বাংলাদেশী বিজ্ঞানীর ভাসমান ট্রেনে তোলপাড়
যুক্তরাষ্ট্র থেকে দিপু হাসান : বাংলাদেশী বিজ্ঞানীর আবিস্কার ভাসমান ট্রেন এ তোলপাড় চলছে সারা বিশ্ব। বিশ্বের সেরা বিজ্ঞানীদের পেছনে ফেলে বাজিমাত করে দিয়েছেন তিনি। তাঁর উন্নতমানের ভাসমান ট্রেনটির ডিজাইনও পৃথিবীজুড়ে সাড়া ফেলে দিয়েছে। জানা গেছে, ভাসমান ট্রেন আবিষ্কার করেছেন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. আতাউল করিম। তাঁর আবিস্কৃত ট্রেনটি চলার সময় ভূমিতে স্পর্শ করবে না। এটি চলবে ম্যাগনেটিকে।
সরেজমিনে জানা গেছে, ড. আতাউল করিম ২০০৪ সালে ভাসমান ট্রেনের প্রকল্প হাতে নেন। দেড় বছরের মাথায় ট্রেনটির প্রোটোটাইপ তৈরি করেন। ট্রেনটি চুম্বক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সাবলীলভাবে চলবে, গতি অনেক বেশি হবে। জার্মানি, চীন ও জাপানে ১৫০ মাইলের বেশি গতির ট্রেনে প্রতিমাইল ট্র্যাক বসানোর জন্য গড়ে খরচ পড়ে ১১ কোটি ডলার। কিন্তু আতাউল করিমের ভাসমান ট্রেনে খরচ হবে মাত্র ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ৩০ লাখ ডলার।
আতাউল করিমের আবিষ্কৃত ট্রেনটি বিশ্বের নামকরা বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। এখনো বাণিজ্যিকভাবে নির্মিত হয়নি। তবে বিভিন্ন দেশ ট্রেনটি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের চিন্তা ভাবনা করছে। ড. আতাউল করিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালাবামা ইউনিভার্সিটি থেকে পদার্থ বিজ্ঞানে এমএস, ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এমএস এবং ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
আতাউল করিম ১৯৮১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আরকানসাস রাজ্যের রাজধানী লিটিল রকের ইউনিভার্সিটি অব আরকানসাসে শিক্ষকতা শুরু করেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া রাজ্যের ওল্ড ডমিনিয়ন ইউনিভার্সিটি (ওডিইউ) ইন নরফোকের গবেষণা বিভাগের ভাইস-প্রেসিডেন্ট। বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে প্রতি বছর যে ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করে, তার তত্ত্বাবধান করেন তিনি।
আতাউল করিম ১৯৭৭ সালে বিয়ে করেন। স্ত্রী সেতারা করিম পেশায় একজন বায়োকেমিস্ট। তারা ভার্জিনিয়া রাজ্যের ভার্জিনিয়া বিচে থাকেন। তারা এক ছেলে ও দুই মেয়ের জনক-জননী। ছেলের নাম লুৎফি এবং মেয়ের নাম লামিয়া ও আলিয়া। ১৯৭৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমালেও আত্মীয়-স্বজনের সাথে দেখা করতে প্রায়ই বাংলাদেশে আসেন ড. আতাউল।
আমাদের মৌলভীবাজার প্রতিনিধি জানান, মৌলভীবাজারের বড়লেখার বাসিন্দা ভাসমান ট্রেন আবিস্কারক বিশ্ববরেণ্য পদার্থ বিজ্ঞানী ড. আতাউল করিম। বড়লেখা পৌরশহরের বারইগ্রামে তার বাড়ি।চলতি বছরের ১৩ মার্চ তিনি বেড়াতে এসেছিলেন নিজ জন্মস্থানে। ড. আতাউল করিমের চাচাতো ভাই বড়লেখা আর.কে লাইসিয়াম স্কুলের শিক্ষক তাজুল ইসলাম জানান, আড়াই বছর পর তিনি দেশে ফিরেছেন। বৃহস্পতিবার বাড়িতে আসার কথা ছিল। কিন্তু নাড়ির টানে বুধবারই চলে আসেন। বাড়িতে আসার পর আর.কে লাইসিয়াম স্কুলের শিক্ষকদের অনুরোধে স্কুল পরিদর্শন এবং শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।পরে আবারও ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করেন। সময় সল্পতার কারণে সবার সঙ্গে সাক্ষাত করতে পারেননি।
