সবাই কাঁদিয়ে রাতের আঁধারে বুলবুল..
বিশেষ প্রতিনিধি : সবাই কাঁদিয়ে রাতের আঁধারে বুলবুল হয়ে গেলেন একাকী তারা..! সংগীতের সব জানালা খুলে দেয়া বিজয়ের এই কারিগর চলে গেছেন না ফেরার দেশে। সংগীতের স্রষ্টা ‘সবকটা জানালা খুলে দাও না, আমি গাইবো গাইবো বিজয়েরই গান’ এর সেই প্রখ্যাত বীর মুক্তিযোদ্ধা, প্রখ্যাত গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল আর নেই (ইন্না লিল্লাহি…রাজিউন)। আজ মঙ্গলবার ভোর ৪টার দিকে রাজধানীর আফতাবনগরে নিজ বাসায় তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬২ বছর।
তার মৃত্যুতে সঙ্গীতাঙ্গনের পাশাপাশি দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বুলবুলের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। কিংবদন্তি এই শিল্পীর হঠাৎ চলে যাওয়া, মেনে নিতে পারছেন না সঙ্গীতাঙ্গনের কেউই।
ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. আশীষ চক্রবর্তী জাতিরকন্ঠকে বলেন, আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তাকে সকাল সোয়া ছয়টা নাগাদ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। তখন চিকিৎসকরা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
প্রখ্যাত এই সংগীত পরিচালক ভোর সাড়ে ৫টার দিকে মারা গেছেন বলে ধারণা করছেন ডা. আশীষ।আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে তার ছেলে সামীর আহমেদ জাতিরকন্ঠ কে বলেন, ভোর রাতেই বাবা মারা গেছেন।বুধবার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের মরদেহ সর্বস্তরের মানুষের শেষশ্রদ্ধা জানানোর জন্য সকাল ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হবে। এরপর জোহর বাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে তার প্রথম জানাজা হবে। এরপর নিয়ে আসা হবে এফডিসিতে। সেখানে দ্বিতীয় জানাজা শেষে দাফন করা হবে শহিদ বুদ্ধিবীজী কবরস্থানে।
জানা গেছে, ২০১৮ সালের মাঝামাঝিতে বুলবুলের হার্টে আটটি ব্লক ধরা পড়ে। পরে তার শারীরিক অবস্থার কথা জানতে পেরে চিকিৎসার দায়িত্ব নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর বুলবুলকে হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। সেখানে শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে চিকিৎসকরা বুলবুলের বাইপাস সার্জারি না করে শরীরে রিং পরানোর সিদ্ধান্ত নেন। এর পরে তার শরীরে দুটি স্টেন্ট (রিং) স্থাপন শেষে সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরেন তিনি।
১৯৭০-এর দশকের শেষের দিক থেকে চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সংগীতে সক্রিয় হন এই বরেণ্য সুরকার। ১৯৭৮ সালে ‘মেঘ বিজলি বাদল’ ছবিতে সংগীত পরিচালনার মধ্যে দিয়ে চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন তিনি। সেই থেকে তিন শতাধিক চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করেছেন তিনি।
রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মান একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং রাষ্ট্রপতির পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। ১৯৭১ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তিনি।
বুলবুলকে নিয়ে শিল্পীদের স্মৃতিকথা
না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন প্রখ্যাত সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। তার মৃত্যুতে সঙ্গীতাঙ্গনের পাশাপাশি দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বুলবুলের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। কিংবদন্তি এই শিল্পীর হঠাৎ চলে যাওয়া, মেনে নিতে পারছেন না সঙ্গীতাঙ্গনের কেউই।
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে এখন বুলবুল হারানোর শোকের মাতম চলছে। শিল্পীসহ ভক্তরা গুণী এই মানুষটিকে নিয়ে ফেসবুকে স্মৃতিচারণ করে যাচ্ছেন।সেখান থেকে জাতিরকন্ঠ পাঠকদের জন্য কিছু স্মৃতিকথা এখানে তুলে ধরা হলো:-
সংগীতশিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ : স্বাধীনতার পরবর্তীকালে যত দেশের গান হয়েছে, বুলবুল ভাইয়ের গানগুলোই দর্শক নন্দিত হয়েছে। তার গানগুলো এখনও মানুষের মুখে ফেরি করে বেড়ায়। কথার গভীরতা, সুরের যাদুকর- এই মানুষটির বিদায় মেনে নেওয়া যায় না। তিনি কখনও নিজের ও পরিবারের চিন্তা করেননি। তার ধ্যানজ্ঞান সবই ছিল সংগীত ঘিরে। তার চলে যাওয়ায় সংগীতে যে ক্ষতি হয়েছে, তা কখনও পূরণ করা সম্ভব না।
চিত্রনায়ক শাকিব খান : বীর মুক্তিযোদ্ধা, দেশ বরেণ্য গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল আর নেই.. (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার চলে যাওয়ায় বাংলা সংগীতের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। গুণী এই মানুষটির মৃত্যুতে জানাই গভীর শোক। ওপারে ভালো থাকবেন অসংখ্য কালজয়ী গানের সৃষ্টা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল..
অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী : বিনম্র শ্রদ্ধা…. আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল….
নির্মাতা আনজাম মাসুদ : বীর মুক্তিযোদ্ধা, জনপ্রিয় গীতিকবি, সুরকার-সংগীত পরিচালক, অনেক জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল এর মৃত্যুতে ‘প্রেজেন্টার্স প্লাটফর্ম অফ বাংলাদেশ’ (পিপিবি) গভীর শোক প্রকাশ করছে। ‘পিপিবি’ তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছে। মহান আল্লাহতাআলা তাকে জান্নাত নসিব করুন। আমিন। তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি জানাচ্ছে গভীর সমবেদনা।
সংগীত পরিচালক শওকত আলী ইমন : একে একে সবাইতো চলে যাচ্ছেন। তবুও আপনার কি এতই তাড়া ছিল! আমাকে প্রায়ই বলতেন ‘ইমন তোর সাথে আমার অনেক কথা আছে’, কই কথাগুলো তো বলে গেলেন না বুলবুল ভাই। আপনি ছিলেন আমার গুরু, আমার শিক্ষক, আমার সব ভাল কাজের উৎসাহ প্রেরণকারী বটবৃক্ষ। আপনি এ দেশের জন্য যা দিয়ে গেছেন, যতদিন এ জাতি বেঁচে থাকবে আপনার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে সবার হৃদয়ে বুলবুল ভাই।
অনেক পেয়েছি, শিখেছি আমিও আপনার কাছ থেকে। কত শত দিন-রাত পার করেছি স্টুডিওতে আপনার সাথে, নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখেছিলেন আজীবন, সবই এখন স্মৃতি। আল্লাহ আপনাকে বেহেশতের শ্রেষ্ঠতম স্থানে অভিষিক্ত করুন। আমিন।
ব্যান্ডশিল্পী তন্ময় তানসেন : রাতের আঁধারে আমি, একাকী তারা….. আপনি তারা হয়ে জ্বলবেন..
