• রোববার , ২৬ জুলাই ২০২৬

বরগুনার ০০৭ বাহিনীর জঘণ্য আমলনামা-


প্রকাশিত: ৪:০৭ পিএম, ২৯ জুন ১৯ , শনিবার

নিউজটি পড়া হয়েছে ১৮৭ বার

বিশেষ প্রতিনিধি : বরগুনায় বন্ড ক্রিমিনালদের আমলনামা অনেক দিন ধরেই ভারী হয়ে থাকলেও আইন শৃঙ্খলা বাহিনী যথাযথ পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে নয়ন চক্র বরগুনার কলেজ রোড, ডিকেপি, দীঘির পাড়, কেজিস্কুল ও ধানসিঁড়ি সড়ক এলাকায় বিভিন্ন ধরনের অপরাধ করে নিজেদের হাত পাকিয়ে ফেলেছিল। এর জের ধরে নয়ন গংরা অপরাধ কার্যে নিজস্ব সংকেত ছিল ০০৭ ব্যবহার করে অবস্থান পাকাপোক্ত করতে থাকে। এই সংকেত প্রত্যক্ষ করা যায় নয়ন বন্ডের মোটরসাইকেল ও বাড়ির দেয়ালেও।

সরেজমিনে জানা যায়, হত্যাকারী দুজনের একজন রিফাত ফরাজী, আরেকজন নয়ন বন্ড। দুজনই অনেক আগে থেকেই অপরাধ জগতের পরিচিত মুখ। সংঘটিত করেছেন আরো অনেক অপকর্ম। তাদের কারণে অতিষ্ঠ এলাকার মানুষ। অনুসন্ধানে ওঠে এসেছে তাদের অপকর্মেও নানা খতিয়ান। ছিনতাই, মাদক, হামলাসহ নানা অপরাধের হোতা এই দুই খুনি।

স্থানীয় ও ভুক্তভোগী এলাকাবাসীরা জানান, মাদক ব্যবসা, মাদক সেবন ও ছিনতাইসহ নানা অপকর্মে যুক্ত ছিলেন রিফাত ফরাজী। এ কারণে স্থানীয়দের কাছে একটি আতঙ্কের নাম রিফাত ফরাজী। রিফাতের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন, এমন মানুষের সংখ্যা অনেক । প্রতিবেশী ও স্থানীয়দের ওপর হামলা, মারধর রিফাতের কাছে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এসব কারণে কয়েকবার গ্রেফতার হলেও অজ্ঞাত কারণে খুব স্বল্প সময়েই মুক্তি পেয়ে যান।

স্থাণীয়রা জানান, নয়নের নেতৃত্বে এই গ্রুপটি পলিটকেনিক কলেজের শিক্ষার্থীদের মেসগুলোতে নিয়মিত হানা দিত। তারা মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে টাকা আদায়ত করত। এছাড়া ছিনতাইয়ের অভিযোগ আছে তাদের বিরুদ্ধে । ধানসিঁড়ি এলাকায় ঘুরতে যাওয়া মানুষদের কাছ থেকেও টাকা আদায়, সঙ্গে মেয়ে থাকলে জিম্মি করা ও মারধরের অভিযোগও রয়েছে। বরগুনা পলিটকেনিকের কয়েকজন ছাত্র জানান, ০০৭ বন্ড বাহিনীর দাপটে তারা এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।

স্থানীয় ও ভুক্তভোগী এলাকাবাসীরা জানান, মাদক ব্যবসা, মাদক সেবন ও ছিনতাইসহ নানা অপকর্মে যুক্ত ছিলেন রিফাত ফরাজী। এ কারণে স্থানীয়দের কাছে একটি আতঙ্কের নাম রিফাত ফরাজী। রিফাতের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন, এমন মানুষের সংখ্যা কম নয়। প্রতিবেশী ও স্থানীয়দের ওপর হামলা, মারধর রিফাতের কাছে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। এসব কারণে কয়েকবার গ্রেফতার হলেও অজ্ঞাত এক কারণে খুব স্বল্প সময়েই মুক্তি পান তিনি। ২০১৭ সালের ১৫ জুলাই সন্ধ্যায় তরিকুল ইসলাম (২১) নামে এক প্রতিবেশীকে কুপিয়ে মারাত্মক যখম করেন রিফাত ফরাজী।

স্থানীয় আপেল মিয়া জানান, একদিন সামান্য কথা কাটাকাটি হয় রিফাত ফরাজীর সঙ্গে তার। তখন রিফাত ফরাজী তাকে কুপিয়ে যখম করার হুমকি দেন। রিফাত ফরাজীর ভয়ে তিনি দেড় মাস রিফাত ফরাজীর বাসার সামনে দিয়ে না গিয়ে আধা কিলোমিটার পথ ঘুরে তার বাসায় যাওয়া আসা করতেন। হুমকি দেয়ার দেড় মাস অতিবাহিত হওয়ার পর একদিন সন্ধ্যায় রিফাত ফরাজীর বাসার সামনে দিয়ে তরিকুল তার বাসায় যাওয়ার পথে রিফাত ফরাজী দেশীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তার মাথায় গুরুতর যখম করেন।

এ ঘটনায় তরিকুলের বাবা বাদী হয়ে একটি মামলা করেন।একই বছর রিফাত বরগুনার ডিকেপি রোডের বাসার ছাত্র মেসে গিয়ে ধারালো অস্ত্রের মুখে বাসায় থাকা সব ছাত্রদের জিম্মি করে, তাদের ১৪টি মোবাইল ছিনতাই করে পালিয়ে যান। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ করা হলে পুলিশ রিফাতের বাবা দুলাল ফরাজীকে আটক করে মোবাইলগুলো উদ্ধার করেন।

