১৫০০ কোটি টাকা ঘুষখোর উধাও
বিশেষ প্রতিনিধি : জিকে শামীমের গডফাদার ১৫০০ কোটি টাকা ঘুষখোর উধাও গণপূর্তের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম রহস্যজনক উধাও ! তার রয়েছে দেশ-বিদেশে বাড়ি-গাড়ি-ফ্ল্যাট, শত শত বিঘা জমি, স্ত্রীসহ আত্মীয়স্বজনের নামেও অঢেল সম্পদ। টাকা ছাড়া কিছুই বুঝতেন না তিনি। গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী হওয়ার পর নানা দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া, কমিশন, বদলি, নিয়োগ বানিজ্য সবকিছুতেই নিজের ভাগ বুঝে নিতেন সবার আগে। গড়ে তুলেছিলেন ঠিকাদার সিন্ডিকেটও।
জানা গেছে, চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের পর থেকে খোঁজ মিলছে না তার। তবে মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে বিদেশে অর্থপাচার ও অবৈধ
সম্পদ অর্জনের দায়ে রফিকুলের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম এ সম্পর্কে বলেন, সাবেক প্রধান প্রকৌশলীর অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত করছে। বর্তমানে এ বিষয়ে আমাদের কিছু করার পরিকল্পনা নেই। তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেব।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরুর পর থেকে রফিকুলের অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়টি আলোচনায় আসে। তবে প্রভাবশালী এই সাবেক প্রধান প্রকৌশলীর বিষয়ে কেউই নাম প্রকাশ করে কিছু বলতে রাজি হননি। অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে রফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করাও সম্ভব হয়নি।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন ঠিকাদারি কাজে কমিশন নিয়ে আলোচিত যুবলীগ নেতা জিকে শামীমের পক্ষ হয়ে কাজ করেছেন ওই বিভাগের এমন কয়েক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। তাদের মধ্যে সদ্য সাবেক প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম ও তার স্ত্রী রাশেদা ইসলাম, সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবদুল হাই ও তার স্ত্রী বনানী সুলতানার সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ দিয়েছে দুদক। রফিকুল ২০১৬ সালে গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগে ছিলেন সংস্থাটির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী। প্রধান প্রকৌশলী হতে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি গণপূর্তের আলেচিত ঠিকাদার জিকে শামীম র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পরই সামনে আসে রফিকুল ইসলামের নাম। শামীম র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, রফিকুল ইসলাম ও সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবদুল হাইকে দেড় হাজার কোটি টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে তার।
প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম তার অনুগতদের নিয়ে তৈরি করেছিলেন কমিশন সিন্ডিকেট। অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবদুুল হাই ছাড়াও এ সিন্ডিকেটে ছিলেন আরও বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী প্রকৌশলী। জানা যায়, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী ও অন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীদেরও নিয়মিত টাকা দিতে হতো রফিকুলকে। কেউ টাকা না দিলে তাদের অপেক্ষাকৃত অগুরুত্বপূর্ণ জায়গা বদলি করা হতো।
এক প্রকৌশলী জাতিরকন্ঠ কে জানান, কানাডায় অবস্থানরত ছেলের জন্য ডলার পাঠাতে সহযোগিতা না করায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম সার্কেল ৩-এর (শেরেবাংলা নগর অঞ্চল) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল হাশেমকে গালাগাল ও মানসিকভাবে নির্যাতন করেছিলেন রফিকুল। সেই মানসিক যন্ত্রণায় আবুল হাশেমের মৃত্যু হয়। এ নিয়ে আবুল হাশেমের স্ত্রী অভিযোগ দিতে চাইলে রফিকুল ইসলাম আবুল হাশেমের স্ত্রীকে ডেকে নিয়ে স্বামীর পেনশনের টাকা না পাওয়ার হুমকি দেন। পরে তিনি আর এগোননি।
চারদলীয় জোট সরকারের প্রথম দিকে রফিকুল ইসলাম সাভার গণপূর্ত ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন। ওই সময় অতিরিক্ত বাজেট নিয়ে কাজ না করেই ৮ কোটি টাকার বিল উত্তোলন করেন তিনি। পরে তাকে কুমিল্লায় বদলি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পে কার্যাদেশ দেওয়ার সময় প্রতিটি গ্রুপে তিনি শতকরা ৬ ভাগ হারে টাকা নেন।
অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও প্রধান প্রকৌশলী থাকা অবস্থায় রফিকুল ইসলাম যে টাকা কামিয়েছেন তার বেশির ভাগই বিদেশে পাচার করেছেন। কানাডায় একাধিক বাড়িও রয়েছে তার। রফিকুল ইসলামের বিশ্বস্ত একজন প্রকৌশলী জানিয়েছেন, রফিকুল তার প্রথম স্ত্রীর ছেলে শাওনের মাধ্যমে হংকংয়ের এইচএসবিসি ব্যাংকে ২০০ কোটি টাকা জমা রেখেছেন। এ ছাড়া তার নিজের নামেই ঢাকায় একাধিক বিলাসবহুল বাড়ি ও ফ্ল্যাট রয়েছে।
ধানমন্ডির ৮ নম্বর রোডের ৯ নম্বর হোল্ডিংয়ে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, গ্রিন রোডের গ্রিন কর্নার নামের অ্যাপার্টমেন্টে দুটি ফ্ল্যাট, গুলশানের ৩৫ নম্বর রোডের ৪৪ নম্বর বাড়ি এবং বনানীর ৭ নম্বর রোডের এফ/১৭ নম্বর হোল্ডিংয়ে আনোয়ার মঞ্জিল নামে একটি বাড়ি রয়েছে তার। মিরপুরে ১০ কাঠা জমির ওপর ১২টি ফ্ল্যাটবিশিষ্ট ছয়তলা বাড়ির মালিকও তিনি। এ ছাড়া গাজীপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জমি কিনেছেন তিনি। নিকট আত্মীয়দের নামেও বিপুল পরিমাণ টাকা জমা রেখেছেন ব্যাংকে।



