‘অসাধু চক্র দুধে ভেজাল দিচ্ছে ব্যবস্থা নিন’
বিশেষ প্রতিনিধি : পাস্তুরিত দুধ নিয়ে গবেষণা করা অধ্যাপক আ ব ম ফারুক বলেছেন, আমরা কোনো ব্র্যান্ড বা কোম্পানির বিরুদ্ধে নই, একটি অসাধু চক্র দুধে ভেজাল দিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন।আমরা চাই দেশীয় দুগ্ধশিল্প বিকশিত হোক।বিদেশি দুধের বাজার তৈরি হোক এটা আমরা চাই না। রাতারাতি আমাদের বিদেশি এজেন্ট বানানো যাবে না।বুধবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে পবা আয়োজিত ‘ঢাবি অধ্যাপকের পাস্তুরিত দুধ নিয়ে গবেষণা : জনস্বার্থে করণীয়’ শীর্ষক সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
সম্প্রতি পাস্তুরিত তরল দুধের গবেষণায় এন্টিবায়োটিকের উপস্থিতি নিয়ে আলোচিত অধ্যাপক আ. ব. ম. ফারুক বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস এন্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই) এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের গবেষণা স্ট্যান্ডার্ডকে যুগোপযোগী করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, পাস্তুরিত ও অপাস্তুরিত দুধে মানবদেহের চিকিৎসায় ব্যবহৃত এন্টিবায়োটিকের উপস্থিতি সনাক্তের প্রেক্ষিতে জনস্বাস্থ্য রক্ষায় জরুরি প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কোম্পানি ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি সংস্থাগুলোর ল্যাবরেটরিগুলোতে যেনো এখন থেকে নিয়মিতভাবেই দুধে এন্টিবায়োটিক আছে কি না তা পরীক্ষা করা হয়। তবে শুধু একটি ল্যাবরেটরি না পণ্যের গুণগত মান নির্ধারণে খোলাবাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে একাধিক ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা দাবি জানিয়েছেন পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)’র নেতারা। একই সাথে নমুনা সংগ্রহে দুর্নীতিমুক্ত ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণের দাবি জানান তারা।
পবা’র চেয়ারম্যান নাসের খানের সভাপতিত্বে সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থান করে ডা. লেনিন চৌধুরী। এসময় অধ্যাপক আ. ব. ম. ফারুক বলেন, বিএসটিআইয়ের দেড় যুগের পুরানো দুধের স্ট্যান্ডার্ডে (বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড, বিডিএস ১৭০২. ২০০২) বর্তমানের নয়টি পরীক্ষার সাথে কমপক্ষে এন্টিবায়োটিক ও ডিটারজেন্টের উপস্থিতি পরীক্ষার মতো দু‘টি পরীক্ষা অন্তর্ভূক্ত করে দুধের এই স্ট্যান্ডাডর্কে যুগোপযোগী করতে হবে।তিনি বলেন, একটি অসাধু চক্র আমদানিকৃত নিম্নমানের গুড়া দুধ দিয়ে তৈরি করছে তরল দুধ। এমনকি ডিটারজেন্টসহ বিভিন্ন কেমিক্যাল দিয়ে দুধ তৈরি করে বিভিন্ন কোম্পানীতে কম মূল্যে সাপ্লাই দিচ্ছে এমন প্রতিবেদন প্রায়ই বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। এই অসাধু চক্রের কারণে প্রকৃত চাষীরা বাজারের সঠিক মূল্য পাচ্ছে না ফলে আর্থিকভাবে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই বিকাশমান শিল্পকে বাচিয়ে রাখেতে বিদেশী দুধ নয়, দেশি দুধই নিরাপদ করতে হবে।