মানুষরুপী অমানুষ আদম ব্যবসায়ীরা হলদিপুর গ্রামবাসীর স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে-ভূমধ্যসাগরে ২২ জনের করুণ মৃত্যু
অভিবাসন প্রত্যাশীর মধ্যে ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে।গ্রিস উপকূলে সেই নৌযান থেকে শুক্রবার জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ২৬ জনকে, যাদের মধ্যে ২১ জনই বাংলাদেশি।নৌযানটির বেঁচে ফেরা অভিযাত্রীরা বলছেন, মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মরদেহ ভূমধ্যসাগরে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
লাবণ্য চৌধুরী সুনামগঞ্জ থেকে ফিরে : মানুষরুপী অমানুষ আদম ব্যবসায়ীরা সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া হলদিপুর গ্রামবাসীর স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে। পুরো এলাকায় চরছে কান্না আর আর্তনাদ। সাগরে নিখোঁজ নাইমের স্বজনদের পরিবারে কান্না থামছে না। কেঁদে আকুল চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়নের চিলাউড়া মাঝপাড়া গ্রামের আঁখি বেগম বললেন, ‘দলাল আমার ফুত নাইমরে সাগরো ফালাইয়া মারিলিছে। তোমরা তারে আইন্যা দেও। তোমরা দলালের বিচার করো’- এভাবে ডুকরে ডুকরে কান্না করছিলেন তিনি। আঁখি বেগমের ছেলে নাইম মিয়া অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার জন্য বাড়ি ছেড়েছিলেন।
এদিকে উত্তর আফ্রিকা থেকে ইউরোপ যেতে সাগরে রাবারের নৌকা ভাসানো একদল অভিবাসন প্রত্যাশীর মধ্যে ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ।গ্রিস উপকূলে সেই নৌযান থেকে শুক্রবার জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ২৬ জনকে, যাদের মধ্যে ২১ জনই বাংলাদেশি। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম দৈনিক সত্যকথা প্রতিদিন কে জানিয়েছেন,
ইউরোপ যেতে সাগরে রাবারের নৌকা ভাসানো একদল অভিবাসন প্রত্যাশীর মধ্যে ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে।গ্রিস উপকূলে সেই নৌযান থেকে শুক্রবার জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ২৬ জনকে, যাদের মধ্যে ২১ জনই বাংলাদেশি।নৌযানটির বেঁচে ফেরা অভিযাত্রীরা বলছেন, মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মরদেহ ভূমধ্যসাগরে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে কয়েকজনের সঙ্গে নাইমও ভূমধ্যসাগরে মারা যান। শনিবার তার মৃত্যুর খবর জানতে পারে পরিবার।তার পর থেকেই দিনরাত ছেলের জন্য কেঁদে বুক ভাসাচ্ছেন আঁখি বেগম। তার গগনবিদারি চিৎকারে সান্ত্বনা দিতে আসা প্রতিবেশী ও স্বজনরাও কাঁদছিলেন। তারা নীরবে চোখের জল ফেলছিলেন।স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পুলিশ প্রশাসন ও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা বলছেন, ভূমধ্যসাগরে সুনামগঞ্জের তিন উপজেলার ১২ জনের মৃত্যুর খবর তারা জানতে পেরেছেন। এর মধ্যে জগন্নাথপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের মোট ছয়জন মারা গেছেন।
এ ছাড়া দিরাই উপজেলার পাঁচজন এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার একজনের মৃত্যুর সংবাদ এসেছে।সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) সুজন সরকার দৈনিক সত্যকথা প্রতিদিন কে বলেন, “বেসরকারি নানা মাধ্যম থেকে খবর পেয়ে আমরা ১২ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছি। আমরা আরো তথ্য সংগ্রহ করছি। দালাল হিসেবে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া দৈনিক সত্যকথা প্রতিদিন কে বলেন, “সুনামগঞ্জের যেসব যুবক লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে সাগরে মারা গেছেন তাদের বিষয়ে তথ্যের জন্য প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কাছে জানতে চেয়েছি। পাশাপাশি দালালদের তালিকা করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছি। দালালদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
