• রোববার , ২৬ জুলাই ২০২৬

সড়কে অসভ্যতা কালি লেপন দায় কার?


প্রকাশিত: ৫:২২ পিএম, ২৯ অক্টোবর ১৮ , সোমবার

নিউজটি পড়া হয়েছে ৭৮ বার

এস রহমান /সাইফুল বারী মাসুম : দেশব্যাপী চলমান ৪৮ ঘন্টার ধর্মঘটে পরিবহন শ্রমিকদের চরম নৈরাজ্য, অসভ্যতা ও কালি তেলেসমাতি’তে দেশবাসী একদিকে হতবাক অন্যদিকে পুলিশ ও সরকারের নির্লিপ্ততায় আরো বেশী অবাক ও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। সরেজমিনে ভুক্তভোগীদের নিদারুন কষ্ঠ দেখা গেছে। একই সঙ্গে পথে যান নিয়ে নামা চালক ও যাত্রীদের গায়ে-মুখে পোড়া মবিল ঢেলে দেওয়া ও মারধরের ঘটনা দেশকে সার্বিক নৈরাজ্য’র দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

কর্মবিরতি পালনরত শ্রমিকরা হুমকি দিয়েছেন, দাবি আদায় না হলে তারা ৩০ অক্টোবর থেকে লাগাতার ধর্মঘট শুরু করবেন। সড়ক পরিবহন আইনের কয়েকটি ধারা সংশোধনসহ আট দফা দাবিতে তাদের এই কর্মসূচি, যে কারণে পরিবহন খাতে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অপরাধ করলেও যেন শাস্তি দেওয়া না হয়, তাদের দাবির মধ্যে এ বিষয়টিও রয়েছে।

জানা গেছে, ৮ বছর ঝুলে থাকার পর গত সেপ্টেম্বর মাসে দেশের জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে বহুল আলোচিত সড়ক পরিবহন আইন। পরিবহন নেতাদের আপত্তির কারণেই এত দিন আইনটি পাস করা হচ্ছিল না। কিন্তু গত ২৯ জুলাই কুর্মিটোলায় দুই কলেজশিক্ষার্থী বাসচাপায় মারা যাওয়ার পর দেশজুড়ে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয় সড়কে নিরাপত্তার দাবিতে। এর পর সেপ্টেম্বরে আইনটি পাস হয়।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, তারা যে কারণে ধর্মঘট করছেন, সেটা বোধহয় আইনটা সঠিকভাবে না বুঝে করছেন। সড়ক পরিবহন আইন যেটা হয়েছে, আমার মনে হয় সেটা সড়কে দুর্ঘটনা কমাতে সহায়ক হবে এবং চালকরা যদি সঠিকভাবে গাড়ি চালান, তা হলে তাদের জন্য সহায়ক হবে। আইনে এমন কোনো প্রবিশন (বিধান) নেই যে, তারা অন্যায় না করা সত্ত্বেও তাদের ভোগান্তিতে পড়তে হবে। আমি তাদের আহ্বান জানাব যেন তারা এই পথ পরিহার করেন।

সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি নৌমন্ত্রী শাজাহান খান জানান, আন্দোলনের ব্যাপারে তার কোনো মন্তব্য নেই। এটি তার নির্দেশেই হচ্ছে এমনটি নয়। ওদিকে পরিবহন চালক-শ্রমিকরা সদ্য পাস হওয়া আইনটিকে সাজার বোঝা বলছেন। নতুন আইনে চালককে অষ্টম শ্রেণি ও সহকারীকে পঞ্চম শ্রেণি পাস হতে হবে। তারা এসব বিধানের বিপক্ষে।

শাজাহান খানের নেতৃত্বাধীন সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন ও প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গার নেতৃত্বাধীন সড়ক পরিবহন সমিতি বরাবরই এ আইনের বিরোধিতা করে আসছে এবং আইন সংশোধনের দাবি তুলছে। আবার এ দুই পরিবহন নেতা কাম মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর উপস্থিতিতেই আইনটির চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এখন আইন সংশোধনের দাবিতে মাঠে নেমেছেন পরিবহনকর্মীরা।

ওদিকে ওবায়দুল কাদের বলেছেন, এখন আইন পরিবর্তনের সুযোগ নেই। পরবর্তী সংসদ অধিবেশন পর্যন্ত শ্রমিকদের অপেক্ষা করতে হবে। ন্যায়সঙ্গত বিষয় থাকলে তখন আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে আইন সংশোধনের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। শ্রমিকদের বলতে চাই, এখনই ধর্মঘট প্রত্যাহার করুন। মানুষকে কষ্ট দিয়ে কোনো লাভ নেই।