ডিকেপি রোডের এক বাসিন্দা বলেন, ‘ডিকেপি রোডের আমাদের ভাড়া দেয়া বরগুনা পলিট্যাকনিক ইনিস্টিটিউটের মেসে গিয়ে ধারালো অস্ত্রের মুখে ১৪টি মোবাইল ছিনতাই করেন রিফাত ফরাজী। এ ঘটনা জানার পর আমি বরগুনা সদর থানায় গিয়ে অভিযোগ করায় রিফাত ফরাজীর বাবা দুলাল ফরাজীকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে পুলিশ। পরে তিনি রিফাতের কাছ থেকে ছিনতাই করা ১৪টি মোবাইলের মধ্যে ১১টি উদ্ধার করেন। আর বাকি তিনটি মোবাইল উদ্ধার করতে না পেরে নতুন মোবাইল কিনে দিয়ে থানা থেকে মুক্তি পান।’

বরগুনার বেতাগী উপজেলার কাজিরাবাদ ইউনিয়নের বাসিন্দা মারজানা মনি বলেন, ‘২০১৭ সালের রমজানে আমার একমাত্র ছোট ভাই হাফেজ মো. মেহেদী হাসান বরগুনার হোমিও চিকিৎসক আলাউদ্দিন ডাক্তারের বাসা সংলগ্ন মসজিদে তারাবির নামাজ পড়ায়। তখন রিফাত ফরাজী একদিন মেহেদীর কাছ থেকে স্যামস্যাং গ্যালাক্সি কোর প্রাইম মডেলের বিদেশ থেকে আনা একটি ফোন ছিনিয়ে নেন।

বিষয়টি রিফাত ফরাজীর মা-বাবাসহ স্থানীয় অনেককে জানানোর পরও আমার ভাইয়ের মোবাইলটি কেউ উদ্ধার করে দিতে পারেনি। পরে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করার পর সাড়ে সাত হাজার টাকার বিনিময়ে মোবাইলটি ফিরিয়ে দিয়ে হুমকি দেন রিফাত ফরাজী। পরে রিফাত ফরাজীর হুমকিতে ওই এলাকা ছেড়ে একপ্রকার পালিয়ে আসে আমার ভাই।

বরগুনা সরকারি কলেজের দক্ষিণ-পশ্চিমে বরগুনা পৌরসভার ৭নং ওয়ার্ডে নয়ন বন্ডের (২৫) বাসা। নয়নের বাবা মৃত ছিদ্দিকুর রহমান। দুই ভাইয়ের মধ্যে নয়ন ছোট। নয়নের বড় ভাই মিরাজ দীর্ঘদিন ধরে সিঙ্গাপুর প্রবাসী হওয়ার কারণে মাকে নিয়েই ওই বাসায় বসবাস করছেন নয়ন।২০১৭ সালের ৫ মার্চ রাত ১১টার দিকে নয়ন বন্ডের বাসায় অভিযান চালায় বরগুনা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ সময় বিপুল পরিমাণ মাদক, দুটি দেশীয় অস্ত্র ও এক সহযোগীসহ নয়ন বন্ডকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এসব মাদকের মধ্যে ছিল ৩০০ পিস ইয়াবা, ১২ বোতল ফেনসিডিল ও ১০০ গ্রাম হেরোইন।

এ ঘটনায় গণমাধ্যমে নয়ন বন্ড ও তার সহযোগী ইমামের গ্রেফতারের সংবাদ প্রকাশিত হয়। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে বরগুনা সদর থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ও অস্ত্র আইনে দুটি মামলা করে নয়ন বন্ড ও তার সহযোগী ইমামের বিরুদ্ধে। পরে তাদের জেলহাজতে পাঠায় পুলিশ। দীর্ঘদিন জেলে থাকার পর সম্প্রতি জামিনে বেরিয়ে আসেন নয়ন বন্ড। জেল থেকেই বেরিয়ে মূলত এ হত্যাকান্ড ঘটান তিনি।

দেশব্যাপী আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলার প্রধান অভিযুক্ত সাব্বির হোসেন নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড এবং রিফাত ফরাজি আরও ১২টি মামলার আসামি বলে জানা গেছে। ২০১৭ সাল পর্যন্ত হওয়া এসব মামলায় তাদের অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিটও দাখিল করেছে পুলিশ।বরগুনার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে রিফাত শরীফ হত্যাকান্ডে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলার সময় এ তথ্য জানান পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন। পুলিশ সুপার বলেন, রিফাত ফরাজির নামে চারটি ও নয়ন বন্ডের নামে আটটি মামলা রয়েছে। এসব মামলার তদন্ত শেষে পুলিশ অভিযুক্ত করে তাদের বিরুদ্ধ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে।

তিনি আরও বলেন, নয়ন বন্ডের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার মধ্যে দুটি মাদক মামলা, একটি অস্ত্র আইনের মামলা এবং পাঁচটি মারামারির মামলা রয়েছে। এসব মামলার প্রতিটিতেই পুলিশ নয়ন বন্ডকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। তবে এ ঘটনার পর তিন ’দিন অতিবাহিত হলেও রিফাত শরীফ হত্যাকান্ডের এই দুই মূলহোতাকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন বলেন, রিফাত হত্যাকান্ডে জড়িত আসামিদের দুই ’জনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ। আর সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা অজ্ঞাত এক আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে । বাকি আসামিরা পুলিশের নজরদারিতে আছে।