• বৃহস্পতিবার , ২৯ অক্টোবর ২০২৬

কে মারলো তাহসীফ কে?


প্রকাশিত: ৭:৩৮ পিএম, ২৯ অক্টোবর ২৬ , বৃহস্পতিবার

নিউজটি পড়া হয়েছে ৭ বার

৫ আগস্টের ঐতিহাসিক ভিডিও বনাম সাবেক বিমান বাহিনী কর্মকর্তার রহস্যময় মৃত্যু: এটি কি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড?
হাত মুঠ করে থাকা প্রমাণ করে, মৃত্যুর পূর্বে তিনি তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন অথবা কোনো ধস্তাধস্তির শিকার হয়েছিলেন।
  লাবণ্য চৌধুরী  : বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি (২৮)-এর মরদেহ তুরাগ নদ থেকে উদ্ধারের পর, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের একটি আলোচিত ভিডিও চিত্রের যোগসূত্র নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় চলছে। তাহসিফের পরিবার, সহকর্মী এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি বড় অংশের দাবি—ঐতিহাসিক সেই ভিডিও ধারণের কারণেই তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে বলে অভিযোগ তোলা হচ্ছে। এসব ঘটনা ও পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণ এবং এই রহস্যময় মৃত্যুর নেপথ্যে কে তা নিয়ে চলছে নানা অনুসন্ধানী বিশ্লেষণ!
৫ আগস্টের সেই ভিডিও এবং তাহসিফের সম্পৃক্ততা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সময় ঢাকার আকাশে সামরিক হেলিকপ্টার ও বিমানের উড়োজাহাজ ফ্লাইং বেশ কিছু ফুটেজ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। বিভিন্ন সূত্র ও তাহসিফের পরিচিতদের দাবি, এর মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্লোজ-আপ ভিডিও ধারণ করেছিলেন স্বয়ং তাহসিফ।
    • চাকরি ত্যাগ ও নিরাপত্তাহীনতা: এই ঘটনার কিছুদিন পর তাহসিফ বিমান বাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে দেন।
    • বাবার বক্তব্য: তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম হেলাল গণমাধ্যমকে জানান, চাকরি ছাড়ার পর থেকেই তাহসিফ এক ধরনের গভীর মানসিক চাপ ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, “আমি নিরাপদ নই, কেউ আমার ওপর নজর রাখছে।”

কেন একে ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ বলা হচ্ছে?
তদন্তকারী দল এখনও নিশ্চিত করে কিছু না বললেও, লাশ উদ্ধারের ধরন এবং নিখোঁজ হওয়ার প্রেক্ষাপট একটি সুপরিকল্পিত ‘টার্গেটেড কিলিং’-এর দিকেই ইঙ্গিত করে।
  • লুটপাটের কোনো উদ্দেশ্য ছিল না: সাধারণত নদী বা নির্জন এলাকায় অপরাধের পেছনে ছিনতাই বা ডাকাতির উদ্দেশ্য থাকে। কিন্তু তাহসিফের লাশ যখন নদী থেকে তোলা হয়, তখন তাঁর পকেটে অত্যন্ত দামি আইফোন এবং হাতে হাতঘড়ি অক্ষত অবস্থায় ছিল। অপরাধীরা যদি পেশাদার খুনি না হতো, তবে এই মূল্যবান আলামতগুলো রেখে যেত না।
  • মোটরসাইকেল গায়েব করার নিখুঁত ছক: তাহসিফ যে মোটরসাইকেলটি নিয়ে বের হয়েছিলেন, সেটি উদ্ধার করা যায়নি। তদন্তকারীদের ধারণা, তাহসিফকে অন্য কোথাও হত্যা করে বা অচেতন করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে এবং তাঁর যাতায়াতের মাধ্যম (বাইক) ও সম্ভাব্য ডিজিটাল ট্র্যাকিং এড়াতে বাইকটি দূরে কোথাও লুকিয়ে ফেলা হয়েছে।
    • রহস্যজনক শেষ মেসেজ: ২৭ অক্টোবর রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফ তাঁর মাকে ভয়েস মেসেজে বলেন, “আম্মু, আমি আসছি।” অথচ এর ঠিক পর থেকেই তাঁর ফোন বন্ধ হয়ে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, ঘাতকরা হয়তো তাঁকে দিয়ে জোরপূর্বক এই মেসেজটি কাটিয়েছিল যাতে পরিবার ভাবেন তিনি নিরাপদে ফিরছেন এবং তাৎক্ষণিক কোনো খোঁজাখুঁজি বা পুলিশি তৎপরতা শুরু না হয়।

সুরতহাল রিপোর্টের অমীমাংসিত সূত্র
নৌ পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে দেখা গেছে তাহসিফের শরীরে বাইরে থেকে ধারালো অস্ত্রের আঘাত নেই। তবে দুটি বিষয় সন্দেহজনক:
    • মুষ্টিবদ্ধ হাত: নদী থেকে উদ্ধারের সময় তাঁর দুই হাত মাথার সামনে বাঁকানো এবং হাত মুঠ করা (মুষ্টিবদ্ধ) ছিল। চিকিৎসকদের মতে, পানিতে ডুবে স্বাভাবিক মৃত্যু হলে বা স্বেচ্ছায় ঝাঁপ দিলে শরীর সাধারণত শিথিল থাকে। হাত মুঠ করে থাকা প্রমাণ করে, মৃত্যুর পূর্বে তিনি তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন অথবা কোনো ধস্তাধস্তির শিকার হয়েছিলেন।
    • অভ্যন্তরীণ আঘাতের আশঙ্কা: শরীর ফোলা ও নাক দিয়ে রক্ত আসার কারণ বিষপ্রয়োগ, শ্বাসরোধ নাকি পানিতে চুবিয়ে মারা—তা এখনও স্পষ্ট নয়।

‘দ্বীপ’ নামের সেই রহস্যময় জুনিয়র
घटनाর মূল সূত্র লুকিয়ে আছে ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যার সেই ফোনে। ‘দ্বীপ’ নামের এক জুনিয়র বন্ধু তাহসিফকে উত্তরার বাসার নিচে ডেকে নেয়। দ্বীপ পুলিশের কাছে দাবি করেছে, রাত ১২টা পর্যন্ত তাহসিফ তাদের সঙ্গেই ছিল। প্রশ্ন উঠছে, ১২টার পর থেকে রাত ১টা ৩৫ মিনিটের মেসেজ এবং পরবর্তী সময়ে তাহসিফ কার সাথে ছিলেন? উত্তরা থেকে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট পর্যন্ত তিনি কার সাথে গেলেন?
অনুসন্ধানের সারসংক্ষেপ
নিরাপত্তাহীনতার ভয়, ৫ আগস্টের স্পর্শকাতর ভিডিওর নেপথ্য কারিগর হওয়া এবং লাশ উদ্ধারের অস্বাভাবিক ধরন—সব মিলিয়ে তাহসিফের মৃত্যুকে সাধারণ দুর্ঘটনা বা আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। প্রাথমিকভাবে এটিকে একটি পরিকল্পিত এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হত্যাকাণ্ড হিসেবেই দেখছেন তাঁর পরিবার ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের ভিসেরা রিপোর্টের ল্যাব টেস্টের ফলাফল এবং নিখোঁজ মোটরসাইকেলের সন্ধান মিললেই এই হাই-প্রোফাইল রহস্যের আসল রূপ উন্মোচিত হবে।