গত ৪৮ ঘন্টায় রাজধানীর বাস টার্মিনালগুলো থেকে কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। বন্ধ রয়েছে শহরের ভেতরে চলাচলকারী বিভিন্ন রুটের বাস। নগরীর গাবতলী, মহাখালী, যাত্রবাড়ী, সায়েদাবাদ, শনিরআখড়া, সাইনবোর্ডসহ বিভিন্ন এলাকায় গাড়ি বের করায় ভাঙচুর ও মারধরের বিকৃত আন্দোলনে নামেন শ্রমিকরা। তাদের হাতে নাজেহাল হয়েছেন সাধারণ যাত্রী, ব্যক্তিগত গাড়িচালক, এমনকি সংবাদকর্মীরাও।গণপরিবহনের সংকট থাকায় রাস্তায় বের হওয়া কিছু বাহন কয়েক গুণ বেশি ভাড়া আদায় করেছে যাত্রীদের কাছ থেকে। গাড়ি না পেয়ে অনেকেই পায়ে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছতে চেষ্টা করেন। দিনের শুরুতেই ভোগান্তিতে পড়ছেন জীবিকার তাগিদে পথে নামা মানুষরা।

অনেকে এটাকে পরিবহন শ্রমিকদের ‘অসভ্যতা’ বললেও অনেকে বলেছেন, চরম বাড়াবাড়ি। এটাকে বিরোধী দল সমূহের উস্কানি কিনা তাও ভেবে দেখা দরকার সরকারের সংশ্লিষ্ঠ কর্তৃপক্ষের। সাধারণ গাড়ি চলাচলে বাধা ও মারধর-হয়রানির বিষয়ে সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী দায়সারা তথ্য দিয়ে বলেন, ফেডারেশনের নিরীহ কর্মসূচির মধ্যে তৃতীয় পক্ষ কেউ ঢুকে বাধা দিতে পারে। এমন খবর পেয়েছি। খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তাদের লোক যে এটা করছে না তার প্রমাণ তিনি দিতে পারেননি।সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কালাম বলেন, শ্রমিকরা গাড়ি না চালালে কী করব বলেন ? কোনো বাস যাচ্ছে না, আসছেও না। সবকিছু বন্ধ।

গাবতলী ডিপোর ব্যবস্থাপক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, মিরপুর দশ নম্বরসহ কয়েক জায়গায় বাস আটকে দেওয়া হয়েছে। কামারপাড়া থেকে মতিঝিল যাওয়ার বাস আব্দুল্লাহপুরে আটকে দেওয়া হয়েছে। গাজীপুর ডিপোর ম্যানেজার বুলবুল আহমেদ বলেন, গাজীপুর চৌরাস্তা এবং বোর্ডবাজারে বাস আটকে দিয়েছেন পরিবহন শ্রমিকরা। বিআরটিসির কয়েক জন চালককে পিটিয়েছেন তারা। এ জন্য বাস চালানো বন্ধ আছে।

নারায়ণগঞ্জে সরকারি মহিলা কলেজের ছাত্রীদের বহন করা বাসেও হামলা চালিয়েছেন আন্দোলনরত পরিবহন শ্রমিকরা। এ সময় তারা বাসচালক ও ছাত্রীদের গায়ে কালি লেপন করেছেন। পাশাপাশি ভেঙেছেন বাসের গ্লাস। দুপুরে ঢাকা নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের সাইনবোর্ড এলাকায় একটি পাম্পের কাছে এ ঘটনা ঘটান শ্রমিকরা।শ্রমিকরা বলেছেন, পাস হওয়া সড়ক আইনটির মূল আপত্তি হচ্ছে জামিন-অযোগ্য ধারা বাতিল করে জামিনযোগ্য করা। এ ছাড়া দুর্ঘটনার জন্য চালকের পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার বিপক্ষে পরিবহন নেতারা।

চলমান কর্মবিরতিকে অবৈধ ও শ্রম আইনবিরোধী কর্মসূচি হিসেবে আখ্যায়িত করেছে সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগ। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সংগঠনটি ফেডারেশনের এ কর্মসূচি প্রত্যাহারের আহ্বান জানায়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সাধারণ সম্পাদক ইনসুর আলী।বাংলাদেশ পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেছেন, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের অনুরোধের পরও দেশব্যাপী ৪৮ ঘণ্টার ধর্মঘট প্রত্যাহার করা সম্ভব নয়। রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনালে তিনি এ কথা জানান।

ওসমান আলী বলেন, বাংলাদেশ পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের পক্ষ থেকে গত ২৭ সেপ্টেম্বর সরকারের কাছে দাবির একটি তালিকা জমা দেওয়া হয়। কিন্তু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এতে কর্ণপাত করেননি। ধর্মঘট শুরু হওয়ার আগে তিনি এ অনুরোধ করতে পারতেন জানিয়ে ওসমান আলী আরও বলেন, নতুন সরকার অথবা নতুন সংসদ এলে পরিবহন শ্রমিকদের দাবিগুলো বিবেচনা করার কথা বলার আগে তিনি (কাদের) পরিবহন শ্রমিক নেতাদের আলোচনায় ডাকতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা করেননি।

