বদনামসহ ভোট-ভাগ্য গননা চলছে
খুলনা থেকে মাসুম রেজা/ আবির হাসান : কিছু বদনামসহ ভোট শেষ খুলনায়;এখন চলছে ভাগ্য গননা। এর আগে উৎসবমুখর পরিবেশে খুলনা মহানগরীতে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে। সরেজমিনে আমাদের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা, সামান্য জাল ভোট ছাড়া ভোটগ্রহণ চলে শান্তিপূর্ণভাবে। কয়েকটি কেন্দ্রে জাল ভোট হয়েছে। এ কারণে স্থগিতও হয়েছে কয়েকটি ভোট কেন্দ্র।সব ভোট কেন্দ্রে একযোগে ভোট গ্রহণ শুরু হয় এবং তা বিরতিহীনভাবে চলে বিকাল ৪টা পর্যন্ত। কিছুক্ষণ পরই শুরু হবে ভাগ্য গননার পালা।
ইতোমধ্যে, আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক, বিএনপির মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু ও জাতীয় পার্টির মেয়রপ্রার্থী শফিকুর রহমান মুশফিক ভোট প্রদান করেছেন।এর মধ্যে সকাল ৮টার দিকে শহরের পাইওনিয়ার গার্লস স্কুল কেন্দ্রে ভোট দেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক। এরপর সকাল পৌনে ৯টার দিকে রহিমা খাতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে ভোট দেন বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মোট ভোটার রয়েছেন ৪ লাখ ৯৩ হাজার ৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৪৮ হাজার ৯৮৬ ও নারী ২ লাখ ৪৪ হাজার ১০৭ জন। ভোটকক্ষ ১ হাজার ১৭৮টি। ভোট কেন্দ্র ও ভোট কক্ষে দায়িত্ব পালন করবেন ৪ হাজার ৯৭২ জন কর্মকর্তা।এর মধ্যে প্রিসাইডিং অফিসার রয়েছেন ২৮৯ জন, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ১ হাজার ৫৬১ জন এবং পোলিং এজেন্ট রয়েছেন ৩ হাজার ১২২ জন।
এ নির্বাচনে ২৮৯টি কেন্দ্রের মধ্যে স্থায়ী ভোট কক্ষ রয়েছে ১ হাজার ৫৬১টি। আর অস্থায়ী ভোট কক্ষ রয়েছে ৫৫টি। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) তথ্যমতে, ২৮৯টি কেন্দ্রের মধ্যে ২৩৪টি কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ (ঝুঁকিপূর্ণ)।এই সিটির দুই কেন্দ্রে ইভিএমে ভোট হবে। ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের ২০৬ নম্বর কেন্দ্র ও ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের ২৩৯ নম্বর কেন্দ্রে ১০টি ইভিএম থাকবে।
এজেন্টদের বের করে দেয়ার অভিযোগ-
খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নগরীর ৪০টি কেন্দ্র থেকে পুলিশের সহযোগিতায় বিএনপির এজেন্টকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। মঙ্গলবার (১৫ মে) সকালে রাজধানীর নয়াপল্টনের দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করেন তিনি।
রিজভী বলেন, খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ২৮৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৪০টি কেন্দ্র থেকে বিএনপি প্রার্থীর এজেন্টদের বের করে দিয়েছে সরকারদলীয় প্রার্থীর সমর্থকরা। এসব কেন্দ্রে ভোটারদের ভোট দিতে দেওয়া হচ্ছে না। সরকারদলীয় প্রার্থীর সমর্থকরা জাল ভোট দিচ্ছে।
তিনি বলেন, ক্ষমতাসীনদের কল্যাণেই খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে চিরাচরিত উৎসবের আমেজ নেই, ভোটারদের মনে শুধুই হাহাকার।রিজভী বলেন, শেখ হাসিনার আমলে নির্বাচন মানে বিরাট ধাপ্পা। নির্বাচনে জয়লাভ করায়ত্ত্ব করতে তারা মরিয়া। তাই অশান্তি আর নিগ্রহে ভরপুর খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ধানের শীষের নারী এজেন্টদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি দিয়ে বলা হচ্ছে তারা যেন ভোট কেন্দ্রে না যায়, ভোট কেন্দ্রে গণ্ডগোল হবে। পুরুষ এজেন্টদের ওপর হামলা করে আহত করা হয়েছে। ধানের শীষের এজেন্ট, সাধারণ ভোটারদের হুমকি, ভীতি প্রদর্শনের সিংহভাগ দায়িত্ব পালন করছে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী।
