• রোববার , ২৬ জুলাই ২০২৬

সেদিন যেভাবে বাঁচলেন শেখ হাসিনা-


প্রকাশিত: ৩:৩১ পিএম, ২১ আগস্ট ১৯ , বুধবার

নিউজটি পড়া হয়েছে ৪৩০ বার

শফিক রহমান : ২১শে অগাস্টের গ্রেনেড হামলা-বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায়-। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত নৃশংস সহিংসতার যেসব ঘটনা ঘটেছে,র ঘটনা তার মধ্যে সবচেয়ে জঘণ্যতম একটি। ঐ ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর প্রভাবও ফেলেছিল। ওই দিন নেতাকর্মীদের মানবঢাল বাঁচিয়ে দেয় শেখ হাসিনাকে।

২০০৪ সালের ২১শে অগাস্ট শনিবার ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে এক সমাবেশে জড়ো হয়েছিলেন সিনিয়র নেতারা। দলটির প্রধান এবং তখনকার বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনা ছিলেন ঐ সমাবেশের প্রধান অতিথি।আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে রাস্তায় একটি ট্রাকে অস্থায়ী মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল। বিকেল তিনটা থেকে দলটির কিছু মধ্যম সারির নেতা বক্তব্য দেয়া শুরু করেন।বিকেল চারটার দিকে শুরু হয় আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের বক্তব্য দেয়ার পালা। পরে দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা বক্তৃতা দেন। তিনি বক্তৃতা শেষ করতে কেবল জয় বাংলা পর্যন্ত বলেছেন ঠিক তখনি বিকট আওয়াজ..।

ওই সময় নেত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা অবসরপ্রাপ্ত স্কোয়াড্রন লিডার আব্দুল্লাহ আল মামুন ও অবসরপ্রাপ্ত মেজর শোয়েব মো. তারিকুল্লাহ ছিলেন ট্রাকের ওপর। তাঁর জানান, ট্রাকের পেছনে বাঁ দিকে একটি সিঁড়ি ছিল মঞ্চে ওঠার জন্য।ট্রাকের শেষ মাথায় ডানদিকে রাখা টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তব্য দেন। মঞ্চ থেকে নামার সিঁড়ির কয়েক গজের মধ্যে দাঁড় করিয়ে রাখা ছিল হাসিনার বুলেট প্রুফ মার্সিডিজ গাড়িটি।

মামুন বলেন, আপার (শেখ হাসিনা) বক্তৃতা তখন শেষের দিকে। উনার দুই পাশে মোহাম্মদ হানিফ, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়াসহ আওয়ামী লীগের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা দাঁড়িয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তৃতা চলার পুরোটা সময় মামুন ট্রাকের ওপরে রাখা টেবিলের পাশে বসেছিলেন। সিঁড়ির শেষ ধাপে দাঁড়ানো ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর শোয়েব। আর গাড়ির কাছে ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল তারেক আহমেদ সিদ্দিক।

মামুন বলেন, কয়েক বছর আপার সঙ্গে থেকে বুঝতে পারতাম- কখন উনার বক্তৃতা শেষ হবে। সেদিনও বক্তৃতা শেষ হবে বুঝতে পেরে উঠে আপার কাছে যাচ্ছিলাম। টেবিলটার ঠিক কোণায় পৌঁছাতেই প্রথম গ্রেনেড ফাটল।এর পরপরই আরও তিনটি বিস্ফোরণ হয়। চারদিকে ধোঁয়ায় আছন্ন হয়ে যায়।নেত্রীর পাশে শুধু আমি আর মোহাম্মদ হানিফ। হানিফ ভাই আপাকে বসানোর চেষ্টা করছেন। আমিও বসে পড়তে বললাম। কিন্তু আপা বসতে চাচ্ছিলেন না। এক পর্যায়ে তাকে প্রায় জোর করে বসালাম।

হানিফ ভাই আপার মাথা টেবিলের নিচে ঢুকিয়ে দিলেন। আমার দৃষ্টি তখন আওয়ামী লীগ অফিসের পাশে বাটার দোকানের দিকে। তবে মনে হচ্ছিল রমনা ভবনের আশপাশ থেকে গ্রেনেড ছোড়া হচ্ছে।এর মধ্যে ট্রাকের আশপাশে আরো তিনটি গ্রেনেড বিস্ফোরিত হয়। ট্রাকের সিঁড়ির শেষ প্রান্তে দাঁড়ানো শোয়েব চিৎকার করে মামুনকে বলেন, যেন শেখ হাসিনাকে দ্রুত নামিয়ে আনা হয়।মামুন বলেন, আপাকে নিয়ে সিঁড়ির কাছে যেতেই ট্রাকের পেছনের ডালায় একটা গ্রেনেড এসে বাড়ি খেয়ে পাশেই বিস্ফোরিত হল। সম্ভবত ওই বিস্ফোরণেই ট্রাকের তেলের ট্যাংক ফুটো হয়ে যায়। গ্রেনেড বিস্ফোরিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আপাকে নিয়ে আমি আবার আগের জায়গায় সরে আসি।

