৩৫০০কোটি মেরে দেয়া পি কে হালদার রবিবার দেশে ফিরছেন

শফিক রহমান / সাইফুল বারী মাসুম : ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে ও পরে কমপক্ষে চারটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) মালিকানায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন এনে ৩৫০০কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে পালিয়ে যাওয়া প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদার অবশেষে বাংলাদেশে ফিরছেন। পিকে হালদারের ঘনিষ্ঠ কয়েকটি সূত্র আজ ২২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার জাতিরকন্ঠ কে এতথ্য জানায়। তারা জাতিরকন্ঠকে বলেন আগামী রোববার ২৫অক্টোবর পিকে হালদার দেশে ফিরছেন। পিকে হালদার বলেছেন, তিনি ব্যাংক থেকে নেয়া সব টাকা ফেরত দিয়ে দেবেন, দেশের কোনো টাকা মারেননি। ব্যাংক থেকে যেভাবে নিয়েছিলেন সেভাবেই তা আবার ফেরত দিয়ে দিবেন।
ব্যাংক সূত্র জানায়, নানা কৌশল করে চার প্রতিষ্ঠান দখল করেছেন মূলত একজন ব্যক্তি। প্রতিষ্ঠান দখল করার জন্য নামে-বেনামে অসংখ্য কোম্পানি খুলেছেন, শেয়ারবাজার থেকে বিপুল পরিমাণ শেয়ার কিনেছেন, দখল করা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণের নামে টাকাও সরিয়েছেন। এমনকি দেশের বাইরে কানাডায় কোম্পানি খুলে টাকা সরিয়েছেন। আর এই ব্যক্তি হলেন প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদার। প্রতিষ্ঠানগুলো দখলের সময় পি কে হালদার প্রথমে রিলায়েন্স ফাইন্যান্স এবং পরে এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ছিলেন। আর এসব কাজে তাঁকে সব ধরনের সমর্থন ও সহায়তা দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা। মূলত বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন—এই দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থার চোখের সামনেই সবকিছু ঘটেছে। প্রায় ২৭৫ কোটি টাকা অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ৮ জানুয়ারি পি কে হালদারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
এদিকে বহু আলোচিত-সমালোচিত দেশের বিভিন্ন আর্থিক খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নেয়া নামধারী ব্যবসায়ী প্রশান্ত কুমার হালদার (পি কে হালদার) দেশে ফিরতে তিনি আদালতের আশ্রয়’ চেয়ে আবেদন করেন।চলতি বছর আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল লিজিং কর্তৃপক্ষ গত সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) হাইকোর্টকে এ তথ্য জানায়। কোম্পানির পক্ষ থেকে হাইকোর্টে আবেদন করে তাতে পি কে হালদারের জীবনের নিরাপত্তায় আদালতের আশ্রয় চাওয়া হয়। বিচারপতি মোহাম্মদ খুরশিদ আলম সরকারের একক বেঞ্চ আবেদনটি গ্রহণ করেন। আবেদন গ্রহণ করে বিচারক বলেন, এই আদালত পি কে হালদারের নিরাপদে দেশে ফেরার জন্য আদেশ দিতে এবং সীমিত সময়ের জন্য তাকে এই আদালতের হেফাজতে নিরাপদে রাখতে রাজি আছে।
আদালত আদেশে আইএলএফএসএল ’র পরিচালনা পর্ষদকে বলেছে পিকে হালদারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। তিনি কবে, কখন, কোন ফ্লাইটে দেশে ফিরতে চান, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানালে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের মাধ্যমে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ ও দুদকসহ দেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবে আদালত। শুনানিতে বিচারক বলেন, আত্মসাতকারীরা টাকা ফেরত দিতে চাইলে সে সুযোগ যেমন থাকা দরকার, তেমনি তাদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখাও প্রয়োজন।
কারণ, কুমার হালদার (পি কে হালদার) ক্ষমতার অপব্যাবহার, প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে নানা কাগুজে কোম্পানির নামে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকে ১৫শ কোটি টাকা সরিয়ে নেন। এর বাইরে আরও কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আছে। সব মিলিয়ে তিনি প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেন বলে মনে করা হয়। আর এই টাকার একটি অংশ তিনি নামে-বেনামে দেশের কিছু প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেন। তবে বড় অংশই দেশের বাইরে পাচার করে দেন বলে সন্দেহ করা হয়। সর্বশেষ তিনি এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন।
চলতি বছরের শুরুর দিকে খবর পাওয়া যায় বিপুল পরিমাণ টাকা আত্মসাৎ করে পিকে হালদার বিদেশে পালিয়ে গেছেন। এর প্রেক্ষিতে ১ জানুয়ারি এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পি কে হালদারসহ ২০ জনের ব্যাংক হিসাব ও পাসপোর্ট জব্দের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। জব্দ করা হয় পিকে হালদার ও তার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব।
এ অবস্থায় পি কে হালদারের লুট করে নেওয়া টাকা কখনোই ফেরত পাওয়া যাবে না বলে মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের পক্ষ থেকে হাইকোর্টে করা আবেদন থেকে জানা যায় তিনি দেশে ফিরে টাকা ফেরত দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। আইএলএফএসএল আদালতকে জানায়, সম্প্রতি পি কে হালদার তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেশে ফিরে টাকা ফেরত দিতে রাজি হওয়ার কথা জানান।
কোম্পানির আইনজীবী মাহফুজুর রহমান মিলন আদালতের আদেশের পর সাংবাদিকদের বলেন,সম্প্রতি পি কে হালদার আইএলএফএসএলের সাথে যোগাযোগ করে বলেছেন, তিনি টাকা ফেরত দিতে চান। তবে তার জন্য আদালতের হেফাজতে জীবনের নিরাপত্তা চান তিনি।’ আইএলএফএসএলের পরিচালনা পর্ষদ সে অনুযায়ী পিকে হালদারের জীবনের নিরাপত্তার জন্য উচ্চ আদালতের হেফাজত চেয়ে আবেদন করেছিল। শুনানি শেষে আবেদনটি গ্রহণ করেছেন আদালত।’
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রেজাউল করিম। দুদকের পক্ষে ছিলেন খুরশীদ আলম খান।খুরশীদ আলম খান সাংবাদিকদের বলেন, “পিকে হালদার একটি দরখাস্ত পাঠিয়েছেন যে, উনি দেশে আসতে চান, কিন্তু দেশে আসাটা তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। যদি তার জীবনের জন্য আইনগত নিরাপত্তা দেওয়া হয়, তাহলে উনি দেশে ফিরবেন। দরখাস্তটি কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ গ্রহণ করে করে আদালতে দাখিল করেছিল। এর উপর শুনানি হয়েছে। হাই কোর্ট বলেছেন, ঠিক আছে, উনি কখন আসতে চান সেটা জানান, দিন, তারিখ, সময়-ক্ষণ বা কোন ফ্লাইটে আসবেন, সে ফ্লাইট নাম্বার সব জানান।’