তিনি আরও বলেন, ধানের শীষের মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু জানিয়েছেন সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা পুলিশের সহায়তায় ৪০টি ভোটকেন্দ্র থেকে বিএনপির এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে। খালিসপুর ১৫নং ওয়ার্ডে বিএনপি এজেন্ট লিলি এবং লিমা আক্তারকে মধ্য পালপাড়া নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় এলাকায় মারধর করে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা। তাদের এজেন্ট কার্ড ছিঁড়ে ফেলা হয়, মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং ভোটকেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়।
তিনি বলেন, ৩১নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক কবিরের নেতৃত্বে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা ভোটারদেরকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে নৌকা মার্কায় ভোট দেয়ার জন্য চাপ দেয়া হচ্ছে। ২০নং ওয়ার্ডে এইচআরএইচ প্রিন্স আগাখান উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে পুলিশের সহযোগিতায় আওয়ামী সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা সাধারণ ভোটারদেরকে বের করে দিয়ে নৌকা মার্কায় সিল মারছে।এ সময় অন্যদের মধ্যে বিএনপির সহ-দফতর সম্পাদক মো. মুনির হোসেন, তাইফুল ইসলাম টিপু প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী কাদের-
খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে আশা প্রকাশ করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।মঙ্গলবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জে খুলনা সিটির ভোট নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, খুলনায় সুষ্ঠু ভোট হচ্ছে বলেই খবর পাচ্ছি। এখানে জয়ের ব্যাপারে আমরা আশাবাদী।
তিনি বলেন, নির্বাচনে ফলাফল যা-ই হোক না কেন, আওয়ামী লীগ তা মেনে নেবে। আমি বিএনপিকেও একই আহ্বান জানাব।খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হচ্ছে বলেও দাবি করেন সেতুমন্ত্রী।বিএনপি খুলনা থেকে এবং ঢাকায় বসে নানা রকম গুজব ছড়াচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, বিএনপি নেতারা ঢাকায় বসে নানা অপ্রাসঙ্গিক ও গুজব ছাড়াচ্ছেন। এটা ঠিক নয়।
এদিন মন্ত্রী কাঁচপুরে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যানজট পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।
মহাসড়কগুলোতে ব্যাপক যানজট অব্যাহত থাকায় সেতুমন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ঈদের আগে যানজট নিরসন করা হবে।সাংবাদিকদের অপর এক প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, বয়সের কারণে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া অসুস্থ। সরকার তার জন্য উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে।
বিচ্ছিন্ন ঘটনার দায় স্বীকার ইউনুস আলীর-
দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া সার্বিকভাবে নির্বাচন সুষ্ঠু হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ইউনুছ আলী।মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। চলবে বিকাল ৪টা পর্যন্ত। তবে ধানের শীষের প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু অভিযোগ করেছেন, ভোট শুরুর আগে অনেক কেন্দ্রে তার এজেন্টদের ঢুকতে দেয়া হয়নি। এ ছাড়া ভোট শুরুর পর ২৫-৩০টি কেন্দ্র থেকে তার পোলিং এজেন্টদের বের করে দেয়া হয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা ইউনুছ আলী বলেন, দু-একটি ভোটকেন্দ্রে গোলযোগের খবর পেয়েছি। তবে সার্বিকভাবে নির্বাচন সুষ্ঠু হচ্ছে।সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির বলেন, আমরা লিখিতভাবে কোনো অভিযোগ পাইনি, তবে শুনেছি। শোনার পর খোঁজ নিয়ে দেখলাম, দু-একটি কেন্দ্রে বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে। আমরা সেখানে দায়িত্বরত কর্মকর্তাকে জানিয়েছি এবং ব্যবস্থা নিতে বলেছি।
৫ মেয়র প্রার্থী-