ইতোমধ্যে নেতাকর্মী ও নিরাপত্তাকর্মীরা শেখ হাসিনাকে ঘিরে তৈরি করেন মানবঢাল। মামুন, মোহাম্মদ হানিফ, মোফাজ্জল হোসেন মায়া, নজিবউদ্দিন আহমদ (শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই) তাকে ঘিরে ধরেন।কিন্তু শোয়েব তখন তাগাদা দেন, তেলের ট্যাংক ফুটো হয়ে গেছে, শেখ হাসিনাকে ট্রাকের ওপর নিয়ে আর অপেক্ষা করা ঠিক হবে না। যে কোনো মুহূর্তে ট্রাকে আগুন ধরে যেতে পারে।সেই মুহূর্তে আমি কোনো দিকে না তাকিয়ে আপাকে ধরে দাঁড়ালাম। তার পায়ে স্যান্ডেল ছিল না, চশমাও খুঁজে পাচ্ছিলেন না। সিঁড়ির মাঝখান পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার পর শোয়েব ভাইও আপাকে ধরলেন। তাকে নিয়ে সোজা গাড়ির সামনে বাঁ দিকের সিটে বসানো হল।

কিন্তু আহতদের ছেড়ে শেখ হাসিনা যেতে চাইছিলেন না জানিয়ে আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ইচ্ছার বিরুদ্ধে প্রায় জোর করে তাকে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ থেকে সুধা সদনে নিয়ে যাওয়া হয়। ট্রাক আর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের মাঝখানের জায়গায় বেশ কয়েকটি ছিন্নভিন্ন লাশ পড়ে ছিল। হামলায় আহতরা কাতরাচ্ছিলেন।আপা বললেন, ‘এদের কী হবে? এদের রেখে তো যাওয়া যাবে না।’ আপার কথায় কান না দিয়ে ড্রাইভার মতিন ভাইকে (মোহাম্মদ আব্দুল মতিন) বললাম- গাড়ি চালান।শেখ হাসিনাকে বাঁচাতে গিয়ে সেদিন গ্রেনেডের অসংখ্য স্প্লিন্টার বিদ্ধ হয় তারেক আহমেদ সিদ্দিক, আব্দুল্লাহ আল মামুন ও শোয়েব মো. তারিকুল্লাহর দেহে।

শোয়েবের ধারণা, যারা সেদিন গ্রেনেড ছুড়ছিল, তারা শেখ হাসিনার অবস্থান ভালোভাবেই দেখতে পাচ্ছিল। তিনি বলেন, আপাকে ট্রাক থেকে নামানোর জন্য প্রথমবার চেষ্টা করার সময়েই ট্রাকের পেছনের ডালায় একটি গ্রেনেড এসে পড়ে। আর তাকে গাড়িতে তোলার পরপরই গাড়ির দিকে ছোড়া হয় গুলি।মামুন বলেন, গাড়িতে ওঠার পর আপা বললেন, তোমরা ঠিক আছ তো! কিন্তু উনি কানে ঠিকমত শুনতে পাচ্ছিলেন না। সুধা সদনে ফেরার পথে খেয়াল করলাম আমাদের আশপাশে পুলিশের কোনো গাড়ি নেই।

সচিবালয়ের সামনে দিয়ে দোয়েল চত্বর হয়ে শহীদ মিনার, পলাশী পেরিয়ে ইডেন কলেজের সামনে প্রথম ট্রাফিক সিগন্যালে পড়ি। এরপর নিউ মার্কেটের সামনে দিয়ে পিলখানার ভেতর দিয়ে আমরা সুধা সদনে পৌঁছাই। গাড়ির পেছনে সিটে আমি, শোয়েব ভাই আর তারেক স্যার ছাড়াও মায়া ভাই ও নজিব ভাই ছিলেন।সেদিনের হামলায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন ১৬ জন। আইভি রহমান ৫৮ ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ২৪ অগাস্ট মারা যান। প্রায় দেড় বছর পর মৃত্যু হয় ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফের। পরে সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৪ জনে।

ঘটনা সম্পর্কে আমির হোসেন আমু বলেন, নেত্রীর বক্তব্য শেষ হবার লগ্নে হঠাৎ করে বিকট শব্দ শুনলাম। প্রথমে আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না, এদিক-ওদিক তাকালাম। তখন চারপাশে চিৎকার শুনতে পেলাম। এভাবে দফায়-দফায় বিস্ফোরণের শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে উঠে। সমাবেশে উপস্থিত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা প্রথমে বুঝতে পারেননি যে এটি ছিল গ্রেনেড হামলা। অনেকেই ভেবেছিলেন বোমা হামলা। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা ঘটনার ভয়াবহতা সম্পর্কে আঁচ করেছিলেন।