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ডা. লেনিন চৌধুরী বলেন, হাইকোর্ট কর্তৃক নির্ধারণ করে দেওয়া ল্যাবরেটরিতে সরবরাহ করবার জন্য নমুনা সংগ্রহ যেন সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুযায়ী হয়। আমরা আশংকা করছি নমুনা সরবরাহ করার ক্ষেত্রে দুর্নীতি হতে পারে। খোলা বাজার থেকে নমুনা নিতে হবে। কোন মতেই ঘোষিত পূর্বনির্ধারিত স্থান থেকে সংগৃহীত অথবা কোম্পানির সরবরাহ করা নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করা চলবে না। নমুনা সংগ্রহের সময় কয়েক প্রস্থ নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। আদালত কর্তৃক নির্দিষ্ট ল্যাবে এক প্রস্থ নমুনা পাঠাতে হবে। আরেক প্রস্থ নমুনা দেশের বাইরে ডব্লিউএইচও এর স্বীকৃত রেফারেন্স ল্যাবে পাঠাতে হবে। এতে জনমনে তৈরি হওয়া আশংকা ও আতংক দূর হবে।
তিনি বলেন, সরকারি জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান বাজারে থাকা দুধের নমুনা পরীক্ষা করে। সংস্থাটি তাদের রিপোর্ট ১০ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশ করে। তারা প্যাকটজাত দুধের ৩১টি নমুনার ৬৬ থেকে ৮০ শতাংশ অনুজীব বা ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি শনাক্ত করে। ৩০ শতাংশ নমুনায় গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি পরিমাণে টেট্রাসাইক্লিন নামের অ্যান্টিবায়োটিক পায়। ১টি নমুনায় সীসা এবং কয়েকটিতে সিপ্রোফ্লোক্সাসিন ও এনরোফ্লোক্সাসিন নামের অ্যান্টিবায়োটিক শনাক্ত করে। এর আগে গত বছরের ১৬ মে তারিখে তাদের রিপোর্টে বলেছিল পাস্তুরিত দুধের ৭৭ শতাংশ নমুনায় উচ্চমাত্রার ব্যাকটেরিয়া, ৩৭ শতাংশ নমুনায় কলিফর্ম এবং ১৫ শতাংশ এ মলবাহিত কলিফর্ম বা ফিক্যাল কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়া অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে। গতমাসের শেষ সপ্তাহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ সেন্টারের প্রধান প্রফেসর আ ব ম ফারুক তার একটি গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেন। তিনি ঢাবির ফার্মেসি বিভাগের স্বনামধন্য শিক্ষক। তিনি বাজার থেকে কয়েকটি পাস্তুরিত দুধের নমুনা সংগ্রহ করেন। সেগুলো পরীক্ষা করে তিনি তাতে লিভোফ্লোক্সাসিন, সিপ্রোফ্লক্সাসিন ও অ্যাজিথ্রোমাসিন নামের অ্যান্টিবায়োটিক এবং ডিটারজেন্টের উপস্থিতি পান।
তিনি তার পরীক্ষার ফলাফল জনসম্মুখে প্রকাশ করেন। এতে বিভিন্ন কোম্পানীগুলো এমনকি সরকারি দপ্তর অসৌজন্যমূলকভাবে অধ্যাপক আ. ব. ম. ফারুককে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন। আমরা এর প্রতিবাদ জানাচ্ছি। তিনি বলেন, আমরা মনে করি একটি গবেষণালব্ধ ফলাফলের জবাব আরেকটি গবেষণা দিয়েই দেওয়া যৌক্তিক এবং স্বীকৃত পদ্ধতি। মন্ত্রণালয়ের উচিত ছিলো জনগুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে প্রফেসর ফারুকের গবেষণার জন্য তাকে সাধুবাদ জানানো। এরপর জনমনে তৈরি হওয়া সংশয় দূরীকরণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদনকৃত রেফারেন্স ল্যাবরেটরি থেকে অভিযুক্ত কোম্পানির দুধ সংগ্রহ করে পরীক্ষা করানো। সেই ফলাফল প্রকাশ করা এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া।



