প্রশ্ন ফাঁসচক্রের ৪৬ ক্রিমিনাল লালঘরে
স্টাফ রিপোর্টার : ডিজিটাল ডিভাইস জালিয়াত চক্রের অন্যতম হোতা হাফিজুর রহমান হাফিজ ও মাসুদ রহমান তাজুলকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে এ পর্যন্ত মোট ৪৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে অর্গানাইজড ক্রাইম সিআইডি। এর ফলে এ যাবৎকালের সর্ববৃহৎ প্রশ্নফাঁস চক্রটির মূলোৎপাটিত হয়েছে।আজ বৃহস্পতিবার সিআইডির লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া সেলের অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার শারমিন জাহান এ তথ্য জানান।
বলা হয়েছে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষা এবং বিসিএস, ব্যাংকসহ সরকারি বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় অর্গানাইজড ক্রাইম সিআইডির অত্যন্ত চৌকস টিম টানা দেড় বছরের নিরলস পরিশ্রম, সুকৌশল ও দক্ষতায় নিয়োগ ও ভর্তিতে প্রশ্নফাঁস ও ডিজিটাল জালিয়াতির দুটি চক্রকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনে।
গত ১৯ অক্টোবর ২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি হলে অভিযান চালিয়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও জালিয়াত চক্রের সঙ্গে জড়িত রানা ও মামুন নামে দুই শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় ২০ অক্টোবর শাহবাগ থানায় একটি মামলা রজু হয়। পরে গ্রেপ্তারকৃত দুই শিক্ষার্থীর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরীক্ষার হল থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী রাফিকে।এর পর গ্রেপ্তারকৃতদের দেওয়া তথ্য ও প্রযুক্তিগত অনুসন্ধানের মাধ্যমে প্রশ্ন পেয়ে ঢাবিতে ভর্তি হওয়া সাত শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। পরে তাদের কাছ থেকে জানা যায়, পরীক্ষার আগেই প্রেস থেকে ফাঁস হয়ে যেত ঢাবির প্রশ্ন।
এ চক্রের মাস্টারমাইন্ড নাটোর জেলার ক্রীড়া কর্মকর্তা রাকিবুল হাসান এছামী, প্রেস কর্মচারী খান বাহাদুর, তার আত্মীয় সাইফুল, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বনি ও মারুফসহ মোট ২৮ আসামিকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে চক্রের মূল উৎপাটন করা হয়। সংঘবদ্ধ এই চক্রটি ২০১৫ এবং ২০১৬ সালে প্রেস থেকে প্রশ্ন ফাঁস করে এবং সাভারের একটি বাসায় ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের পড়ায়।
ভর্তি ও নিয়োগ পরীক্ষায় দুভাবে জালিয়াতি হয়। একটি চক্র আগের রাতে প্রশ্নপত্র ফাঁস করে। অন্য চক্রটি পরীক্ষা শুরুর কয়েক মিনিট আগে বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে প্রশ্নপত্র নিয়ে তা দ্রুত সমাধান করে ডিজিটাল ডিভাইসের মাধ্যমে তা পরীক্ষার হলে সরবরাহ করে। তবে আগের রাতে প্রেস থেকে ফাঁস করা চক্রটি চিহ্নিত করা গেলেও ডিভাইস চক্রটি বাকি ছিল।
তবে টানা কয়েকটি সাড়াশি অভিযানে নিয়োগ ও ভর্তি পরীক্ষায় ডিজিটাল জালিয়াত চক্রটির মাস্টারমাউন্ড বিকেএসপির সহকারী পরিচালক অলিপ কুমার বিশ্বাস, মূলহোতা ৩৮তম বিসিএসে নন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত ইব্রাহীম মোল্যা, বিএডিসির সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল, আইয়ুব আলী বাঁধনসহ মোট ৯ জনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম। গত কয়েক বছর ধরে এই চক্রটি জালিয়াতি করছিল বলে জানা যায়।
এ ছাড়া পরীক্ষা শুরুর কয়েক মিনিট আগে পরীক্ষার কেন্দ্র থেকে প্রশ্নপত্র সরবরাহের অভিযোগে রাজধানীর অগ্রণী স্কুলের ইংরেজির শিক্ষক গোলাম মোহাম্মদ বাবুল, অফিসের পিওন আনোয়ার হোসেন মজুমদার ও মো. নুরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়।একই অভিযোগে ধানমন্ডি গভ. বয়েজ স্কুলের সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষক হোসনে আরা বেগম এবং পিওন হাসমত আলী শিকদারকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। গ্রেপ্তারের সময় হাসমতের কাছে ওইদিনের বিসিএস লিখিত পরীক্ষার কয়েক কপি প্রশ্নপত্র এবং ৬০ হাজার টাকা পাওয়া যায়।
চক্রটির ছয়জন মূল হোতার মধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার করা গেলেও জনতা ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার হাফিজুর রহমান হাফিজ এবং ব্যবসায়ী মাসুদ রহমান তাজুল ছিলেন ধরা ছোঁয়ার বাইরে। সর্বশেষ গত কয়েকদিনের অভিযানে এ দুজনকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।অলিপ, ইব্রাহীম, মোস্তফা, তাজুল, হাফিজ এবং বাঁধন- ডিভাইস জালিয়াতির এই ছয় মূল হোতার আবার প্রত্যেকের নিজস্ব সহযোগী চক্র ছিল। সর্বশেষ অভিযানে এদের সহযোগীদের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সর্বশেষ গ্রেপ্তারকৃত ৯ জন হলেন- হাফিজুর রহমান হাফিজ (জনতা ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার), আব্দুর রহমান রমিজ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসির দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী), রিমন হোসেন (গ্রীণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিখ্ষার্থী), সাইদুর রহমান সাঈদ (ঢাবির ফার্মাসীর তৃতীয় বয়ের শিক্ষার্থী), মোহায়মিনুল ইসলাম (ঢাবির ফার্মাসীর চতুর্থ বয়ের শিক্ষার্থী), মাসুদ রহমান তাজুল (ব্যবসায়ী), জাহাঙ্গীর আলম (অগ্রণী ব্যাংকের ক্যাশ অফিসার), মোশারফ হোসেন মোসা (ঢাকা কলেজের পিওন), অসীম বিশ্বাস (ঢাকা কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী)।
এই চক্রটি অসুদপায় অবলম্বনের মাধ্যমে গড়ে তুলেছিল বিশাল বিত্ত-বৈভব। তাদের অবৈধ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার লক্ষ্যে ইতিমধ্যে উত্তরা পশ্চিম থানায় মানিলন্ডারিং আইনে মামলা রজু করা হয়েছে। মামলা নং-০৩। আগামী দিনে এই ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানিয়েছে সিআইডি।



