• রোববার , ২৬ জুলাই ২০২৬

ক্ষোভে ফুঁসছে লক্কর বিমানে নিহতের স্বজনরা


প্রকাশিত: ৫:০০ পিএম, ১৩ মার্চ ১৮ , মঙ্গলবার

নিউজটি পড়া হয়েছে ২২৫ বার

nepal-us bangla-www.jatirkhantha.com.bd.25

নেপাল প্রতিনিধি : কান্না থামছে না ইউ এস বাংলা’র বিধ্বস্ত বিমানে নিহতের স্বজনদের। বিমানটির পাইলট আবিদ সুলতানসহ তার চার ক্রু’ও পরিবার অঝোর ধারায় কাঁদছিল মঙ্গলবার সকালে শাহজালাল আন্তজার্তিক বিমান বন্দরে। ইউএস বাংলার লক্কর বিমানে ম্যারেজ ডে’র অানন্দ উদযাপন করতে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরছে শশী। ওদের পরিবারে এখন বিষাদের ছায়া-।এদিকে ইউএস বাংলার লক্কর বিমানের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

একইভাবে ইউএস বাংলার লক্কর বিমানে নিহতদের পরিবার চাঁপা ক্ষোভে ফুঁসছে। ওরা আর্তনাদ করে বলছেন, কে ফিরিয়ে দিবে আমাদের প্রিয় স্বজনদের। তাঁরা আরো বলেছেন, ইউএস বাংলা ফিরিয়ে দিক রিজনা আব্দুল্লাহ, ফয়সাল আহমেদ, শামরিন আহম্মেদ, ইয়াকুব আলী, আলিফুজ্জামান, আলমুন নাহার অ্যানি, বিলকিস আরা, শিলা বসগেইন, নুরুন্নাহার বেগম, আলজিনা বড়াল, চারু বড়াল, আক্তারা বেগম, শাহীন বেপারী, সোভিন্দ্র বোহারা, বসন্ত বোহারা, সামিরা বাজানকার, প্রবীণ চিত্রকর, নাজিয়া চৌধুরী, সাজেনা দেবকোটা, প্রিন্সি ধামী, গয়োন্ত গ্রুঙ, রেজোয়ানুল হক, রকিবুল হাসান, মেহেদী হাসান, মো. কবির হোসেন, দিনেশ হুমাগাইন, সানজিদা হক, হাসান ইমাম, মো. নজরুল ইসলাম, শ্রেয়া ঝা ও পূর্ণিমাদের।

nepal-us bangla-www.jatirkhantha.com.bd.24jpgপাইলট না ফেরার দেশে-

পাইলট না ফেরার দেশে-মৃত্যুর কাছে হেরে গেলেন পাইলট আবিদ সুলতান। নেপালে বিধ্বস্ত হওয়া বিমানের পাইলট আবিদ সুলতানও মারা গেলেন। তিনিসহ বিমানের চার ক্রু’র মৃত্যু সংবাদ নিশ্চিত করেছেন ত্রিভুবন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের জেনারেল ম্যানেজার রাজকুমার ছেত্রী। ঢাকা থেকে রওনা হয়ে কাঠমুণ্ডু বিমানবন্দরে অবতরণের সময় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ইউএস-বাংলার বিমানটি। এতে গতকালই ৫০ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে নেপালি কর্তৃপক্ষ। এবার সেই দলে যোগ হলো আবিদ সুলতানের নামও।

‘ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত জরুরি’-

মৃত্যুর সংবাদ নিশ্চিত হওয়ার পর মঙ্গলবার দুপুরে আবিদের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, সেখানে আবিদের আত্মীয়-স্বজনদের ভিড়। ছেলে তানজিব বিন সুলতানের গলা জড়িয়ে কাঁদছেন টপি। বাবাহারা সন্তানকে নিয়ে কালো মেঘের ভেলায় অনিশ্চিত ভবিষ্যত ভাবনায় ব্যাকুল টপি।বলছিলেন, ‘এমন করে চলে যাওয়া কল্পনাতীত। ও খুব ইনোসেন্ট এবং দক্ষ। ওর মতো মানুষ দুর্ঘটনায় পড়ে যাবে ভাবনাতীত। দোয়া চাই ওপারে ভাল থাকুক আবিদ।’

আবিদ সুলতানের বাবা এম ও কাশেমও পাইলট ছিলেন। আবিদরা ৫ ভাই। খুরশিদ মাহমুদ, সুলতান মাহমুদ, সেলিম মাহমুদ, আমির মাহমুদ সবাই প্রতিষ্ঠিত।আবিদের ভাড়া বাসায় কথা হয় খুরশিদ মাহমুদের সঙ্গে। তিনি বলেন, একমাত্র সন্তান তানজিব বিন সুলতান মাহি এবার ‘ও’ লেভেল পরীক্ষা দেবে। অসময়ে ও এতিম হলো। আমরা ভাই হারালাম। ও খুব পারদর্শী, ‘এক্সট্রা অর্ডিনারি।’ এমন দুর্ঘটনা মানতে পারছি না।

ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ফাইনালি ওর মৃত্যুর খবর সবাইকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। ওর মৃত্যুর কারণ, দুর্ঘটনার কারণ ইউএস বাংলা, এক্সপার্টরা ভালো বলতে পারবেন। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে খবর এসেছে পাইলটের কোনো ত্রুটি ছিল না।তিনি বলেন, দুর্ঘটনায় যারা মারা গেছেন, তাদের প্রত্যেকে পরিবারকে যেন ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়, তাদের শোকাহত মুহূর্তগুলোকে যেন তাচ্ছিল্য করা না হয়। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত জরুরি। এটা নিয়ে যেন টক শোতে নেতিবাচক কোনো কথা না হয়, যেন শুনতে না হয়, প্রধানমন্ত্রী দেখছেন সব। আমরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই।

nepal-us bangla-www.jatirkhantha.com.bd.21ম্যারেজ ডে’তে বিষাদের ছায়া-

ইউএস বাংলার লক্কর বিমানে ম্যারেজ ডে’র অানন্দ উদযাপন করতে গিয়ে নেমে এলো বিষাদের ছায়া-।বিয়ের সপ্তম বার্ষিকী উদ্‌যাপনে কাঠমান্ডু যাচ্ছিলেন ডা. রেজওয়ানুল হক  শাওন ও তাঁর স্ত্রী তাহিরা তানভিন শশী । উড়োজাহাজটি আকাশে ডানা মেলতেই শশী পোস্ট দিলেন‘এবং যাত্রা হলো শুরু’। কিন্তু আনন্দময় এ যাত্রার শেষটা বড় বিষাদময়ে লাশ হয়ে গেলেন শশী।সোমবার দুপুরে নেপালের কাঠমান্ডুতে বিধ্বস্ত হয় ইউএস বাংলার বিএস-২১১ ফ্লাইটটি। ওই দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন  তাহিরা তানভিন শশী। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন শাওন।স্ত্রীর মৃত্যুর খবর এখনো জানেন না শাওন।

চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, শাওনের শরীরের ৩০ শতাংশ পুড়ে গেছে। তবে তিনি শঙ্কামুক্ত। কাঠমান্ডুর ওম হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি। শশীর মরদেহ রয়েছে কাঠমান্ডু মেডিকেল কলেজ টিচিং হাসপাতালের মর্গে।শাওনের চাচাতো ভাই মাজহার বলেন, দুর্ঘটনার খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গে শশী ভাবি ও শাওন ভাইয়ের বাবা বিমানবন্দরে যান নেপালে যাওয়ার জন্য। তখন নেপালের বিমানবন্দরে বিমান চলাচলে ঝামেলা থাকায় তাঁরা যেতে পারছিলেন না।

একসময় ওখানেই খবর পান, শশী ভাবি মারা গেছেন। এরপর ওই কষ্টের কথা আর বলা সম্ভব নয়। মাজহার বলেন, ‘আজ ইউএস বাংলার বিশেষ ফ্লাইটে নেপাল গেছেন শাওন ভাইয়ের বাবা ও আমার আরেক চাচা। শাওন ভাইয়ের সঙ্গে কাল রাতে আমাদের কথা হয়। তিনি এখনো ঘোরের মধ্যে। বারবার শশী ভাবির কথা জানতে চাইছেন। আমরা তাঁকে কিছু জানাইনি।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডা. রেজওয়ানুল হক। উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় মারা গেছেন তাহিরা তানভিন শশী। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডা. রেজওয়ানুল হক। শাওন এখন রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার। রংপুর মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন নেপালি ছাত্র রাহুলের মাধ্যমে শাওনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয় বলে জানান মুসাব্বির বিন মাজহার।মানিকগঞ্জ শহরের লঞ্চঘাট এলাকার ডা. রেজা জামানের একমাত্র মেয়ে শশী।

শশী ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিমিনোলজি বিভাগে মাস্টার্স করছিলেন। শশীর বাবা-মা থাকেন রাজধানীর মোহাম্মদপুরে। মাজহার বলেন, একমাত্র সন্তান হারিয়ে বাবা-মায়ের কী যে অবস্থা, তা আর বলার মতো নয়। আমাদের সব আত্মীয় এখন ওই বাসায়।শাওনের বাবা মোজাম্মেল হকও চিকিৎসক। তিনি কিছুদিন আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালকের পদ থেকে অবসর নিয়েছেন। শাওন ও শশী দুজনেরই গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলায় গোপালপুরে।

rtvonlne-ইউএস বাংলা-টিআইএ-BS-211-US Bangla-TIA‘বাঁচাও, বাঁচাও’বলছিলেন যাত্রীরা-

কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সোমবার দুপুরে বিধ্বস্ত ইউএস বাংলার বিমানটির যাত্রীরা বাঁচার জন্য তীব্র আকুতি জানিয়েছিলেন। ‘বাঁচাও, বাঁচাও’বলে সাহায্য চেয়েছিলেন। কেউ আবার ইংরেজিতে বলছিলেন- হেল্প মি, প্লিজ হেল্প মি…। উদ্ধারকারী সেনা কর্মকর্তা বালকৃষ্ণ উপাধ্যায় এসব তথ্য জানিয়েছেন। উপাধ্যায় জানান, পুরো ঘটনাটিই ছিল বিভীষিকাময়। আমি নেপালি সাংবাদিক ভদ্র শর্মার সঙ্গে বিমানবন্দরে যাই। ফটকের বাইরে পাথরের নুড়ির স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে দেখছিলাম, আগুন বের হওয়া বিমানে পানি ছিটানো হচ্ছে।