প্রশাসন যাদের মৃত্যুর খবর পেয়েছে তারা হলেন- জগন্নাথপুরের চিলাউড়া শামছুল হকের ছেলে ইজাজুল হক রেজা (২৩), একই গ্রামের দুলন মিয়ার ছেলে নাইম মিয়া (২৪), রানীগঞ্জ ইউনিয়নের টিঁয়ারগাঁও গ্রামের আখলুছ মিয়ার ছেলে শায়েক আহমদ জনি (২৫), পাইলগাঁও (হাড়গ্রাম) গ্রামের প্রাক্তন শিক্ষক হাবিবুর রহমানের ছেলে আমিনুর রহমান (২৬), ইছগাঁও গ্রামের বশির মিয়ার ছেলে আলী আহমদ (২২), দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের সাইদ সরদারের ছেলে নূরুজ্জামান সরদার ময়না (৩০), ইসলাম উদ্দিনের ছেলে শাহান মিয়া (২৫), আব্দুল গণির ছেলে সাজিদুর রহমান (২৮), উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের ররনারচর গ্রামের আব্দুল মালিকের ছেলে যুবদল নেতা মজিবুর রহমান (৩৮), জগদল ইউনিয়নের বাসুরি গ্রামের সোহানুর রহমান (২৮), করিমপুর ইউনিয়নের মাটিয়াপুর গ্রামের তায়েফ মিয়া (৩০)।
এ ছাড়া দোয়ারাবাজার উপজেলার দোহালিয়া ইউনিয়নের কবিরপুর গ্রামের ফয়েজ উদ্দিনের ছেলে আবু ফাহিমও মারা গেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।জগন্নাথপুর উপজেলার চিলাউড়া গ্রামে যুবকদের মৃত্যুর খবর আসার পর থেকেই তাদের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। মা-বাবা, ভাই-বোনেরা বিলাপ করছেন।নাইম মিয়ার মা আঁখি বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন, “আমার ফুতরে মারিলাইছে দলালে। আমি দলালের বিচার চাই। আমার মতো আরো অনেক মার বুক খালি করছে দলাল। দলালের কঠিন বিচার চাই আমি।”
নাইম মিয়ার পিতা দোলন মিয়া বলেন, “গ্রামের আজিজুল ইসলামের মাধ্যমে ১৩ লাখ টাকায় আমার ছেলেকে লিবিয়া হয়ে গ্রিস নেওয়ার চুক্তিতে পাঠিয়েছিলাম। সেখানে যাওয়ার পর লিবিয়ায় জিম্মি করে আরো পাঁচ লাখ টাকা নেয়।২১ মার্চ তাকেসহ ট্রলারে অনেকজনকে নিয়ে গ্রিসের উদ্দেশে রওনা দেয়। এখন শনিবার খবর পেয়েছি, আমার ছেলে মারা গেছে। দালাল আমাকে নিঃস্ব করে দিয়েছে।”
ভূমধ্যসাগরে ২২ জনের মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত দেশি-বিদেশি চক্র
যেসব যুবক মারা গেছে বলে খবর এসেছে, তাদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা এক থেকে পাঁচ মাস আগে অবৈধভাবে ইউরোপের উদ্দেশে যাত্রা করেন। ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকার চুক্তিতে তারা এ পথে যাত্রা করেন। সমুদ্রে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে তারা মারা গেছেন। পরে তাদের মরদেহ সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।পুলিশ বলছে, গ্রিসের উপকূলের একটি দ্বীপের কাছে লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশে ছাড়া মানবপাচারকারী চক্রের নৌকা আটকের পর শনিবার এই হতাহতের বিষয়টি সামনে আসে।
ইউরোপের পথে ভূমধ্যসাগরে ২২ জনের মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত দেশি-বিদেশি চক্রের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
