেলে ঝিনাইদহ শহরে বিক্ষোভ মিছিল করে সংগঠনটির নেতারা এ দাবি করেন। দুপুরে শহরের পুরাতন কালেক্টরেট জামে মসজিদে জুমার নামাজ শেষে বের হওয়ার সময় নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলা ও ডিম নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এতে নাসিরুদ্দীনসহ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্রদলের অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় শহরে উত্তেজনা বিরাজ করছে।

কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, জুমার নামাজ পড়ে বের হওয়ার সময় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাহেদ আহমেদের সঙ্গে কথা বলার সময় হঠাৎ নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর দিকে ডিম ছোড়া হয়। পরে তাঁকে ঘিরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় এনসিপি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা তাঁকে ঘিরে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। পরে উভয় পক্ষের মধ্যে ইট নিক্ষেপ, লাঠিপেটা ও পাল্টাপাল্টি স্লোগানের ঘটনা ঘটে।

ঝিনাইদহ জেলা এনসিপির যুগ্ম সমন্বয়ক হামিদ পারভেজ বলেন, নির্ধারিত কর্মসূচিতে অংশ নিতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ঝিনাইদহে এসেছিলেন। মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা পরিকল্পিতভাবে হামলা চালান। এতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব তারেক রেজা, জেলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি সাইদুর রহমানসহ কয়েকজন আহত হন। তিনি জানান, এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

অন্যদিকে বিকেলে বিক্ষোভ মিছিল শেষে সমাবেশে জেলা ছাত্রদলের সভাপতি ইমরান হোসেন বলেন, ‘নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী মব সৃষ্টি করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চান। তিনি আজও নামাজ শেষে মব সৃষ্টি করতে লোকজন নিয়ে তৎপরতা চালান। এ সময় সংঘর্ষ শুরু হলে অস্ত্র বের করে মহড়া দেন।’ ছাত্রদল সভাপতি বলেন, ‘এ অস্ত্র কোথা থেকে এল, তা খতিয়ে দেখতে হবে। তাঁকে আইনের আওতায় নিয়ে আসার দাবি জানাই।’

ঝিনাইদহ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসাউজামান বলেন, ঘটনা জানার পরই অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। তিনি বলেন, এনসিপির পক্ষ থেকে অভিযোগ দেওয়া হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি ছাত্রদলের পক্ষ থেকে অস্ত্র প্রদর্শনের যে অভিযোগ করা হয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।