জানা গেছে, ড. আতাউল করিম ১৯৫৩ সালের ৪ মে বড়লেখার মিশন হাউসে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ডা. মোহাম্মদ আবদুস শুকুর পেশায় চিকিৎসক ছিলেন। বড়লেখা সদরের ষাটমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয়। এরপর বড়লেখার ঐতিহ্যবাহী পিসি হাইস্কুলে পড়ালেখা করেন। পরবর্তী সময়ে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ থেকে ১৯৬৯ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ্রগ্রহণ করে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে প্রথম শ্রেণীতে ৪র্থ স্থান অধিকার করেন।
১৯৭২ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় সিলেট এম.সি কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৬ সালে পদার্থ বিজ্ঞানে বিএসসি (অনার্স) ডিগ্রি লাভের পর উচ্চ শিক্ষা লাভের উদ্দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গমন করেন। পদার্থ বিজ্ঞানে মাস্টার অব সায়েন্স, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার্স অব সায়েন্স এবং পিএইচডি করেন ইউনিভার্সিটি অব আলাবামা থেকে যথাক্রমে ১৯৭৮, ১৯৭৯ এবং ১৯৮১ সালে।
পড়ালেখা শেষ করে ১৯৮২ সালে তিনি আরকানস বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারি অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮৩ সালে উইচিটা স্টেট ইউনিভার্সিটির তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগে সহকারি অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সেখানে কর্মরত ছিলেন। ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি ইউনিভার্সিটি অফ ডেইটনে সহকারি অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮৮ সালে তিনি সহযোগী অধ্যাপক এবং ১৯৯৩ সালে অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ডেইটন বিশ্ববিদ্যালয়েই তিনি ইলেক্ট্রো-অপটিক্স প্রোগ্রামের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি সেখানে তড়িৎ ও কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন।
১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে ওহিও’র রাইট প্যাটার্সন বিমান ঘাঁটিতে এভিওনিক্স পরিচালক হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে পর্যন্ত সেখানে কর্মরত ছিলেন। ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি টেনেসী বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন এবং ২০০০ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। ২০০০ সালে তিনি সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইয়র্কে তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশলের ডীন হিসেবেও কর্মরত ছিলেন। ২০০৪ সালে তিনি নরফোকে অবস্থিত ওল্ড ডোমিনিয়ন ইউনিভার্সিটির তড়িৎ ও কম্পিউটার প্রকৌশল বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ড. আতাউল করিম ১৯৮৭ সাল থেকে বিভিন্ন রকম গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু ম্যাগলেভ ট্রেনের প্যাটার্ন আবিষ্কার তাকে সারা বিশ্বে প্রসিদ্ধ করে তোলে।
ড. আতাউল করিম ভার্জিনিয়ার নরফোকের ওল্ড ডোমিনিয়ন ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা কালে ম্যাগলেভ ট্রেন নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। ওল্ড ডোমিনিয়ন ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা ৭ বছর ধরে এ ধরনের একটি ট্রেন তৈরির চেষ্টা করছিলেন, তবে সাফল্যের দেখা পাননি। ড. আতাউল করিম ২০০৪ সালে এই গবেষণা প্রকল্পের সফলতা অর্জন করেন। এরপর মাত্র দেড় বছরে ট্রেনটির প্রযুক্তি নির্মাণে সক্ষম হন এবং গবেষণায় পরীক্ষা মূলকভাবে সফল হন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস ডার্টমাউথের প্রোভোস্ট এবং এক্সিকিউটিভ ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে কর্মরত।