রোববার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেছেন, বেঁচে ফেরা বাংলাদেশিদের বিষয়ে পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার।উত্তর আফ্রিকা থেকে ইউরোপ যেতে সাগরে রাবারের নৌকা ভাসানো একদল অভিবাসন প্রত্যাশীর মধ্যে ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে।গ্রিস উপকূলে সেই নৌযান থেকে শুক্রবার জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ২৬ জনকে, যাদের মধ্যে ২১ জনই বাংলাদেশি।নৌযানটির বেঁচে ফেরা অভিযাত্রীরা বলছেন, মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মরদেহ ভূমধ্যসাগরে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে এক প্রশ্নে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, দেশি-বিদেশি যে চক্রটি এই লোকগুলোকে নিয়ে যাওয়ার পেছনে কাজ করেছে, তাদের চিহ্নিত করার বিষয়ে বাংলাদেশের লিবিয়া ও গ্রিস মিশনকে কাজ করতে বলা হয়েছে।এখানে লিবিয়ার লোকজনও জড়িত আছে। বাংলাদেশি যদি কেউ থেকে থাকে এটা আইডেন্টিফাই করে তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। আন্তর্জাতিক আইনের শাস্তি হোক বা বাংলাদেশি আইনের শাস্তি হোক, তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।”
শামা ওবায়েদ বলেন, “আমরা আমাদের মিশন থেকে যে তথ্যটা পেয়েছি, তারা গ্রিসের সাথে যোগাযোগ করেছে। বেসিক্যালি এই যারা স্মাগলিংটা করে, তারা লিবিয়ারও আছে এবং বাংলাদেশিও আছে, যেটা আমরা ধারণা করছি।ধারণা করছি যে, এটা একটা চক্র, যারা সবসময় এই বিভিন্ন দেশের নাগরিকদেরকে বিপদে ফেলে, তাদেরকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে টাকা পয়সা দিয়ে তারা নিয়ে যায়।এ ঘটনাকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ হিসাবে বর্ণনা করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এখানে বেশ কিছু দেশের নাগরিকরা ছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার মধ্যে বাংলাদেশের কিছু নাগরিকও ছিল। আরও বেশি দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, এর মধ্যে একজন নারী ছিলেন ও একটা শিশুও ছিল।তাদের বিস্তারিত পরিচয় আমরা এখনো জানি না। যাদেরকে উদ্ধার করা হয়েছে, তাদেরকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং অন্যদেরকে একটা ক্যাম্পে রাখা হয়েছে।”
তিনি বলেন, গ্রিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ মিশন।সেটাতে আমাদের একটু সময় লাগবে, কাজটা চলছে। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। এই ঘটনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আমরা কতটা ভালনারেবল অবস্থায় আছি। এই যে স্মাগলাররা তাদের একটা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এখানে হওয়া উচিত।ঘটনার ভয়াবহতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে শামা ওবায়েদ বলেন, আরও দুর্ভাগ্যজনক, কী পরিমাণ অমানবিক এবং ক্রিমিনাল হলে… তারা হয়তো ভেবেছিল একদিন দুইদিনে তারা পার হয়ে যাবে কিন্তু লেগেছে ছয় থেকে সাত দিন।
“এবং ছয় থেকে সাত দিনের খাবার তাদের সাথে ছিল না, পানি ছিল না, কিছুই ছিল না অমানবিক অবস্থায় ছিল। ওখানে জাহাজে যারা মারা গিয়েছিল, তাদেরকে ফেলে দেওয়া হয়েছে পানিতে।সাগরপথে এমন যাত্রার পথ বন্ধে উদ্যোগ নেওয়ার উপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ও তদন্ত করছে এবং সরকারের সব মন্ত্রণালয় সচেষ্ট আছে।আমি মনে করি লং টার্ম সলিউশন হচ্ছে যে, এটা কীভাবে বন্ধ করা যায়, সেটার একটা উপায় আমাদের অবশ্যই বের করতে হবে। কারণ এটা হতে দেওয়া যায় না, এটা কোনোভাবেই সভ্যতার কোনো সংজ্ঞায় এটা পড়ে না।”




