রাজপ্রাসাদে ইরফান সেলিমের চাঁদাবাজি-সন্ত্রাসীর হেরেমখানা

শফিক রহমান : ২৬ দেবিদাসঘাট লেনের এই আলিশান রাজপ্রাসাদটি হাজি সেলিমের। হাজি সেলিমের প্রতাপে একসময় এই প্রাসাদে অনেকের দর্পচূর্ণ হতো। তার ছেলে ইরফান সেলিম সেই প্রতাপেই তাবেদারি চাঁদাবাজি করছিল। ফলে প্রাসাদেই গড়ে ওঠে সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের ছেলে ইরফান সেলিমের অপরাধ জগত। এখান থেকেই নিয়ন্ত্রণ হতো পুরান ঢাকা।
চলতো চাঁদাবাজি-সন্ত্রাসী কার্যক্রম। প্রাসাদের ছাদে লাগানো হয়েছে গোল্ডেন টেলিস্কোপ। এটা দিয়ে ইরফান শনির বলয় দেখত নাকি আকাশের তারা গুনত, নাকি বিএনপির সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের মত লুকিং ফর শত্রুজ খুঁজত তা নিয়ে আলোচনার অবকাশ রয়েছে। তবে র্যাব বলেছে, ইরফান সেলিম তার সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালাতে এজন্য গড়ে তোলে শক্তিশালী এক ওয়ারলেস নেটওয়ার্ক। তাই গ্রেফতারের সময় হাতকড়া পরিয়ে ইরফান সেলিমকে নামানো হয় হাজি সেলিমের ভবন থেকে।সোমবার সন্ধ্যায় ইরফানের বাড়ির পাশে মদিনা আশিক টাওয়ারের ১৭ তলায় অভিযান চালায় র্যাব। সেখানে ১৪ তলার একটি রুম টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার করতো ইরফান সেলিম।অভিযানে ওই রুম থেকে দড়ি, হাতুড়ি, রড, মানুষের হাড়, গামছা, ওয়াকিটকি, হাতকড়াসহ টর্চারের বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।
র্যাবের অভিযানে বেড়িয়ে এসেছে নানা চমকপ্রদ তথ্য। সোমবার বেলা সাড়ে ১২টায় চকবাজারের ‘দাদা বাড়ি’ নামের সেই ভবনে শুরু হয় র্যাবের অভিযান। চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত। অভিযানের সময় হাজী সেলিম বাসায় ছিলেন না। অভিযানে মেলে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মদ, মদের বোতল, বিয়ার, বিপুল পরিমাণ ওয়াকিটকি, ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইস ও হ্যান্ডকাফ।এ ছাড়া বেডরুম থেকে উদ্ধার করা হয় অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। একটি গুলিসহ পিস্তল, আরেকটি বন্দুক। এগুলোর লাইসেন্স নেই। উদ্ধার করা হয় শক্তিশালী অবৈধ ড্রোন, যেটা আমদানি করতে সিভিল এভিয়েশনের অনুমতি লাগে। অপরদিকে ইরফান সেলিমের দেহরক্ষী জাহিদের কাছে ৪০০ পিস ইয়াবা ও বিদেশি অস্ত্র পাওয়া যায়।
ইরফান ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের দ্বিতীয় ছেলে। এছাড়া তিনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর। আর নোয়াখালীর এক এমপির জামাতাও সে। অভিযান শেষে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ সাংবাদিকদের জানান, ইরফান সেলিমের বাসা থেকে পাঁচ-ছয় লিটার বিদেশি মদ, ১০ বোতল বিদেশি বিয়ার, ৩৮ থেকে ৪০টি ওয়াকিটকি উদ্ধার করা হয়। এসব দিয়ে হাজী সেলিমের ছেলে নিয়ন্ত্রণ করতো চাঁদাবাজি-সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক।
র্যাব জানান, ওয়াকিটকির মাধ্যমে এক শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন ইরফান সেলিম। এর মাধ্যমে তিনি এলাকা নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজি করতেন। সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাতেন। এসব ওয়াকিটকি মূলত আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবহার করে থাকে। ওই বাড়ির পাশে ইরফান সেলিমের একটি টর্চার সেলের সন্ধান মেলে। সেখানে তার প্রতিপক্ষ ও ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে নির্যাতন করা হতো। তাদের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করা হতো। এজন্য সেখানে রাখা ছিল হাতকড়া। যেটি জব্দ করা হয়েছে।
এদিকে অবৈধভাবে ওয়াকিটকি রাখা ও ব্যবহারের দায়ে ইরফান সেলিমকে ছয় মাস এবং মদ পান করার জন্য আরো ছয় মাসের কারাদণ্ড দেয় র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। মোট এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তার দেহরক্ষী জাহিদকেও একই দণ্ড দেওয়া হয়। এই দণ্ডের পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক আইনে দুটি মামলা দায়ের করবে র্যাব।



