লবন নিয়ে মুনাফাখোরী ধান্ধাবাজি
শফিক রহমান :এবার লবন নিয়ে মুনাফাখোরী ধান্ধাবাজি শুরু হয়েছে। সারাদেশে লবন সংকটের গুজব ছড়ানো হচ্ছে। লবন সংকটের গুজব নিয়ে ফায়দা লুটছে মুনাফাখোররা-। দেশবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল চক্র সারাদেশে লবনের মূল্য বৃদ্ধির গুজব তুলে ফায়দা লুটছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ওদিকে দেশে লবণের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে বলে জানিয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়। দেশে চরম লবণ সংকটের গুজবে এবং কোনো কোনো জায়গায় লবনের দাম বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে একথা জানানো হয়।
খোঁজ নিয়ে আমাদের প্রতিনিধিরা জানাচ্ছেন:-
সিলেট নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গতকাল সোমবার সন্ধ্যার পর থেকে লবণের মূল্যবৃদ্ধির গুজব ছড়িয়ে পড়লে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রয়কারী খুচরা ও পাইকারি বাজারে ভিড় বেড়ে যায়। এমন সুযোগে কয়েকজন অসাধু ব্যবসায়ী কয়েক গুণ বেশি দামে লবণ বিক্রি শুরু করেন। বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার দোকানগুলোতে প্রতি কেজি ৩০-৩৫ টাকার লবণ ৪০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রির ঘটনাও ঘটে।
এমন খবরে সিলেট জেলা প্রশাসকের নির্দেশে রাত নয়টার দিকে মাঠে নামেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। অভিযানে নেতৃত্ব দেন সিলেট সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুমন্ত ব্যানার্জি ও জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মেজবাহ উদ্দিন। অভিযানে সহযোগিতা করে সিলেট নগর পুলিশ। নগরের পাইকারি বাজার কালীঘাটে ক্রেতাদের কাছে অতিরিক্ত দামে লবণ বিক্রি করায় মেসার্স শিমুল স্টোরকে ৪৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অভিযানে লবণ পরিবহন করা তিনটি ঠেলাগাড়িতে থাকা প্রায় ৬০০ কেজি লবণের মালিক পাওয়া না যাওয়ায় জব্দ করা হয়।
সিলেট নগরের মির্জাজাঙ্গাল এলাকার মুবিন স্টোরের পরিচালক জালাল আহমদ জানান, সোমবার সন্ধ্যার পর থেকে প্রায় ২০ কেজি লবণ বিক্রি করেছেন। কেজিপ্রতি কত টাকায় বিক্রি করেছেন জানতে চাইলে তিনি তা বলতে চাননি।নগরের মণিপুরী রাজবাড়ী বাসিন্দা সুমিত দেব প্রথম আলোকে বলেন, ‘কেজিতে অতিরিক্ত ১০ টাকায় ৪ কেজি লবণ খুচরা দোকান থেকে কিনেছি।’ লবণের মূল্যবৃদ্ধির খবর কোথা থেকে পেয়েছেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, লোকজন বলাবলি করছিল লবণের দাম বেড়েছে।
সিলেট সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুমন্ত ব্যানার্জি বলেন, সিলেটের পাইকারি ও খুচরা বাজারগুলোতে লবণের মূল্যবৃদ্ধির গুজব ছড়ানো হয়েছিল। গুজব ঠেকাতে মাঠে নামেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। অতিরিক্ত দামে লবণ বিক্রি করার দায়ে ভোক্তা অধিকার আইনে একটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা ও লবণের মালিক পাওয়া না যাওয়ায় প্রায় ৬০০ কেজি জব্দ করা হয়েছে। জব্দ করা লবণগুলো নিলামে বিক্রি করা হবে।
‘২০০ টাকা হবে লবণের কেজি’ গুজব-
বাজারের প্রায় অর্ধশতাধিক পাইকারি ও খুচরা দোকানে লাইন দিয়ে খুচরা বিক্রেতা ও ক্রেতাদের লবণ কিনতে দেখা গেছে।তবে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাজার মনিটরিংয়ে নামতে হয়েছে।সরেজমিনে দেখা গেছে, গত সোমবার দিনগত রাত থেকে কোটালীপাড়া উপজেলায় লবণের কেজি ২০০ টাকা হবে এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ে।এ কারণে মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে ঘাঘর বাজারে লবণের ডিলার, পাইকারি বিক্রেতা ও খচরা বিক্রেতাদের দোকানে লবণ কেনার জন্য ক্রেতারা হুমড়ি খেয়ে পড়েন।
