• রোববার , ২৬ জুলাই ২০২৬

যুবককে পুড়িয়ে হত্যা-নেপথ্যে কোরআন অবমাননা না অন্য কিছু!


প্রকাশিত: ১২:১৬ এএম, ৩০ অক্টোবর ২০ , শুক্রবার

নিউজটি পড়া হয়েছে ৪৬৮ বার

বিশেষ প্রতিনিধি /লালমনিরহাট প্রতিনিধি: লালমনিরহাটের পাটগ্রাম এলাকায় কোরআন শরীফ অবমাননার অভিযোগে এক জনকে পিটিয়ে হত্যা করেছে বিক্ষুব্ধ জনতা। আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়কের বুড়িমারী স্থলবন্দর (বাঁশকল) এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত ব্যক্তির নাম শহীদুল নবী জুয়েল (৪২)। তাঁর বাড়ি রংপুর শহরের শালবন মিস্ত্রিপাড়া এলাকায়। তিনি আবদুল ওয়াজেদ মিয়ার ছেলে। একসময় রংপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুলে কর্মরত ছিলেন বলে জানা গেছে।তবে কী কারণে এই যুবককে পিটিয়ে ও আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট করে কেউ কিছু বলতে পারছে না। যদিও স্থানীয়দের মধ্যে কেউ কেউ তার বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগ আনছে।

রাত সাড়ে ১০টায় জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ আবু জাফরসহ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তখন জেলা প্রশাসক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘কী কারণে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে তা এখনি বলা যাচ্ছে না। তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। তারপর এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট করে বলা যাবে। তবে ওই এলাকায় বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করায় এবং প্রশাসনের সক্রিয় চেষ্টায় বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত আছে বলে জানান জেলা প্রশাসক।

পাটগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুমন কুমার মোহন্ত জাতিরকন্ঠকে বলেন, একজনকে পুড়িয়ে মারার খবর নিশ্চিত হয়েছি। এ ঘটনায় অপর এক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। তবে উত্তেজিত জনতার কারণে আমরা এখনো ঘটনাস্থলে ঢুকতে পারিনি।
কী কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ওসি বলেন, স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আজ বিকেলে আসরের নামাজের পর ওই যুবক মোটরসাইকেলে এসে বুড়িমারী জামে মসজিদে ঢুকে পড়েন। তিনি সেখানে কোরআন শরীফের অবমাননা করেন। তবে কীভাবে ওই যুবক কোরআন অবমাননা করেন সে বিষয়ে কেউ মুখ খুলছে না।

পরে ওই ঘটনা মুহূর্তের মধ্যে বাইরে ছড়িয়ে পড়লে সেখানে আশপাশের লোকজন জড়ো হতে থাকে। উত্তেজিত জনতার হাত থেকে ওই ব্যক্তিকে বাঁচাতে এ সময় বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যে সেখানে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়। একপর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদে রাখা ওই যুবককে টেনে-হিঁচড়ে বাইরে এনে পেটানো শুরু করে উত্তেজিত জনতা। একপর্যায়ে বিজিবির চেকপোস্ট (বাঁশকল) এলাকায় ওই ব্যক্তির শরীরে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। এ সময় তার মোটরসাইকেলটিতেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

একটি প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, উপজেলার বুড়িমারী ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় বাজার মসজিদে অজ্ঞাত দুই ব্যক্তি প্রবেশ করে আসরের নামাজ আদায় করে। নামাজ শেষে উপস্থিত মুসল্লী ও ইমামকে গোয়েন্দা সংস্থার পরিচয় দিয়ে মসজিদের ভেতরে থাকা অস্ত্র বের করতে বলেন। একপর্যায়ে তারা নিজেরাই মসজিদে অস্ত্র খুঁজতে থাকেন। এ সময় র‍্যাকে রক্ষিত কোরআন শরীফ নিচে পড়লে তারা কোরআন শরীফের উপর পা রেখেই অস্ত্র খুঁজতে থাকেন। এ দৃশ্য দেখে মসজিদে থাকা মুসল্লী উত্তেজিত হয়। পরে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ও কয়েক জন মুসল্লী উত্তেজিত মুসল্লীদের হাত থেকে ব্যক্তিদ্বয়কে উদ্ধার করে বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের ভেতরে নিয়ে যান।এদিকে কোরআন শরীফে পা রাখার খবর ছড়িয়ে পড়লে উত্তেজিত মুসল্লীরা বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদ ঘেরাও করেন।

খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান পাটগ্রাম উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রুহুল আমিন বাবুল, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কামরুন নাহার, পাটগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুমন কুমার মোহন্ত। তাঁরা উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। একপর্যায়ে তাঁরাও সেখানে আটকে পড়েন। এ ঘটনায় রংপুর নগরীর মুন্সীপাড়া এলাকার সুলতান জোবায়ের আব্বাস (৫১) নামের আহত এক ব্যক্তিকে পাটগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। অপর আহত যুবক শরীফকে (২২) পাঠানো হয়েছে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।

চিকিৎসাধীন সুলতান জোবায়ের আব্বাস নিজেকে দলিল লেখক দাবি করে হাসপাতালে আজ রাতে গণমাধ্যমকে জানান, তিনি তাঁর এক মক্কেলের সঙ্গে দেখা করতে এসে বুড়িমারীতে উত্তেজিত জনতার মারধরের শিকার হন। তাঁর সঙ্গে নিহত ব্যক্তির কোনো পরিচয় নেই।পাটগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের একজন চিকিৎসক আজ রাতে জানান, আহত দুই ব্যক্তিকে হাসপাতালে আনা হয়। তাদের মধ্যে গুরুতর আহত শরীফকে রংপুরে পাঠানো হয়।এ ঘটনার ফলে বাঁশকল এলাকায় মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল। সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তবে উত্তেজিত পুলিশ তাদের সরাতে পারেনি।