সঙ্গীতশিল্পী প্রতীক হাসান : ‘জন্ম’ ছবি থেকে শুরু, আপনার হাত ধরে বাংলাদেশের নায়ক কণ্ঠ হওয়ার সৌভাগ্য আমার। আপনার সৃষ্টি বাবার অসাধারণ কিছু গান গেয়ে আমি আজ প্রতীক হাসান। আমাকে দিয়েছেন অকৃত্রিম ভালোবাসা, পথচলার অনুপ্রেরণা আর আজীবন গাওয়ার কিছু গান। ভালো থাকবেন চাচা। আমাদের সবাইকে কাঁদিয়ে, একা করে। আপনার গানের মাঝেই অমর হয়ে থাকবেন আপনি।
সঙ্গীতশিল্পী ইমরান : অনেক বড় একটা দুঃসংবাদ দিয়ে সকাল শুরু! দেশ বরেণ্য সুরকার, গীতিকার, মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল (স্যার) আমাদের মাঝে আর নেই! ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন। আজ ভোর ৪টার দিকে তিনি ইন্তেকাল করেছেন।
কণ্ঠশিল্পী কোনাল : ঘুমিয়ে গেছে, অভিমানী গানের পাখি।
কণ্ঠশিল্পী কর্ণিয়া : সকালটা এভাবে শুরু হবে ভাবিনাই! মুক্তিযোদ্ধা, বরেণ্য গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল স্যার আর নেই। ওপারে ভালো থাকবেন স্যার।
কণ্ঠশিল্পী সন্দীপন : আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল.. হে গুণী মহাপ্রস্থানে অশ্রু সজল বিনম্র শ্রদ্ধা …তুমি বেঁচে থাকবে হৃদয়ে, মননে, কর্মে যতদিন বাংলাদেশ থাকবে।
কণ্ঠশিল্পী সিঁথি সাহা : আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল স্যার আর নেই। আমাদের হৃদয়ে থাকবেন আপনি।
কণ্ঠশিল্পী নাজনীন মিমি : আহা জীবন, বুলবুল ভাই আল্লাহ আপনাকে বেহেসত নসিব করুক। এক সাথে কত গান, কত স্মৃতি, কত কথা। আপনার লেখা বই উপহার, মনে থাকবে…
সঙ্গীতশিল্পী লুৎফর হাসান : সবকটা জানালা খুলে দাও না। এই গানটি বুলবুল সুর করেছিলেন নজরুল ইসলাম বাবুর গীতিকবিতা থেকে। ‘ও মাঝি নাও ছাইড়া দে’ এসএম হেদায়েতের কথা থেকে সুর করেছিলেন বুলবুল। ‘সেই রেল লাইনের ধারে’ মোহাম্মদ রফিকউজ্জামানের গীতিকথায় বুলবুল সুর করেছেন। ‘মা গো আর তোমাকে’ গাজী মাজহারুল আনোয়ারের কথায় সুর করেছেন বুলবুল। ‘একতারা লাগে না আমার’ মনিরুজ্জামান মনিরের কথা বুলবুলের সুর। ‘সুন্দর সুবর্ণ তারুণ্য লাবন্য’ আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের নিজের কথা ও সুরের গান। এই গানগুলো গেয়েছেন সাবিনা ইয়াসমিন। বাংলাদেশের ইতিহাসের সুরের যে অধ্যায় সেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের এটিও একটি।
কণ্ঠশিল্পী ফারহিন খান জয়িতা : কীর্তিমানের মৃত্যু নাই। শ্রদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। ভালো থাকবেন।
কণ্ঠশিল্পী লোপা হোসেইন : ক্লোজআপ ওয়ান শুরু করেছিলাম আপনার গান দিয়ে। সবশেষ টিভি লাইভও শুরু করেছিলাম আপনার দেশের গান দিয়ে। এমন কোনো টিভি বা মঞ্চ অনুষ্ঠান নেই যেখানে আপনার অন্তত একটি গানও গাইনি আমি। বাংলা গানের মডার্ন মেলোডি মানেই ছিলেন আপনি।
তিনি “ছিলেন”… আজ আরও এক কিংবদন্তি স্মৃতি হয়ে গেলেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা, গীতিকার, সুরকার, একজন সাহসী মানুষ, একজন দরদী মানুষ আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল স্যার,আপনার জন্য অনেক অনেক দোয়া। আল্লাহ আপনাকে শান্তিতে রাখুন।
নির্মাতা বন্ধন বিশ্বাস : ‘সবকটা জানালা খুলে দাও না, আমি গাইবো গাইবো বিজয়েরই গান’ আপনি বাংলা গানের বিজয়ের কারিগর ছিলেন। ইতিহাস ছিলেন, এই ইতিহাস বাংলাদেশ ভুলবে না। আপনার চিরবিদায় একটা অধ্যায়জুড়ে শুধু শূন্যতায়।
ওপারে ভালো থাকবেন কিংবদন্তি…
নির্মাতা মাহমুদ দিদার : দাদা এভাবে না বলে চলে গেলেন! আপনিতো কথা দিয়েছিলে, দাদা আমাদের ছবির গানগুলো আপনি…বাংলাদেশের গানের সুর শ্রষ্ঠা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল আজ ভোর বেলা না ফেরার দেশে চলে গেছেন। দাদা আপনি যেখানেই থাকুন আপনার সৃষ্টি বাংলাদেশের দলিল হয়ে থাকবে।



