• রোববার , ২৬ জুলাই ২০২৬

সম্রাটের টাকার খোঁজে গোয়েন্দারা


প্রকাশিত: ৭:৫২ পিএম, ২৫ অক্টোবর ১৯ , শুক্রবার

নিউজটি পড়া হয়েছে ৭৩ বার

 

বিশেষ প্রতিনিধি : ক্যাসিনো সম্রাটের টাকা গেল কই!ক্যাসিনো সম্রাটের জুয়ার টাকা উধাও হয়ে গেছে। র‌্যাব হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিলেও টাকার সন্ধান দিচ্ছেনা ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট ওরফে ক্যাসিনো সম্রাট। র‌্যাব জানতে পেরেছে, ঢাকার অন্তত ১০ টি ক্লাবে অবৈধ ক্যাসিনো নিয়ন্ত্রণ করতেন সম্রাট। এসব জুয়ার আখরা থেকে দৈনিক লাখ লাখ টাকা কামিয়েছেন সম্রাট। তার কাছে ক্যাসিনোর অন্তত কয়েক’শ কোটি টাকা রয়েছে বলে গোয়েন্দারা ধারনা করছেন কিন্তু ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হওয়ার পর এসব টাকা সরিয়ে ফেলেছেন সম্রাট।

তদন্ত সূত্র জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাট জানিয়েছেন ক্যাসিনো, টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজি থেকে তিনি কাড়ি কাড়ি টাকা সহযোগীদের কাছে রেখেছেন। কিন্তু কোন সহযোগীরা কাছে তার টাকা আছে সেতথ্য দিচ্ছেনা সম্রাট। ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের পর তিনি কাকরাইলে ভূঁইয়া ট্রেড সেন্টারে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের কার্যালয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখান থেকে নগদ টাকা অন্যত্র সরিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু কোথায়, কার কাছে রেখেছেন সে বিষয়ে কিছুতেই মুখ খুলছেন না সম্রাট।

র‌্যাবের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সম্রাটের অন্যতম ক্যাশিয়ার ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সহসভাপতি এনামুল হক আরমান। ক্যাসিনো, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির টাকার বড় অংশ আরমানের কাছে রাখতেন সম্রাট। সম্রাটের টাকা সম্পর্কে ও আরমানের কর্মকাণ্ড জানতে গত সোমবার আরমানকে দ্বিতীয় দফায় পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। তার কাছ থেকে সম্রাটের ওই টাকার বিষয়ে জানার চেষ্টা চলছে।

মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা র‌্যা-১-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল সারওয়ার বিন কাশেম জাতিরকন্ঠ কে বলেন, সম্রাট কোথায় ও কার কাছে টাকা রেখেছেন, সে বিষয়ে আরমানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন—দুদক এখন পর্যন্ত সম্রাটের বিরুদ্ধে মামলা করেনি। দুদক সূত্র জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত সম্রাটের ১ কোটি ৮৩ লাখ টাকার নথিপত্র পাওয়া গেছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে মামলা করলে কমিশন প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। কারণ, যে বিপুল অর্থসম্পদ তাঁর রয়েছে, সেই তুলনায় দুদকের পাওয়া এই তথ্য খুবই কম। তাই সম্রাটের আরও সম্পদের তথ্য বের করতে দুদক ২৪টি প্রতিষ্ঠান বা সংস্থাকে চিঠি দেবে।

সম্রাট ঢাকার অন্তত ১০ ক্যাসিনো নিয়ন্ত্রণ করতেন। তার হয়ে এগুলো দেখাশোনা করতেন স্বেচ্ছাসেবক লীগ থেকে বহিষ্কৃত সভাপতি মোল্লা কাওছার, যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ, এনামুল হক আরমান ও কাউন্সিলর মমিনুল হক সাঈদ।এদিকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন সম্রাট। তার অবৈধ আয়ের সুবিধাভোগী হিসেবে অন্তত ২৫ জন প্রভাবশালী ব্যাক্তির নাম বলেছেন এই ক্যাসিনো সম্রাট। এদের মধ্যে রয়েছেন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রভাবশালী নেতা এবং প্রশাসনের কয়েকজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা।