যখন গ্রেনেড হামলা শুরু হলো, তখন মঞ্চে বসা আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা শেখ হাসিনার চারপাশে ঘিরে মানব ঢাল তৈরি করেন – যাতে তাঁর গায়ে কোন আঘাত না লাগে। যেসব নেতা শেখ হাসিনাকে ঘিরে মানব ঢাল তৈরি করেছিলেন, তাদের মধ্যে ছিলেন ঢাকার সাবেক মেয়র মোহাম্মদ হানিফ। তখন মি: হানিফের মাথায় গ্রেনেডের আঘাত লেগেছিল। পরবর্তীতে ২০০৬ সালের শেষের দিকে তিনি মারা যান।

গ্রেনেড হামলার পর বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তখনকার বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, নেতা-কর্মীরা জীবন দিয়ে তাঁর জীবন রক্ষা করেছিলেন। কান্না জড়িত কণ্ঠে শেখ হাসিনা বলেন, “আমার নেতা-কর্মীরা সবাই আমাকে এমনভাবে ঘিরে রেখেছিল যে অনেকেই ইনজিউরড (আহত) হয়েছে। তাদের রক্ত এখনও আমার কাপড়ে লেগে আছে। আমার নেতা-কর্মীরা তাদের জীবন দিয়েই আমাকে বাঁচিয়েছে।ঐ গ্রেনেড হামলায় ২৪জন নিহত, আর আহত হয় আরও অনেকে।

২১শে অগাস্টের হামলার সময় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আহতদের সাহায্যে এগিয়ে না এসে পুলিশ উল্টো তাদের হেনস্থা করেছে। সে সময় ক্ষমতায় থাকা বিএনপি সরকারের ভূমিকা নিয়েও নানা বিতর্ক এবং প্রশ্ন রয়েছ। তখনকার বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “আমাদের নেতা-কর্মীরা যখন আহতদের সাহায্য করতে গেছে, ঠিক সে সময় পুলিশ উল্টো টিয়ারগ্যাস, লাঠিচার্জ ও তাদের গ্রেফতার করতে শুরু করেছে।শেখ হাসিনা বলেন, আহতদের সাহায্য করতে এগিয়ে না এসে পুলিশ যখন উল্টো টিয়ার গ্যাস, লাঠিচার্জ ও গ্রেফতার করতে শুরু করলো, তখন বুঝতে পারা যায় যে এ ঘটনা তাদের মদদে হয়েছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, গ্রেনেড হামলার সেই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে, যার ফলে দুই প্রধান দলের মধ্যে সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়েছে।আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করেন, তাদের দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যার জন্যই সেদিনের গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছিল।গ্রেনেড হামলার সময় এবং তারপরের তদন্ত নিয়ে পুলিশের নিস্ক্রিয়তায় প্রশ্ন উঠেছিল তৎকালীন বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে।

জজ মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে দিয়ে গ্রেনেড হামলার বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দেয়ার বিষয়টি ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল।২০০৭ সালের সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ওই হামলার ঘটনায় পুনরায় তদন্ত হয়।সেখানে নিষিদ্ধ সংগঠন হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আবদুল হান্নান এবং তৎকালীন বিএনপি সরকারের উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর নাম আসে।২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে পুনরায় তদন্ত হয়।

ঐ তদন্তে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে ও বিএনপি’র অন্যতম শীর্ষ নেতা তারেক রহমান, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর সহ বেশ কয়েকজন পদস্থ সামরিক কর্মকর্তা এবং পুলিশের সাবেক তিনজন মহাপরিদর্শক বা আইজিপি’র নাম আসে।যদিও বিএনপি অবশ্য এই তদন্তকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক’ বলে বর্ণনা করে।

২১ অগাস্ট হামলায় নিহত অন্যরা হলেন শেখ হাসিনার দেহরক্ষী ল্যান্স করপোরাল (অব.) মাহবুবুর রহমান, হাসিনা মমতাজ, রিজিয়া বেগম, রফিকুল ইসলাম (আদা চাচা), রতন শিকদার, মোহাম্মদ হানিফ ওরফে মুক্তিযোদ্ধা হানিফ, মোশতাক আহমেদ, লিটন মুনশি, আবদুল কুদ্দুছ পাটোয়ারী, বিল্লাল হোসেন, আব্বাছ উদ্দিন শিকদার, আতিক সরকার, মামুন মৃধা, নাসিরউদ্দিন, আবুল কাসেম, আবুল কালাম আজাদ, আবদুর রহিম, আমিনুল ইসলাম, জাহেদ আলী, মোতালেব ও সুফিয়া বেগম। একজনের পরিচয় এখনও জানা যায়নি।