হেয়ালিপনায় বাংলাদেশের বিশ্বকাপ শেষ
বিশেষ প্রতিনিধি : বিশ্বকাপ ক্রিকেটে ভারতের কাছে কেন হারলো বাংলাদেশ তা নিয়ে নানা রহস্য দানা বাঁধছে। যারা রাত জেগে খেলা দেখেছেন তাদের ভাষ্য অবহেলা অযত্ন এবং হেয়ালিপনায় বিশ্বকাপ সেমির স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে বাংলাদেশের। মঙ্গলবার টাইগাররা একি করলেন-এ প্রশ্নটা সারা দেশবাসীর। এর আগে ৩২১ রান তাড়া করে জেতা টাইগাররা হঠাৎ চুপসে গেলে কেন-তা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা সমালোচনা। ভারতকে হারাতে লক্ষ্য মাত্র ৩১৫ রান।
অথচ বিশ্বকাপে তিন শর বেশি রান তাড়া করে জেতার রেকর্ড বাংলাদেশের আছে, সেটাও দুবার। এ বিশ্বকাপেই তো ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৩২১ তাড়া করে বাংলাদেশ জিতেছে; সেটাও ৫১ বল হাতে রেখে। বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের আগেই তাই আশাহত হওয়ার উপায় ছিল না। শেষ দিকে অন্য প্রান্তে কোনো সহযোগিতা ছাড়াই সাইফউদ্দিন যেভাবে ব্যাট করছিলেন, তাতে প্রায় অসম্ভব এক জয়ের স্বপ্নও দেকা দিয়েছিল। কিন্তু অন্য টাইগারদের বিড়াল বনে যাওয়ায় সব স্বপ্ন ধূলিস্যাত হয়ে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ স্বপ্ন’ই শেষ হয়ে গেছে মঙ্গলবার।
ম্যাচ শেষে হারের কারণ হিসেবে টাইগার অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা বলেছেন, টপ অর্ডারে একমাত্র সাকিব আল হাসান ছাড়া কেউই দায়িত্ব নিতে পারেননি। একের পর এক উইকেট বিলিয়ে দিয়ে এসেছেন। টপ অর্ডারের সবাই রান পেয়েছেন। কিন্তু বড় কোনো জুটি হয়নি। বড় জুটি হলে হয়তো ম্যাচের ফল অন্য রকম হতো।মাশরাফি বলেন, ‘আমাদের চেষ্টাটা ভালো ছিল। তবে জয়ের বিকল্প কিছুই ছিল না আমাদের সামনে। ফিল্ডিংয়ের সময় আমরা রোহিত শর্মার ক্যাচটা মিস না করলে হয়তো কম রানে ভারতকে আটকে দেওয়া যেত।তিনি বলেন, ‘সাকিব আল হাসান শুরু থেকেই দুর্দান্ত ফর্মে। মুশফিকও ভালো ব্যাটিং করছে। মোস্তাফিজের আজকের বোলিংও অসাধারণ ছিল।’অনেকে মনে করেন, এই এজবাস্টনেই ভারত ইংল্যান্ডের কাছে হেরেছিল যে কারণেই, অনেকটা সে কারণেই হেরেছে বাংলাদেশ।সাইফউদ্দিনের ব্যাট হাতে লড়াই কিছুটা আশা জাগিয়েছিল শেষের দিকে।ভারতের বিপক্ষে ২ ওভার আগে অলআউট হয়ে ২৮ রানে হেরে গেছে বাংলাদেশ। এ হারে বাংলাদেশের সেমিফাইনাল খেলার স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে। ৫ জুন পাকিস্তানের বিপক্ষে নিজেদের শেষ ম্যাচ খেলবে বাংলাদেশ
