• রোববার , ২৬ জুলাই ২০২৬

‘ক্রস-বিচারকে ইন্দুরের মত মাইরা ফালায়’


প্রকাশিত: ২:৪৩ পিএম, ২ জুলাই ১৯ , মঙ্গলবার

নিউজটি পড়া হয়েছে ২১৬ বার

শফিক রহমান : ‘ক্রসফায়ার:বিচারকে ইন্দুরের মত মাইরা ফালায়’! এবার সেই ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে চলছে নিন্দার ঝড়। বলা হচ্ছে, ক্রসফায়ারের মাধ্যমে গড ফাদারের গোপন কথা থাকে যেন গোপনে; সে কারনেই নয় বন্ড ক্রস ফায়ার। একজন অধ্যাপক বলেছেন, বিচারকে ইন্দুরের মত মাইরা ফালায় রাখছে দেখলাম।আরেরকজন বলেছেন ন্যায্য ক্রসফায়ার!! মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, বিচার বহির্ভূত এসব হত্যাকাণ্ড অপরাধের মূল কারণকে আড়াল করে দেয়।

বরগুনায় দিনদুপুরে পরিকল্পিত ভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয় রিফাত শরিফকে। হত্যাকান্ডের পুরোটা সময় স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নি তার স্বামীকে রক্ষার চেস্টায় ব্যর্থ হয়। নয়ন বন্ড নামে স্থানীয় সন্ত্রাসী তার বাহিনীকে সাথে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকান্ড ঘটায়। প্রশাসনের পাশাপাশি নিন্দার ঝড় ওঠে সামাজিক মাধ্যমে।দ্রুত গ্রেপ্তার আর প্রচলিত আইনে শাস্তি দাবি করে আপামর জনতা। সোমবার দিবাগত রাতে পুলিশের সঙ্গে বন্দুক যুদ্ধে নিহত হয় নয়নবন্ড। আর এই হত্যাকাণ্ডকে বিচারবহির্ভূত আরেকটি খুন বলে নিন্দার ঝড় উঠেছে নানামহলে। প্রতিবাদ জানিয়ে ফারুক ওয়াসিফ তার ওয়ালে লিখেছেন, নয়ন বন্ড তার হিংশাসী মনে ভেবেছিল রিফাত অন্যায় করেছে, ওকে মারাই উচিত।

তার বন্ধুরাও সমর্থন দিয়ে বলেছিল, প্রেমিকা কেড়ে নেয়ায় পাপী সে, বেঈমান সে, ওকে কোপানো উচিত। হিংসার আদালতে ওরা তার বিচার করেছিল। আপনি ভাবলেন, নয়ন বন্ড পিশাচ,খুনী। ওকে মারাই উচিত। ক্রসফায়ারের দাবি তুললেন। ভাবলেন বিচারে ভরসা নাই। আদালত-প্রশাসন-রাজনীতি ঠিক কওে ন্যায়বিচারের শর্ত পাকা করার টাইম নাই আপনার। সাহস ও সামর্থ্যও নাই।যাদেও ক্রসফারের সামর্থ্য আছে তাদের কাছে শর্টকাট বিচার চাইলেন আপনি। বিনাবিচারে হত্যায় আপনি হাত লাগালেন। নয়ন ও আপনি দুজনই নির্বিচার হত্যার সমর্থক।

নয়নরা যে যুক্তিতে রক্তপিপাসু, যে হিংসার বশে রিফাতকে মেরেছিল, আপনি সাধারণ মানুষ হয়ে সেই রক্তপিপাসার বশে নয়নকে হত্যা করালেন। আপনি সত্য জানার সুযোগ হারালেন। নয়নের গডফাদার যারা তাদের রেহাই দিলেন। যে সিস্টেম দায় তাকে আরো নয়ন বানানোর, ব্যবহার ও খরচ করার পারমিট দিলে।প্রতিহিংসার বসে আমরা আইনকে হত্যা করে বিনা বিচারে হত্যাকান্ডে শিকার হয়ে বিচারের অধিকার হারাই। নিন্দা। শয়তানকে গালি দিতে দিতে গালি ছাড়া অন্য ভাষা ভুলে আমরাই শয়তানে পরিনত হয়েছি।

আসিফ নজরুল তার ওয়ালে লিখেছেন নয়নকে কি সত্যি হত্যা করা হয়েছে? যদি তাকে সত্যি হত্যা করা হয় এই ক্রসফায়ারের প্রতিবাদ জানাই আমি। কারণ এই একটা ‘ন্যায্য’ ক্রসফায়ারের মূলধন দিয়ে হত্যা করা হবে আরো অনেক মানুষকে। কারণ এই ক্রসফায়ার আড়াল করবে আরো অনেক আগের ক্রসফায়ার। কারণ নয়নকে ক্রসফায়ার করলে জানা যাবে না তার গডফাদারদের কথা, আরো বহু নয়ন তৈরী হচ্ছে যাদের হাতে তাদের কথা।মাথায় রক্ত আমারো চাপে মাঝে মাঝে। কিন্তু ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখুন ক্রসফায়ার আমাদের সমর্থন করা উচিত না কোনভাবেই। তবে তার আগে আসুন জেনে নেয়ার চেষ্টা করি সত্যি কি নয়নকে হত্যা করা হয়েছে? নাকি তার নামে বা তার বদলে অন্য কাউকে? এদেশে এসময়ে সম্ভব এটা।

