• রোববার , ১ নভেম্বর ২০২৬

গার্মেন্টস আন্দোলনে উত্তাল মিরপুর


প্রকাশিত: ৫:৫০ পিএম, ১ নভেম্বর ২৬ , রোববার

নিউজটি পড়া হয়েছে ১২ বার

পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সাউন্ড গ্রেনেড, জলকামান এবং টিয়ারশেল (কাঁদুনে গ্যাস) ব্যবহার করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায়।সংঘর্ষের রেশ মিরপুর-১০ থেকে ১১ নম্বর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
 স্টাফ রিপোর্টার/ মিরপুর পল্লবী প্রতিনিধি : ন্যূনতম মাসিক মূল বেতন ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে আজ রবিবার সকাল থেকে রাজধানীর মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের ব্যাপক বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকা উত্তাল হয়ে ওঠে। আন্দোলনরত শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে মিরপুর এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সংঘর্ষ চলাকালে পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যানে আগুন দেওয়ার পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসের একটি গাড়িতেও ভাঙচুর চালানো হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল মেট্রোরেলের পাঁচটি স্টেশন।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আজ সকাল ৯টা থেকেই মিরপুরের বিভিন্ন এলাকার তৈরি পোশাক কারখানার শত শত শ্রমিক মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে এসে জড়ো হতে থাকেন। তারা ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকায় উন্নীত করার দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন এবং সড়ক অবরোধ করেন। অবরোধের ফলে মিরপুর, পল্লবী, রোকেয়া সরণি এবং গাবতলী অভিমুখী সড়কগুলোতে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে তীব্র যানজট ও সাধারণ মানুষের চরম ভোগান্তি সৃষ্টি হয়।
পুলিশের সাথে সংঘর্ষ ও গাড়িতে অগ্নিসংযোগ
সড়ক সচল করার জন্য বেলা সোয়া ১১টার দিকে পুলিশ আন্দোলনকারীদের বুঝিয়ে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে শ্রমিকেরা রাস্তা ছাড়তে অস্বীকৃতি জানালে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে শ্রমিকেরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করেন। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সাউন্ড গ্রেনেড, জলকামান এবং টিয়ারশেল (কাঁদুনে গ্যাস) ব্যবহার করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায়।
সংঘর্ষের রেশ মিরপুর-১০ থেকে ১১ নম্বর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। দুপুর ১২টার দিকে মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে (পূরবী সিনেমা হলের সামনে) রাখা পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেয় উত্তেজিত আন্দোলনকারীরা। মুহূর্তের মধ্যে গাড়িটি সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
ফায়ার সার্ভিসের গাড়িতে ভাঙচুর
পুলিশের গাড়িতে আগুন লাগার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তবে তারা আগুন নেভানোর কাজ শুরু করার আগেই আন্দোলনকারীদের হামলার মুখে পড়ে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা ফায়ার সার্ভিসের গাড়িতে ইটপাটকেল ছুড়ে সামনের কাচ ভেঙে ফেলে। এই হামলায় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ির চালক আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
মেট্রোরেল চলাচল বিঘ্নিত
সড়কে এই নজিরবিহীন সহিংসতা ও মেট্রোরেল স্টেশনের ঠিক নিচে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় যাত্রী সাধারণের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। দুপুর ১২টার পর থেকে মেট্রোরেলের মিরপুর-১০, মিরপুর-১১, পল্লবী, শেওড়াপাড়া এবং কাজীপাড়া স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ওই স্টেশনগুলোতে ট্রেন না থামিয়ে সরাসরি পার হয়ে যায়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পদক্ষেপ ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অপরাধ ও উত্তর বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ মহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, পোশাকশ্রমিকদের নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণের জন্য সরকার ইতিমধ্যেই ওয়েজ বোর্ড (মজুরি বোর্ড) গঠন করেছে। তাই সড়ক অবরোধ করে জনগণের ভোগান্তি সৃষ্টির আর কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। পুলিশের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, শ্রমিকদের এই আন্দোলনের আড়ালে কোনো সরকারবিরোধী বা রাষ্ট্রবিরোধী চক্র নাশকতার উদ্দেশ্যে উসকানি দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে পুলিশ ন্যূনতম বলপ্রয়োগ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে এবং কোনো বড় ধরনের হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
সহিংসতার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) হাসান মোহাম্মদ নাসের রিকাবদার জানিয়েছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সর্বোচ্চ ধৈর্য সহকারে কাজ করেছে। পুলিশের ওপর হামলা এবং সরকারি সম্পত্তিতে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থল থেকে ১৫-২০ জনকে আটক করা হয়েছে।
পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক
বিকেলের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মিরপুর এলাকার পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে। দুপুর ২টার পর থেকে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের যৌথ তৎপরতায় এবং আলোচনার মাধ্যমে শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়। বিকেল ৪টার দিকে শ্রমিকেরা সড়ক থেকে পুরোপুরি সরে গেলে মিরপুর-১০, ১১ এবং ১২ নম্বর সড়কের অবরুদ্ধ অংশগুলো পরিষ্কার করা হয় এবং যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণরূপে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।
একই সাথে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পর বন্ধ থাকা স্টেশনগুলো পুনরায় সচল করা হয়েছে এবং বর্তমানে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক সূচি অনুযায়ী চলছে। তবে নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা যেন না ঘটে, সেজন্য পুরো মিরপুর এলাকা জুড়েই অতিরিক্ত পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে মোতায়েন রয়েছে।