তবে এমন না যে ভারতকে হারালেই বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে চলে যেত বাংলাদেশ। ভারতের বিপক্ষে জয় পেলেও তাকিয়ে থাকতে হতো ইংল্যান্ড-নিউজিল্যান্ড ম্যাচের দিকে। এর পর পাকিস্তানকেও হারাতে হতো নিজেদের শেষ ম্যাচে। সে সবই অনেক জটিল হিসাব নিকাশের ব্যাপার। বাংলাদেশ অত জটিল হিসাবের মধ্যেই যেতে পারেনি। ভারতের কাছে আজ ২৮ রানে হেরে গেছে বাংলাদেশ। এ হার দিয়েই ২০১৯ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের স্বপ্ন শেষ মাশরাফিদের।পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটা এখন কেবলই আনুষ্ঠানিকতার।আর এই জয় দিয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে ফেলল ভারত। এর আগে কেবল অস্ট্রেলিয়া শেষ চার নিশ্চিত করেছে।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ভারত প্রথম ১০ ওভারে মাত্র ২৮ রান তুলেছিল ভারত। শেষ দিকে এই ধীরে শুরু করার দায় মিটিয়ে হেরেছে ভারত। আজ ৩১৪ তাড়া করতে নেমে প্রথম ১০ ওভারে বাংলাদেশ তুলেছে ৪০, সেটাও তামিমের উইকেট হারিয়ে। বিশ্বকাপজুড়ে ধীরে শুরু করার নীতি থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েও পরে খোলসে ঢুকে গেছেন তামিম। ফিরে যাওয়ার আগে ২২ রান করেছেন ৩১ বলে।
এরপরও বাংলাদেশের জয়ের স্বপ্ন ছিল। মাঝে ওভারগুলোতে রান তোলার বিশেষজ্ঞ বনে যাওয়া সাকিব আল হাসান আছেন, বিশ্বকাপে কোনো ফিফটি না পাওয়া সৌম্যও আজও ফর্মে ফিরবেন না তার আশা করতেও দোষ কি? কিন্তু ভারতের ইনিংসের শেষ ভাগে উইকেট ধীর হয়ে যাওয়ার যে ইঙ্গিত মিলেছিল সেটাই বড় হয়ে উঠল বাংলাদেশের ইনিংসে। উইকেটে বল দ্বিমুখী আচরণ করছিল। কোনো বল স্বাভাবিক গতি ধরে রাখছিল। কোনো বল আবার একটু ধীর হয়ে যাচ্ছিল। এর দোলাচলে পড়ে সৌম্য আউট হয়ে গেলেন পান্ডিয়ার প্রথম বলেই। সে বলটা মাঠের যেকোনো প্রান্তে আছড়ে ফেলতে পারতেন সৌম্য, কিন্তু বলের বাড়তি বাউন্স বুঝতে না পেরে কোহলির কাছে ক্যাচ দিয়েছেন সৌম্য(৩৩)।
উইকেটের এমন আচরণের মাঝেও দারুণ খেলছিলেন সাকিব। বল ও রানের সামঞ্জস্য ধরে রেখে এ বিশ্বকাপে নিজের চতুর্থ ফিফটি বুঝে নিয়েছেন। সাকিবের কারণেই মাঝের ৩০ ওভারে ১৮৫ রান তুলেছে বাংলাদেশ। কিন্তু সাকিবের সঙ্গে উইকেটে সময় কাটানোয় আরও আগ্রহ দেখা যায়নি। পান্ডিয়ার স্লোয়ারে ৬৬ রান করে সাকিব ফেরার পরই ম্যাচ থেকে ছিটকে গেছে বাংলাদেশ। মাঝে যে মুশফিক, লিটন ও মোসাদ্দেকও ড্রেসিংরুমের পথ ধরেছেন।
৩৪তম ওভারে সাকিবের বিদায়ের পর বাংলাদেশের জয়ের আশা প্রায় শেষই হয়ে গিয়েছিল। ১৬ ওভারে ১৩৬ রানের লক্ষ্যটা ছোঁয়ার চেষ্টা করেছিলেন সাব্বির ও সাইফউদ্দিন। কিন্তু ৪৪ ওভারে জয় থেকে ৭০ রান দূরে সাব্বিরও (৩৬) বিদায় নেওয়ার পর শুধু পরাজয়ের অপেক্ষাই বেড়েছে। সঙ্গীহারা হওয়ার আগেই বিশ্বকাপে নিজের দ্বিতীয় ফিফটি তুলে নিয়েছেন সাইফউদ্দিন (৩৮ বলে ৫১)। বুমরার টানা দুই ইয়র্কারে শেষ হয়ে গেছে বাংলাদেশের সব লড়াই।২ ওভার আগে অলআউট হওয়া ও জয় থেকে ২৯ রানের দূরত্বটা আক্ষেপ বাড়াচ্ছেই। যদি টপ অর্ডার বা মিডল অর্ডারের একজন থাকতেন শেষ পর্যন্ত! তাহলে অন্তত ৫ জুন পর্যন্ত বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠার স্বপ্নটাও বেঁচে থাকত।