দুপুর ১২টার মধ্যে ডিলার ও অনেক পাইকারি ব্যবসায়ীর গোডাউন লবণশূন্য হয়ে যায়। খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসন দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য মাঠে নামে।হঠাৎ করে এভাবে লবণ কেনার কারণে অনেক ডিলার বা পাইকারি ব্যবসায়ীরাও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।মধুমতি সল্টের কোটালীপাড়ার ডিলার জালাল শেখ বলেন, একটি গুজবের ওপরে ভর করে জনগণ হঠাৎ করে এভাবে লবণ কেনা শুরু করেছেন। আমরা পূর্বের দামেই লবণ বিক্রি করছি। এই মুহূর্তে দাম বাড়ার কোনো সম্ভাবনাও নেই। পাইকারি ব্যবসায়ী গনেশ সাহা বলেন, সকাল থেকেই আমাদের দোকানে লবণ কেনার জন্য সাধারণ জনগণ ও খুচরা বিক্রেতারা ভিড় করেন। দুপুর ১২টার মধ্যে আমাদের দোকানের সব লবণ বিক্রি হয়ে যায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলার নাগরা গ্রামের এক ভ্যানচালক বলেন, গতকাল রাতে ঢাকা থেকে আমার এক আত্মীয় ফোন করে জানিয়েছেন লবণের কেজি ২০০ টাকা হবে। তাই মঙ্গলবার সকালে এসেই ঘাঘর বাজার থেকে ১০ কেজি লবণ কিনেছি।উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মহসিন উদ্দিন বলেন, লবণের মূল্য বৃদ্ধির গুজবের কারণে ঘাঘর বাজারে মঙ্গলবার সকাল থেকেই লবণ কেনার হিড়িক পড়ে যায়। খবর পেয়ে আমরা দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বাজারে ছুটে আসি। প্রত্যেক ডিলারকে বলে দিয়েছি পূর্বে তারা ব্যবসায়ীদের কাছে যে পরিমাণ লবণ বিক্রি করতো এখন সেই পরিমাণ বিক্রি করতে হবে। এ ছাড়া খুচরা বিক্রেতাদেরকে ১কেজি থেকে ২ কেজির ওপরে লবণ বিক্রি করতে নিষেধ করেছি।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার এস এম মাহফুজুর রহমান বলেন, এ মুহূর্তে লবণের কোনো সংকট নেই। তাই দাম বৃদ্ধির কোনো সম্ভাবনাও নেই। যদি কোনো ডিলার বা ব্যবসায়ী বাজার মূল্যের চেয়ে বেশি দামে লবণ বিক্রি করে তা হলে তার বিরুদ্ধে আইনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।দেশে লবণের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে বলে জানিয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়। দেশে চরম লবণ সংকটের গুজবে এবং কোনো কোনো জায়গায় লবনের দাম বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে একথা জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দেশে বর্তমানে সাড়ে ৬ লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি ভোজ্য লবণ মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের লবণ চাষিদের কাছে ৪ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টন এবং বিভিন্ন লবণ মিলের গুদামে ২ লাখ ৪৫ হাজার মেট্রিক টন লবণ মজুদ রয়েছে।এছাড়া সারাদেশে বিভিন্ন লবণ কোম্পানির ডিলার, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পর্যাপ্ত লবণ মজুদ রয়েছে। পাশাপাশি চলতি নভেম্বর মাস থেকে লবণের উৎপাদন মৌসুম শুরু হয়েছে। এরইমধ্যে কক্সবাজার জেলার কুতুবদিয়া ও মহেশখালী উপজেলায় উৎপাদিত নতুন লবণও বাজারে আসতে শুরু করেছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, একটি স্বার্থান্বেষী মহল লবণের সংকটের গুজব ছড়িয়ে অধিক মুনাফা লাভের আশায় লবণের দাম অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এ ধরনের গুজবে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য শিল্প মন্ত্রণালয় সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।বিবৃতিকে বলা হয়, দেশে প্রতি মাসে ভোজ্য লবণের চাহিদা থাকে কম-বেশি ১ লাখ মেট্রিক টন। অন্যদিকে লবণের মজুদ আছে সাড়ে ৬ লাখ মেট্রিক টন। সে হিসাবে লবণের কোনো ঘাটতি বা সংকট হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
উল্লেখ্য, লবণ সংক্রান্ত বিষয়ে তদারকির জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) প্রধান কার্যালয়ে এরই মধ্যে একটি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। এর নম্বর: ০২-৯৫৭৩৫০৫ (ল্যান্ড ফোন), ০১৭১৫-২২৩৯৪৯ (সেল ফোন)। লবণ সংক্রান্ত যে কোনো তথ্যের জন্য কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। প্রসঙ্গত, লবণ সংকটের গুজব ছড়িয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে হঠাৎ করে দাম বেড়ে যায়। কোথাও কোথাও একশ’ টাকা কেজি দরে লবণ বিক্রি হচ্ছে।