খুলনা সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে যে পাঁচজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তারা হলেন- আওয়ামী লীগের তালুকদার আবদুল খালেক (নৌকা), বিএনপির নজরুল ইসলাম মঞ্জু (ধানের শীষ), জাতীয় পার্টির এসএম শফিকুর রহমান (লাঙল), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের অধ্যক্ষ মাওলানা মুজ্জাম্মিল হক (হাতপাখা) এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবির মিজানুর রহমান বাবু (কাস্তে)।৪৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ নগরীতে মোট ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ২৮৯টি ও ভোটকক্ষ এক হাজার ৫৬১ জন। নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৯৩ হাজার ৯৩ জন, যার মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৪৮ হাজার ৯৮৬ জন ও নারী ভোটার ২ লাখ ৪৪ হাজার ১০৭ জন।
জোরজবস্তি ব্যালটে সিল–
খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জোরপূর্বক ব্যালটে সিল মারার কারণে দুটি ভোটকেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। এগুলো হলো ইকবালনগর সরকারি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্র (পুরুষ) ও ৩১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয় কেন্দ্র।
আজ দুপুর ১২টার দিকে ইকবালনগর সরকারি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রের (পুরুষ) ভোট স্থগিত করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। আর বেলা দুইটার দিকে অপর কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করা হয়।
ইকবালনগর সরকারি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট শুরুর পর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ওই কেন্দ্রে ২০ থেকে ২৫ জন যুবক জোর করে ঢুকে পড়েন। তাঁরা কেন্দ্রের ৭ নম্বর বুথে ঢুকে ব্যালট পেপার নিয়ে সিল মেরে ভোট বাক্স ভরতে থাকে। এই ঘটনার পর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা খলিলুর রহমান কেন্দ্রে ভোট স্থগিতের ঘোষণা দেন।
কাকলী জাকিয়ার অভিযোগ-
কেন্দ্রের ৭ নম্বর বুধের ধানের শীষের পোলিং এজেন্ট কাকলী খান ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর প্রার্থী জাকিয়া সুলতানার এজেন্ট সাজেদা খাতুন জাতিরকন্ঠ প্রতিনিধিকে বলেন, ওই যুবকদের সবার শার্টে নৌকা প্রতীকের ব্যাজ লাগানো ছিল। তাঁরা এসেই অন্য প্রার্থীদের এজেন্টদের বের হয়ে যেতে বলেন। এরপর ব্যালট পেপার নিয়ে নৌকা প্রতীকে এবং আওয়ামী লীগ–সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীর ঠেলাগাড়ি ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদের গ্লাস প্রতীকে ভোট দিয়ে তা বাক্সে ভরেন।
প্রিসাইডিং কর্মকর্তা খলিল বলেন, তিনি পুলিশের সহযোগিতা চেয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করেছে কি না, সেটা তাঁর জানা নেই।এদিকে প্রিসাইডিং কর্মকর্তার পাশেই ছিলেন ওই কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা এক পুলিশ কর্মকর্তা। তাঁর পোশাকে নামের কোনো ব্যাজ ছিল না। ব্যাজ কোথাও পড়ে গেছে জানিয়ে নিজের নাম নয়ন মিয়া বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, কেন্দ্র যে দখল হয়েছে, এমন তথ্য তাঁদের কাছে ছিল না।
দুপুর ১২টায়-
এরপর দুপুর ১২টার দিকে কেন্দ্রে আসেন রিটার্নিং কর্মকর্তা ইউনুচ আলী। জাতিরকন্ঠকে তিনি বলেন, এই কেন্দ্র স্থগিত করা হয়েছে। সব ব্যালট পেপার জব্দ করা হয়েছে। তিনি বলেন, কাউকে মারধর করা হলে সেটা পুলিশের ব্যাপার। আর এজেন্ট ঢুকতে না দেওয়ার কোনো অভিযোগ আসলে তিনি ব্যবস্থা নেবেন বলে জানিয়েছেন।
এদিকে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয় একদল যুবক ঢুকে ব্যালটে সিল মারতে থাকেন। তাঁরা আওয়ামী লীগ–সমর্থিত প্রার্থী খুলনা মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান রাসেলের নির্বাচনী প্রতীকে সিল মারতে থাকেন। এই কেন্দ্রের মোট ভোটার ১ হাজার ৬৯১ জন। প্রায় আধা ঘণ্টা তাঁরা ব্যালটে সিল মারেন। এরপর পুলিশ এলে তাঁরা চলে যান।
ওই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা আলীম হোসেন বলেন, দুর্বৃত্তরা ব্যালটে সিল মারলেও তা বাক্সে ভরতে পারেনি। পরে দুটার দিকে কেন্দ্র স্থগিত করা হয়।



