যেভাবে উড়বে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-
ফ্লোরিডা থেকে এনামুর রেজা : বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-কিভাবে মহাকাশে যাবে তা নিয়ে যেন কল্পনার অন্ত নেই। স্থানীয় সময় ঘড়ির
কাঁটা ৪টা ১২ মিনিটে মহাকাশে ডানা মেলবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। এ মহাউৎসবে মাতছে ফ্লোরিডার বাংলাদেশীরা।
নাসা সূত্রে জানা গেছে, শুধু সরকারের প্রতিনিধিদলের সদস্য ও গণমাধ্যমকর্মীরা খুব কাছ থেকে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইন উৎক্ষেপণ পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পাবেন।
সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্যও কেনেডি স্পেস সেন্টারে আলাদা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে। বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা দলের নেতাকর্মীদের জন্য কেনেডি স্পেস সেন্টারের আশপাশে খোলা প্রান্তর থেকে উৎক্ষেপণ অনুষ্ঠান পর্যবেক্ষণের সুযোগ থাকবে।
জাতিরকন্ঠ অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্পেস এক্স-এর উৎক্ষেপণযান বা রকেট ফ্যালকন-৯ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটকে মহাকাশে ১১৯ দশমিক ১ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত অরবিট প্লটে স্থাপন করবে।ফ্রান্সের কান টুলুজ ফ্যাসিলিটিতে নির্মিত বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ ইতিমধ্যে ফ্রান্স থেকে বিশেষ ব্যবস্থায় কার্গো বিমানে করে উৎক্ষেপণস্থল ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোর ক্যাপ ক্যানাভেরালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম খ্যাতনামা স্যাটেলাইট নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ফ্রান্সের থেলেস এলেনিয়া স্পেস বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটটি নির্মাণ করেছে।
এদিকে বাংলাদেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের উৎক্ষেপণ উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সানসাইন স্টেট ফ্লোরিডা রাজ্যের বিনোদন শহর হিসেবে পরিচিত অরল্যান্ডো বাংলাদেশিদের পদচারণায় উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে। আনন্দের বন্যা বইছে সেখানকার বাংলাদেশিদের ঘরে ঘরে।
নিউইয়র্ক, নিউজার্সি, কানেকটিকাট, ম্যাসাচুসেটস, জর্জিয়াসহ বিভিন্ন রাজ্য থেকে শত শত বাংলাদেশি এখন অরল্যান্ডোমুখী। তারা সাক্ষী হতে চান ইতিহাসের, আর যা তাদের কাছে এতদিন ছিল শুধুই স্বপ্নের মতো। এখন তারা শুধুই ক্ষণগণনায় ব্যস্ত সেই মাহেন্দ্রক্ষণের।
স্থানীয় সময় ঘড়ির কাঁটা ৪টা ১২ মিনিটে মহাকাশে ডানা মেলবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (নাসা) ইতিমধ্যে দিনক্ষণ চূড়ান্ত করেছে। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।বাংলাদেশও প্রস্তুত। ইতিমধ্যে ঢাকা থেকে ফ্লোরিডা ছুটে গেছেন ৩০ সদস্যের দল।
এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম। তার সঙ্গে রয়েছেন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক, সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ ও ইমরান আহমেদ, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদসহ অন্যরা।
তাদের বিমানবন্দরে স্বাগত জানান উৎক্ষেপণ অনুষ্ঠানের সার্বিক তত্ত্বাবধানে থাকা সরকারি দল আওয়ামী লীগের যুক্তরাষ্ট্র শাখার সভাপতি ও বিশিষ্ট কৃষি বিজ্ঞানী ড. সিদ্দিকুর রহমানসহ ফ্লোরিডার স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ।
ড. সিদ্দিকুর রহমান জানান, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের উৎক্ষেপণ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ফ্লোরিডা যাওয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের সদস্যরা ফ্লোরিডার কোকোয়া বিচসংলগ্ন একটি হোটেলে উঠেছেন।
তিনি জানান, উৎক্ষেপণ অনুষ্ঠান উৎসবমুখর করতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্য থেকে দলের নেতাকর্মীরা ইতিমধ্যে ফ্লোরিডা যেতে শুরু করেছেন। শুধু দলের নেতাকর্মীরাই নন, এ অনুষ্ঠান পর্যবেক্ষণে ফ্লোরিডাগামী হচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ।এদিকে উৎক্ষেপণ অনুষ্ঠানের পরের দিন কোকোয়া বিচ হোটেলে এক সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস।
সজীব ওয়াজেদ জয় ওই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থাকতে পারেন বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।নাসার শিডিউল অনুযায়ী, স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে নিউইয়র্ক ও ঢাকা থেকে যাওয়া গণমাধ্যমকর্মীরা নাসার গবেষণাস্থল কেনেডি স্পেস সেন্টারে প্রবেশ করতে পারবেন। নাসার কার্যক্রম শুরু হবে সকাল ৭টা থেকে।
যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান জানান, ১০ মের অনুষ্ঠান স্মরণীয় করে রাখতে পুরো দিনটি ঘিরে ফ্লোরিডা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ব্যাপক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সকাল থেকে কেনেডি স্পেস সেন্টারের আশপাশে নেতাকর্মীরা আনন্দ র্যালি বের করবেন। সন্ধ্যার পর থেকে ফ্লোরিডার আকাশজুড়ে আতশবাজির ঝলকানি দেখা যাবে।তিনি বলেন, ৯ মে থেকে কেনেডি স্পেস সেন্টারের পার্শ্ববর্তী কোকোয়া বিচের অধিকাংশ হোটেলে রুম খালি নেই। অভ্যন্তরীণ এয়ারলাইনসগুলোতেও আসন মিলছে না।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট মহাকাশে গেলে নিজস্ব স্যাটেলাইটের অধিকারী বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ ঘটবে। এ ছাড়া এই স্যাটেলাইট স্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশের যেমন নির্ভরতা কমবে অন্য দেশের ওপর, তেমনি দেশের অভ্যন্তরীণ টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ৯০২ কোটি টাকা। সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে এক হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা এবং অবশিষ্ট এক হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা বিডার্স ফাইনান্সিংয়ের মাধ্যমে ব্যয় সংকুলান হয়েছে।বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ভূমি থেকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার জন্য গাজীপুর জেলার জয়দেবপুরে প্রাথমিক এবং রাঙামাটির বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র দ্বিতীয় গ্রাউন্ড স্টেশনের নির্মাণকাজও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
মহাকাশে উৎক্ষেপণের পর এটি পরিচালনা, সফল ব্যবহার ও বাণিজ্যিক কার্যত্রম সম্পাদনের জন্য ইতিমধ্যে সরকারি মালিকানাধীন বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড নামে একটি কোম্পানি গঠন করা হয়েছে। নতুন এই কোম্পানিতে কারিগরি লোকবল নিয়োগ এবং তাদের প্রশিক্ষণও দেয়া হয়েছে।
বর্তমানে দেশের স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল, ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, ভি-স্যাট সংস্থা বিদেশি স্যাটেলাইট ব্যবহার করছে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এ খাতে ব্যয় করছে বছরে ১৪ মিলিয়ন ডলার। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট যাত্রা শুরু করলে এই বিপুল অর্থ দেশেই থেকে যাবে।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের ৪০টি ট্রান্সপন্ডার রয়েছে। এর মধ্যে ২০ দেশে ব্যবহারের জন্য এবং ২০টি ভাড়া দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা আয় সম্ভব। এ ছাড়া নিজস্ব স্যাটেলাইট থাকায় বৈশ্বিক টেলিযোগাযোগের ক্ষেত্রে পরনির্ভরশীলতার অবসান হবে। টেলিমেডিসিন, ই-লার্নিং, ই-গবেষণা, ভিডিও কনফারেন্স, প্রতিরক্ষা ও দুর্যোগপূর্ণ অবস্থায় জরুরি যোগাযোগের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট।