সাংবাদিক ও লেখক ইশরাত জাহান উর্মি প্রতিবাদ জানিয়ে লিখেছেন,অধিকাংশই, আমার ফ্রেন্ডলিস্টেও, অধিকাংশই নয়ন বন্ড এর ক্রসফায়ারে খুশী! কি ভয়ংকর এক সমাজে বাস করছি!! বিনা বিচারে হত্যার সমর্থক গোষ্ঠীর এক দেশ! মানবাধিকার কর্মী ও রাজনীতিবিদ তাহেরা বেগম জলি প্রতিবাদ জানিয়েছেন এই ক্রসফায়ারের, বলছেন গড ফাদারের গোপন কথা থাকে যেন গোপনে, সে কারনেই নয় বন্ড ক্রস ফায়ার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গনযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রধান কাবেরি গায়েন ক্রস ফায়র নিয়ে বলেন, খুনি বা খুনিচক্রের কাউকে ক্রসফায়ারে নিহত দেখতে চাই না, প্রকাশ্য বিচাওে কোন খুঁটির জোরে এমন বেপরোয়া খুন করা যায়, সবটার প্রকাশ দেখতে চাই। ক্রসফায়ারে খুন মানেও আসলে খুনকেই বৈধতা দেয়া।অবশ্যই নয়ন খুনি। বিচাওে নয়নের মৃত্যুদন্ডই হতো হয়তো, সেটাই কাম্য ছিলো। কিন্তু বিষয়টা বিচাররক প্রক্রিয়ার। নয়ন বিচারের মাধ্যমে মৃত্যুদন্ড পেলে সবাই আশ্বস্ত হতো।কিন্তু সেটা না হয়ে একটা খুন করা হলো।

প্রকাশ্য দিবালোকে রিফাত হত্যাকারীরা-

তিনি আরো বলেন, মৃত্যুদন্ড আর খুন আলাদা জিনিস। বিচার বর্হিভুত সব হত্যাকান্ড খুন। সকল খুনের প্রতিবাদ করি, সকল খুনের বিচার চাই। সিনিয়র ফটো জার্নালিষ্ট জিয়া হাসান প্রতিবাদ জানিয়েছেন, রিফাত কে খুন করেছে নয়ন বন্ড। নয়ন বন্ডকে খুন করেছেন আপনি আর আমি, কেমন লাগতেছে রক্তের স্বাদ। এটা কি টক না নোনতা না মিষ্টি না ঝাল? একটু কি গিল্টি লাগতেছে না।রাষ্ট্রের ডিউ ডিলিজেন্ডস বাদে খুন করার ফ্রী লাইসেন্স দিয়া অপরাধ দমনের নামে যে লাশ নামাইতেছেন আপনি একই সাথে সেই অপরাধের ভিকটিম খুনি ও ক্রসফায়াড়ে পড়ে থাকা লাশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আরেক অধ্যাপক গিতী আরা নাসরিন ক্রসফায়াড়ের সমালোচনা করে বলেন, বিচারকে ইন্দুরের মত মাইরা ফালায় রাখছে দেখলাম। দেইখা আমার সাহও ও স্বস্তি হইলো। পুলিশে সাইবার সিকিউরিটি ইউনিটির এডিসি নাজমুল হাসান এই হত্যার প্রসঙ্গে বলছেন, নয়ন বন্ড একজন সন্ত্রাসী তার ওপর যে কোন পুলিশী একশন নিতে গেলে সে তার সহযোগীরা গোলাগুলি করতেই পারে। নিজেকে বাচাতে পুলিশও পাল্টাগুলি ছুড়তেই পারে। নয়ন বন্ড গুলিতে মরতেও পারে। আফসস তাকে জীবিত ধরতে পারলাম না।

সিনিয়র সাংবাদিক প্রভাস আমিন প্রতিবাদ জানিয়েছেন, বলছেন ক্রসফায়ার মানে হয়তো একজন সম্ভাব্য অপরাধীর বিনা বিচাওে মৃত্যু। কিন্তু তার পৃষ্ঠপোষকদের চিরদিনের জন্য বাঁচিয়ে দেয়া। ক্রসফায়ার মানে আইনের শাসনহীনতা, প্রচলিথ ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা। সকল অপরাধীর বিচার চাই, কারো ক্রসফায়ার চাই না। মানবাধিকার কর্মী খুশি কবির এ বলছেন, ক্রসফায়ার কখনই সমর্থনযোগ্য না। অপরাধ যত বড় হোক তার তদন্ত হবে। তার প্রচলিত আইনে বিচার হবে। আর নয়ন বন্ডসহ সকল অপরাধীর পরিচয় জানতে এই ক্রসফায়ার শুধু অন্যায় না অপরাধ হয়েছে।