বিমানবন্দরে একটি জ্বালানি কোম্পানিতে ড্রাইভার হিসেবে কাজ করেন কৈলাশ অধিকারী। তিনি বলেন, বিধ্বস্ত বিমানটি থেকে বোমা বিস্ফোরণের মতো শব্দ হয়েছে। আগুন নেভাতে দমকলকর্মীদের ১৫ মিনিট সময় লেগেছে। তবে তারা যদি আরেকটু আগে আসতেন, তাহলে আরও বেশি লোককে প্রাণে বাঁচানো যেতো।

শাহরিন আহমেদ বলেন-

নেপালে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিধ্বস্ত বিমানের বেঁচে যাওয়া বাংলাদেশি যাত্রী শাহরিন আহমেদ বলেন, ‘বন্ধুদের সঙ্গে নেপাল ভ্রমণে বের হয়েছিলাম। বিমানটি অবতরণের আগে আগেই বামদিকে মোড় নেয়। লোকজন চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করেন। আমরা পেছনে তাকিয়ে দেখি, বিমানে আগুন জ্বলছে।’তিনি আরও বলেন, তখন আমার বন্ধু তার সামনের দিকে দৌঁড়াতে বলে। কিন্তু দৌঁড় শুরু করতেই আমার বন্ধুর পুরো শরীর আগুনে ঢেকে যায়। সে নিচে পড়ে যায়। মানুষ পুড়ছে, আহাজারি করছে, নিচে পড়ে যাচ্ছে। জ্বলন্ত বিমান থেকে তিন যাত্রী লাফিয়ে পড়ে। এটা ছিল ভয়ানক। সৌভাগ্যবশত কেউ একজন আমাকে নিরাপদে বের করে নিয়ে এসেছেন।’

যাত্রী মেহেদি হাসান বলেন-

অপর বাংলাদেশি যাত্রী মেহেদি হাসান। প্রথমবারের মতো বিমান চেপে নেপালে যান তিনি। সঙ্গে ছিল স্ত্রী, চাচাতো ভাই ও তার মেয়ে।তিনি বলেন, আমাদের আসন ছিল পেছনে। আমি যখন আগুন দেখতে পাই তখন পরিবারের স্বজনদের খোঁজ করি। আমরা বিমানের জানালা ভাঙার চেষ্টা করেছি, কিন্তু ব্যর্থ হই। আমরা আশায় ছিলাম কেউ আমাদের উদ্ধার করবে। আমার স্ত্রী ও আমাকে উদ্ধার করা হয়। কিন্তু আমার চাচাতো ভাই ও তার মেয়ে এখনও নিখোঁজ রয়েছে।

পিয়াসের বাসায় আর্তনাদ-

নেপালের কাঠমান্ডুতে দুর্ঘটনায় বিধ্বস্ত বিমানের যাত্রী ছিলেন বরিশালের সন্তান পিয়াস রায়। তার বাড়ি বাকেরগঞ্জ উপজেলার দাড়িয়াল ইউনিয়নের মধুকাঠি গ্রামে। পিয়াসের বাবা সুখেন্দু বিকাশ রায় নলছিটি উপজেলার চন্দ্রকান্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। মা পূর্ণিমা রায় বরিশাল নগরীর একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। বর্তমানে তারা নগরীর বগুড়া রোড এলাকার বসবাস করে।

পিয়াস গোপালগঞ্জের সাহেরাখাতুন মেডিকেল কলেজ থেকে ফাইনাল পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। এ বছরের পাঁচ মার্চ তার পরীক্ষা শেষ হয়। পিয়াস রায়ের বাবা সুখেন্দু বিকাশ রায় জানায়, নেপালে পিয়াসের বন্ধুরা রয়েছে। এর আগেও দেশের বাইরে ঘুরতে গেছে পিয়াস।  সোমবার প্লেনে ওঠার আগে সর্বশেষ সোয়া এগারোটার দিকে মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে। সেসময় পিয়াস বলেন, মা আমি প্লেনের সিঁড়িতে ওঠেছি। প্লেনের ভেতরে ফোন বন্ধ থাকবে। তাই আগেই জানিয়ে দিলাম। ফেসবুকে ছবি আগেই ছেড়ে দিয়েছি। এরপর থেকে পিয়াসের সঙ্গে কোন যোগাযোগ নেই।