রাজনৈতিক নেতা নামধারী অনেকেই সম্রাটের দফতরে হাজির হতেন জুয়ার টাকার ভাগ নিতে। প্রতি মাসে ব্যাগভর্তি করে জুয়ার টাকা নিয়ে তারা বেরিয়ে যেতেন। সিসি ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও ফুটেজেও এর প্রমাণ রয়েছে। অপরদিকে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের বিভিন্ন নেতা ছাড়াও টাকার ভাগ পেতেন পল্টন, মতিঝিল ও ফকিরাপুল এলাকার প্রভাবশালীরা।

র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাট তার চাঁদাবাজির টাকার ভাগ নেয়া প্রভাবশালী যাদের নাম বলেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা আবু কাওসার এবং যুবলীগের একজন শীর্ষ নেতা।জিজ্ঞাসাবাদে সম্রাট জানিয়েছেন মতিঝিলের ছয়টি ক্লাবের ক্যাসিনো থেকে তিনি প্রতি সপ্তাহে অন্তত ৫০ লাখ টাকা চাঁদা পেতেন। ক্যাসিনোর পাশাপাশি গুলিস্তানের ছয়টি মার্কেট থেকে তোলা চাঁদার টাকাও তার কাছে আসত। মতিঝিল ও গুলিস্তানের ফুটপাত থেকে প্রতি সপ্তাহে পাঁচ–ছয় লাখ টাকা করে পেতেন তিনি।

সূত্রটি জানায়, এসব চাঁদা নিয়মিত তুলতেন সম্রাটের লোকজন। তাদের কাছ থেকে এসব চাঁদার টাকার হিসাব নিতেন সম্রাটের সহযোগী ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিষ্কৃত সহসভাপতি এনামুল হক আরমান। আরমান সেই টাকার ভাগ বিভিন্ন ব্যক্তির হাতে পৌঁছে দিতেন। যাঁদের টাকা দিয়েছেন, তাঁদের সবার নাম র‍্যাবকে বলেছেন সম্রাট। আবার এসব চাঁদার টাকার ভাগ যে ২৫ জনকে দিতেন সেগুলোও হিসাব করে দিতেন আরমান। সব শেষে আরমান সম্রাটকে হিসেব বুঝিয়ে দিতেন।সম্রাট জিজ্ঞাসাবাদে যে ২৫ জনের নাম বলেছেন তাদের বিরুদ্ধে খোঁজ নেয়া হচ্ছে। তাদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে তদন্তের জন্য। এখন থেকেই তাদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

প্রসঙ্গত ১৪ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির এক সভায় চাঁদা দাবির অভিযোগে ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও গোলাম রাব্বানীকে অপসারণের নির্দেশ দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পাশাপাশি যুবলীগ নেতাদের বিষয়েও চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। বলেন, যুবলীগের এক নেতা অস্ত্র উঁচিয়ে চলে। আরেকজন প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করে বেড়ায়।

এর পর গণমাধ্যমে যুবলীগ নেতাদের সংশ্লিষ্টতায় ঢাকার ৬০টি জায়গায় ক্যাসিনো পরিচালনার খবর প্রকাশ হয়। ১৮ নভেম্বর ফকিরাপুলের ইয়াংমেনস, ওয়ান্ডারার্স এবং গুলিস্তানে মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়া সংসদে অভিযান চালিয়ে ক্যাসিনোর সরঞ্জাম, বিপুল পরিমাণ মদ ও ৪০ লাখের বেশি টাকা উদ্ধার করে র্যা ব। ক্যাসিনো পরিচালনার অভিযোগে ওই দিনই যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গ্রেফতার করা হয়, যিনি ইয়াংমেনস ক্লাবের সভাপতি ছিলেন। পাশের ওয়ান্ডারার্স ক্লাব থেকেও জুয়ার সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এ ক্লাব পরিচালনার নেতৃত্বে ছিলেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাওসার।