বি বি’র ইতিহাস বিকৃতির প্রমাণ মিলেছে
স্টাফ রিপোর্টার : ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের (বি বি) ইতিহাস’ বইতে ইতিহাস বিকৃতির প্রমাণ পেয়েছে হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত এ সংক্রান্ত তদন্ত কমিটি। বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি মোহাম্মদ আলীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে আজ সোমবার এ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের নামকরণ করেছিলেন। ১৯৭২ সালের ১২৭ নম্বর রাষ্ট্রপতির আদেশ দ্বারা এই ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠিত হয়। অথচ গ্রন্থটিতে বঙ্গবন্ধুর ছবি স্থান পায়নি।
স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি হিসেবে জাতির পিতার ছবি ওই বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা অত্যাবশ্যক ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট বঙ্গবন্ধুর ছবি খুঁজে না পাওয়ায় তা ছাপানো হয়নি মর্মে বইটির প্রণয়ন ও প্রকাশনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কমিটির সদস্যরা যে বক্তব্য দিয়েছেন তা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটা অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত। গ্রন্থটিতে বঙ্গবন্ধুর ছবি অন্তর্ভুক্ত না করায় ইতিহাস বিকৃতি হয়েছে বলে কমিটি মনে করে।
রিটকারী আইনজীবী ব্যারিস্টার এ বি এম আলতাফ হোসেন শুনানিতে বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদনে যেসব বিষয় উঠে এসেছে, সেটা আতঙ্কিত হওয়ার মতো।’আদালত বলেন, ‘প্রতিবেদনটি আমরাও পড়েছি। মঙ্গলবার এ বিষয়ে আদেশ দেওয়া হবে।’‘বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাস’ বইয়ে বঙ্গবন্ধুর ছবি না ছাপানো এবং ইতহাস বিকৃতির অভিযোগ তদন্তের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন ড. কাজী এরতেজা হাসান। ওই রিটে আদালতের দেওয়া নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বাজেট ও সামষ্টিক অর্থনীতি) ড. মো. জাফর উদ্দীনকে আহবায়ক করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটি বইটি প্রকাশনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টা কমিটি, সম্পাদনা কমিটি এবং গবেষণা ও পান্ডুলিপি প্রণয়ণ কমিটির সদস্যদের স্বাক্ষাৎকার গ্রহণ ও প্রশ্নমালার মাধ্যমে তাদের বক্তব্য নিয়ে ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করে। আজ রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আলামিন সরকার হাইকোর্টে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন।
ওই তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্পাদনা কমিটি বলেছে, গ্রন্থটিতে তদানীন্তন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান এবং পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খানের ছবি না ছাপনোই শ্রেয় ছিল। এ দুজনের ছবি ছাপানোও ছিল সবার ভুল। তবে বইটিতে আইয়ুব খানের দমন পীড়নের কথা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন এই কমিটি। এই বক্তব্য তুলে তদন্ত কমিটি প্রতিবেদনে বলছে, একদিকে দমন পীড়নের কথা উল্লেখ করে অপরদিকে বইটির অ্যালবামে একাধিক ছবি সন্নিবেশ করা পরস্পর বিরোধী।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্পাদনা কমিটি বলেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাতির পিতার ছবি খুঁজেছেন। কিন্তু এ সংক্রান্ত দল বঙ্গবন্ধুর ছবি সংগ্রহ করতে পারেনি। এ কারণে ছবি ছাপানো যায়নি। কিন্তু গ্রন্থটি পরীক্ষা করে দেখা যায়, বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও বাংলাদেশ ব্যাংক’ এর ইতিহাস বর্ণনা করা হয়েছে। বিধায় স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট অথবা বঙ্গবন্ধুর অন্য যেকোন ছবি বইয়ে অন্তর্ভূক্ত করা যেত।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রন্থটিতে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের কথা উল্লেখ থাকলেও ভাষণের স্থান রেসকোর্স ময়দান বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কথা উল্লেখ নেই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার কথা বইয়ে উল্লেখ থাকলেও স্বাধীনতা ঘোষণার তারিখ (১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ) বইয়ে উল্লেখ নেই। এ ছাড়া ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষণার বিষয়ে বইয়ে উল্লেখ নেই। বইটিতে স্বাধীনতার ইতিহাস বর্ণিত হলেও তা যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ হয়নি। বিক্ষিপ্তভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয়নি। এ ছাড়া বইটির দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৫১ পৃষ্ঠায় স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘উপরন্তু ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাক হানাদার বাহিনী নিরীহ বাঙালিদের ওপর অতর্কিত হামলা শুরু করে। এরই পরিণতি হিসেবে শুরু হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ পর্যায়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।’ এরূপ বক্তব্য ইতিহাস বিকৃতির নামান্তর।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাস বইটি প্রণয়নের সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, তথ্য-উপাত্ত ও সংযোজিত ছবি ইত্যাদি পর্যালোচনায় দেখা যায় যে সম্পাদনা কমিটির কাজের মধ্যে অসঙ্গতি ছিল। এ কমিটির কাজে ধারাবাহিকতা ছিল না। নিয়মিত সভাও হতো না। তা ছাড়া গবেষণা কমিটি ও সম্পাদনা কমিটির মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ছিল। এ ছাড়া বইয়ে উপদেষ্টা কমিটি হিসেবে ছয়জন সদস্যের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। নথিপত্র পরীক্ষা করে উপদেষ্টা কমিটি নামে কোনো কমিটি গঠনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বইটি প্রকাশের পূর্ব পর্যন্ত তাদের কোনো পরামর্শ গ্রহণ করা হয়নি। ফলে বইয়ে এদের নাম অন্তর্ভূক্ত যথাযথ হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপার্টমেন্ট অব কমিউনিকেশন্স অ্যান্ড পাবলিকেশন্স (ডিসিপি)-এর মহাব্যবস্থাপক জী এম আবুল কালাম আজাদ এর বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র পরীক্ষান্তে দেখা যায় যে, মুদ্রণের জন্য ডিসিপিতে যে পান্ডুলিপিটি প্রেরণ করা হয়েছে সেই পান্ডুলিপি (ছবিসহ) বই আকারে তিনি প্রকাশ করেছেন। কাজেই রিটে বর্ণিত বিষয়ে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।প্রসঙ্গত, গত বছরের ২৫ মার্চ এই বইয়ের মোড়ক উম্মোচন করা হয়। পরবর্তীকালে ইতিহাস বিকৃতির বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ায় বইটির বিতরণ বন্ধ রাখা হয়।