সারা দেশে দূরপাল্লার যাত্রীবাহী ও পণ্যবাহী যানের পাশাপাশি বড় শহরগুলোয় নগর পরিবহন গত ৪৮ ঘন্টা বন্ধ থাকায় দেশের প্রায় প্রতিটি শহরেই পথে নামা মানুষজনকে ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। রোগীদের পোহাতে হয়েছে চরম দুর্ভোগ।বাণিজ্যিক রাজধানীখ্যাত চট্টগ্রামে পদে পদে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে পথে বের হওয়া মানুষজনকে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন পূর্বাঞ্চলীয় সভাপতি মৃণাল চৌধুরী বলেন, পরিবহন শ্রমিকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই ধর্মঘট পালন করছেন। তাদের কোনোরকম চাপ দেওয়া হয়নি। যে দাবিতে আমাদের ধর্মঘট, তা অত্যন্ত ন্যায়সঙ্গত ও যৌক্তিক।

চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার আমেনা বেগম জানান, বন্দর এলাকায় পরিবহন শ্রমিকরা ছোট যানবাহন চলাচলেও বাধা দিয়েছেন। যারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে গাড়ি চালাবেন, তাদের বাধা দেওয়ার অধিকার কারও নেই। তবে আমরা চেষ্টা করছি পিকেটিং নিয়ন্ত্রণ করতে।তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করে কোনো গাড়ি না পেয়ে বিরক্ত হয়ে বাচ্চা নিয়ে বাসা ফেরেন বাদুড়তলা এলাকার বাসিন্দা শাহেনা বেগম। তিনি বলেন, এই দেশটা যে যার ইচ্ছামতোই চালাচ্ছে। পরিবহন শ্রমিকরা ৪৮ ঘণ্টা শেষ হলে কি সড়কে গাড়ি চালাবেন না, তখন তাদের এই নীতিকথা কোথায় যাবে? সরকারের উচিত আজকে যারা সুযোগ বুঝে গাড়ি চালানো বন্ধ করেছে, তাদের নিবন্ধন বাতিল করা।

বরিশাল প্রতিনিধি জানান, ৮ দফা দাবিতে সারাদেশের মতো বরিশালেও ৪৮ ঘন্টার পরিবহন ধর্মঘট পালিত হচ্ছে। নগরীর দুটি বাস টার্মিনাল থেকে দূরপাল্লার কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। এতে দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে যাত্রীদের। যাত্রীরা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, টমটম-ভটভটি ও মোটরসাইকেলে চেপে গন্তব্যে পৌঁছেন। রূপাতলি বাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক কাওছার হোসেন শিপন জানান, কেন্দ্রঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে আমরা পরিবহন শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করছি।

সিলেট রিপোর্টার জানান, পরিবহন শ্রমিকদের কর্মবিরতি আর যান চলাচলে স্থানে স্থানে বাধা সৃষ্টির কারণে সিলেটে ভোর থেকে প্রায় সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।রাজশাহী প্রতিনিধি জানান, সকাল থেকে আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার সব বাস চলাচল ছিল বন্ধ। রাজশাহীর শহীদ এএইচএম কামরুজ্জামান বাস টার্মিনাল, ঢাকা বাস টার্মিনাল ও নওদাপাড়া বাস টার্মিনাল থেকে সকাল ৬টার পর কোনো বাস ছেড়ে যায়নি।

খুলনা প্রতিনিধি জানান, পরিবহন ধর্মঘটের কারণে চরম দুর্ভোগে পড়েন খুলনা অঞ্চলের হাজার হাজার যাত্রী। বিশেষ করে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুয়েট) ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে দূর থেকে আসা শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা পড়েছেন আরও বিপাকে। ধর্মঘটের কারণে অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার কোনো বাস ছেড়ে না যাওয়ায় যাত্রীরা দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন। এতে চাপ বেড়েছে ছোট ছোট যানবাহন ও ট্রেনের ওপর।

রংপুর প্রতিনিধি জানান, শহরের বাস টার্মিনাল থেকে কোনো রুটে বাস চলাচল করেনি। সকালে রংপুর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল ও ঢাকা কোচস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখা যায়, শত শত যাত্রী যানবাহনের জন্য অপেক্ষা করছেন।নরসিংদী প্রতিনিধি জানান, ঢাকা-সিলেট মহসড়কের স্থানে স্থানে অবস্থান নিয়ে যান চলাচলে বাধা দেন আন্দোলনরত পরিবহন শ্রমিকরা। ফলে এ মহাসড়কে কোনো বাস-ট্রাক চলেনি। এমনকি সিএনজি-রিকশা থামিয়েও যাত্রীদের নামিয়ে দেন তারা। বাধা দিলে মুখে কালি মেখে দেওয়াসহ নানাভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে পথে বের হওয়া মানুষজনকে।

আমাদের গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, গতকালের মতো আজ সোমবারও সকাল থেকে গাজীপুরের ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে কোনো বাস-ট্রাক চলেনি। সকাল থেকে পরিবহন শ্রমিকরা চান্দনা চৌরাস্তা, শিববাড়ী মোড়সহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে যান চলাচলে বাধা দেয়। অটোরিকশা ও রিকশা চললেও অনেক পরিবহন শ্রমিক তাদের নামিয়ে দিচ্ছে। এ ছাড়া বিআরটিসি বাস সকালে কয়েকটি দেখা মিললেও পরিবহন শ্রমিকদের বাধার মুখে দুপুরের পর সেগুলোর চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।