২২ বছরে এইচএসসির ভয়াবহ ফল বিপর্যয়
শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া এবং অনলাইন গেমসের আসক্তি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পড়াশোনার পেছনে দৈনিক গুণগত সময় বা কোয়ালিটি স্টাডি আওয়ার কমে যাওয়াও এই খারাপ ফল
আজিজা শফিক : ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ৫২.১২ শতাংশে নেমে এসেছে এবং জিপিএ-৫ কমে দাঁড়িয়েছে ৪০,০৮৪ জনে।
ঢাকা বোর্ড ৬১.৮০% পাস নিয়ে শীর্ষে থাকলেও বরিশাল বোর্ড ৪৪.৮৪% নিয়ে সবার নিচে অবস্থান করছে; বিশেষ করে রাজশাহী ও যশোর বোর্ডের মানবিক বিভাগে পাসের হার ৩৬-৩৮ শতাংশে নেমে আসায় এই বড় ধস নেমেছে।
খাতার শতভাগ কঠোর মূল্যায়ন, পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা, ইংরেজিতে গণ-ফেল এবং শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত ডিভাইস ও কোচিং-নির্ভরতাই এই ফল বিপর্যয়ের মূল কারণ।
২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল: পাসের হারে ধস ও এর কারণ বিশ্লেষণ
১. এক নজরে ২০২৬ সালের সামগ্রিক ফলাফল
সামগ্রিক গড় পাসের হার: ৫২.১২ শতাংশ, যা গত ২২ বছরের মধ্যে দেশের ইতিহাসে অন্যতম সর্বনিম্ন।
মোট জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থী: ৪০,০৮৪ জন, যা গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে।
বিভাগীয় বোর্ডের তুলনামূলক চিত্র: সাধারণ ৯টি বোর্ডের মধ্যে ঢাকা বোর্ড ৬১.৮০% পাসের হার নিয়ে শীর্ষে অবস্থান করছে।
সর্বনিম্ন পাসের হার: বরিশাল বোর্ড ৪৪.৮৪% পাসের হার নিয়ে দেশের সর্বশেষ অবস্থানে রয়েছে।
মানবিক বিভাগের বড় বিপর্যয়: রাজশাহী বোর্ডে মানবিক বিভাগে পাসের হার মাত্র ৩৬.৯৬% এবং যশোর বোর্ডে ৩৮.২১%, যা পুরো দেশের পাসের হারকে টেনে নিচে নামিয়েছে।
২. ফল বিপর্যয়ের প্রধান কারণসমূহ
খাতার শতভাগ নিরপেক্ষ ও প্রকৃত মূল্যায়ন (Strict Evaluation)
শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী এবারই প্রথম পরীক্ষকদের খাতা মূল্যায়নে কোনো প্রকার শিথিলতা প্রদর্শন করতে নিষেধ করা হয়।
কৃত্রিম উপায়ে বা গ্রেস মার্কস দিয়ে পাসের হার বাড়িয়ে রাখার দীর্ঘদিনের প্রথা এবার পুরোপুরি বন্ধ ছিল।
শিক্ষার্থীরা খাতায় ঠিক যতটুকু সঠিক উত্তর লিখেছে, মূল্যায়নে ঠিক ততটুকুর ওপরেই সুনির্দিষ্ট নম্বর দেওয়া হয়েছে।
ইংরেজি ও বাধ্যতামূলক বিষয়ে গণ-ফেল
এবারের ফলাফলে শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে ইংরেজি ও আবশ্যিক বিষয়গুলোতে।
বরিশাল বোর্ডে কেবল ইংরেজি বিষয়েই ৪৬% শিক্ষার্থী অনুত্তীর্ণ হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে মোট পাসের হারে।
বেসিক বা মৌলিক জ্ঞান দুর্বল থাকার কারণে সৃজনশীল ও জটিল প্রশ্নের উত্তর দিতে শিক্ষার্থীরা ব্যর্থ হয়েছে।
পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস ও প্রশ্নপত্রের উচ্চ মান
বিগত বছরগুলোতে করোনা মহামারির কারণে সংক্ষিপ্ত বা পরিমার্জিত সিলেবাসে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলেও, এবার পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে।
সিলেবাস বড় হওয়ার কারণে অধিকাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষার আগে সম্পূর্ণ প্রস্তুতি শেষ করতে পারেনি।
প্রশ্নপত্রের মান বিগত বছরগুলোর চেয়ে অনেক বেশি মানসম্মত ও বিশ্লেষণধর্মী হওয়ায় মুখস্থনির্ভর শিক্ষার্থীরা ভালো করতে পারেনি।
শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিতি ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগহীনতা
শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিয়মিত কলেজে গিয়ে ক্লাস করার আগ্রহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
কলেজগুলোর টেস্ট বা নির্বাচনী পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর মূল বোর্ড পরীক্ষা শুরু হতে প্রায় ৩ মাস সময় লেগেছিল।
এই দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথে সরাসরি কোনো যোগাযোগ ও তদারকি না থাকায় পড়াশোনায় এক ধরনের ঢিলেমি চলে আসে।
গাইড বই ও কোচিং-নির্ভরতা
মূল পাঠ্যবই বা টেক্সটবুক পড়ার চেয়ে শিক্ষার্থীরা বাজারচলতি গাইড বই, হ্যান্ডআউট ও কোচিং সেন্টারের সাজেশনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল।
এর ফলে প্রশ্ন সামান্য ঘুরিয়ে আসায় শিক্ষার্থীরা তা সমাধান করতে পারেনি।
ডিজিটাল ডিভাইসের অপব্যবহার ও আসক্তি
করোনাকালের পর থেকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্মার্টফোন, সোশ্যাল মিডিয়া এবং অনলাইন গেমসের আসক্তি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
পড়াশোনার পেছনে দৈনিক গুণগত সময় বা কোয়ালিটি স্টাডি আওয়ার কমে যাওয়াও এই খারাপ ফলাফলের অন্যতম বড় কারণ।
৩. শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন
বিশেষজ্ঞরা এই ফলাফলকে কৃত্রিমতাহীন এবং “প্রকৃত মেধার বাস্তব প্রতিফলন” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
সাময়িকভাবে এই ফলাফলকে বিপর্যয় মনে হলেও, এটি দেশের সামগ্রিক শিক্ষার মানোন্নয়নে এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতে আরও বাস্তবমুখী ও কঠোর পরিশ্রমি হতে দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।





