প্রকাশ্য হামলাকারীদের ভয় কেন?
এস রহমান : ‘মানুষ মানুষের জন্যে- জীবন জীবনের জন্যে-একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারেনা’ ভূপেন হাজারিকার সেই কালজয়ী গান এখনো মানুষের হৃদয়ে আলোড়ন তুললেও প্রকাশ্য দিবালোকে হামলাকারীদের ভয়ে নিজেকে বাঁচাতে এখন কেউ এগিয়ে আসেনা। যার ফলে বরগুনার রিফাত কে সর্বশেষ প্রাণ দিতে হলো। মানুষ দাড়িয়ে দাড়িয়ে দেখেছে ভিডিও করে নেটে ছেড়ে দিয়েছে কিন্তু কেউ বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি।
একই অবস্থা ঘটেছিল ২০১৬ সালে সিলেট এমসি কলেজের ছাত্রী খাদিজা আক্তার নার্গিসকে কোপানোর সময়ও। এছাড়াও ব্লগার অভিজিৎ রায়, বিশ্বজিৎকে পুরনো ঢাকায় প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। প্রকাশ্যেই কুপিয়ে রক্তাক্ত করা হয় লেখক হুমায়ূন আজাদকে। দেখা গেছে, এসব ঘটনাতে প্রতক্ষদর্শী অনেকে ছবি তুললেও কেউ রক্ষা করতে এগিয়ে যায়নি। সবাই নিজেকে বাঁচিয়েই ভিডিও করে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তা ছেড়ে দিয়ে নিজেকে রক্ষা করেছে।
কিন্তু কেন এমন হচ্ছে?? মানুষের মানবিকতা কি লোপ পেতে শুরু করেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু হামলাকারীর ভয় নয়, পুলিশি হয়রানির শিকার হওয়ার ভয়ে এখন আর কেউ কাউকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসে না।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরর সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নেহাল করিম এজন্য দোষ দিচ্ছেন মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়কে৷ তিনি বলেন, প্রথমত আমাদের সমাজ থেকে মানবিকতা অনেক দূরে চলে গেছে৷ এখন শিক্ষায় কোনো মানবিক বা নৈতিক পাঠ নেই৷ অভিভাবকরাও সন্তানদের প্রতিবাদ করার পরিবর্তে নিজেকে রক্ষা বা বাঁচানোর কথা বলেন৷ আর এটা হয়েছে নিরাপত্তা ও বিচারহীনতার কারণে৷ এখানে এখন প্রতিবাদ করলে, কোনো বিপদগ্রস্তকে উদ্ধার করলে উল্টো নিজে বিপদে পড়তে হয়।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির বুলবুল বলেন, কেউ যদি হত্যাকান্ডের শিকার হন বা বিপদে পড়েন তখন যারা তাকে রক্ষায় এগিয়ে যান, তাদের শতকরা ৯৯ ভাগ উল্টো পুলিশি হয়রানির শিকার হন৷ পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে যাকে পায় তাকে ধরে আটক করে থানায় নেয় ৷ কে অপরাধী আর কে উদ্ধারকারী তা দেখে না৷ এরপর শুরু হয় বাণিজ্য৷তাছাড়া অপরাধীরা অনেক ক্ষমতাবান৷ কেউ এগিয়ে গেলে তাকেও শেষ করে দিতে পারে তারা৷ তিনি মনে করেন, এই যখন পরিস্থিতি, তখন দূরে থেকে ঘটনার ভিডিও করাও একটা সাহসের কাজ৷ এর মাধ্যমে অন্তত অপরাধী চিহ্নিত হয়৷ বিচার পাওয়া যায়৷ রিফাতের ঘটনার ভিডিও যদি না থাকতো, তাহলে এটা ধামাচাপা পড়ে যেতো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান মনে করেন, সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে- এই আদর্শ নগর সভ্যতায় আর নেই৷ এটা থাকা সম্ভবও নয়। এখানে রাষ্ট্র ও সরকারকে ভূমিকা পালন করতে হবে৷ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হলে ৯১১-এ ফোন করে দিতো, সাথে সাথে পুলিশ এসে পড়তো। আমাদের এখানে ৯৯৯ আছে কিন্তু সাধারণ মানুষ তত জানে না৷ যদি রিফাতকে রক্ষায় কেউ এগিয়ে যেতেন, তিনিও হত্যার শিকার হতে পারতেন৷
আবার যারা অপরাধী তারাও গণপিটুনিতে নিহত হতে পারতো।তখন আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার প্রশ্ন উঠতো। এখন মানুষ নিজের নিরাপত্তা নিয়ে বেশি ভাবে৷ সে নিজে নিরাপদ থাকতে চায়।তিনি বলেন, ভিডিও করার ঘটনা শুধু আমাদের দেশে নয়, বিশ্বের উন্নত দেশেও ঘটে৷ নিজে নিরাপদ থেকে ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরার এই প্রবণতা খারাপ নয়, বরং আমি এটাকে ভালো মনে করি৷ এর মাধ্যমে অপরাধীদের চিাহ্নত করা যায়৷



