• রোববার , ২৬ জুলাই ২০২৬

বঙ্গবন্ধু হত্যা’র নেপথ্যচারী ধরতে গঠিত কমিশন অচল!


প্রকাশিত: ২:৫৯ এএম, ১৫ আগস্ট ২১ , রোববার

নিউজটি পড়া হয়েছে ১৯৩ বার

বিশেষ প্রতিনিধি : জাতির জনক বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড’র নেপথ্যে কারা ছিল? গবেষণায় উঠে এসেছে ষড়যন্ত্রের নেপথ্য নায়করা এখনও অনেকে জীবিত আছেন? কিন্তু তাদের ধরতে যে কমিশন গঠিত হয়েছিল তা অচল কেন? এ প্রশ্ন আজ সারা বাঙ্গলী জাতির।বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্যে ষড়যন্ত্রকারী কারা তা নিয়ে যখন তুমুল আলোচনা চলছে তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি কৃষক লীগের এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, হত্যার বিচার হয়েছে। এবার এই ষড়যন্ত্রের পেছনে কারা ছিল, একদিন সেটাও বের হবে। প্রধানমন্ত্রী এটুকু বলার পর আর কি বলার অপেক্ষা থাকে যে, নেপথ্য ষড়যন্ত্রকারীদের খুঁজে বের করতে হবে অচিরেই?? কিন্তু তা হয়নি বা এখনও কোনো প্রক্রিয়াও শুরু হয়নি।

অথচ নেপথ্য ষড়যন্ত্রকারীদের খুঁজে বের করতে বঙ্গবন্ধু হত্যার রায়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনায় ছিল। গঠন করতে বলা হয়েছিল কমিশনও। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্য ষড়যন্ত্রকারীদের চিহ্নিত করতে কমিশন গঠন নিয়েও চলছে ষড়যন্ত্র!!! সাবেক আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলছেন তার সময়ে আইন মন্ত্রণালয় থেকে ‘কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তা সরকারের উচ্চ পর্যায়ে তুলে ধরা হয়েছিল’। তবে বর্তমান আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বললেন, ২০২০ সালেই কমিশন গঠনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে করোনা মহামারীর কারণে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। একটা রূপরেখাও তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি জাতিরকন্ঠ কে বলেন, করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এলেই কমিশনের রূপরেখা, কার্যাবলী, গঠন, সবকিছুই প্রকাশ করা হবে।

এতে ঘোর আপত্তি জানিয়েছেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির।তিনি জাতিরকন্ঠকে বলেন, করোনার কারণে কমিশন আটকে থাকবে এটা কি করে হয়?? তিনি বলেন, কমিশন তো ‘ম্যান্ডেটরি’ সরকারের ওপর। হাইকোর্টের রায়ে, অবজারভেশনে বলে দেয়া হয়েছে।একাধিক বিএনপি নেতার অভিযোগ বঙ্গবন্ধু হত্যার নেপথ্যের কুশীলবদের অনেকেই এখনও ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে আছে। আওয়ামী লীগ শুধু বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে ‘টার্গেট’ করে কমিশন গঠনের কথা বলছে। আইনমন্ত্রী বলছেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে জিয়াউর রহমানের সম্পৃক্ততার যথেষ্ট ‘সাক্ষ্যপ্রমাণ’ আছে। যা কমিশনের মাধ্যমে জনসম্মুখে প্রকাশ করা হবে। তিনি বলেন, আমাদের প্রথম কাজ ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকান্ডের মামলা করা। রায় কার্যকর করা, পলাতক আসামি যারা আছেন, তাদের ফিরিয়ে আনা। এরপর এই হত্যাকান্ডের নেপথ্যে কারা, ষড়যন্ত্রকারী কারা, তাদের অন্ততপক্ষে চিহ্নিত করে দেশের মানুষের কাছে, নতুন প্রজন্মের কাছে তাদের নামটা জানিয়ে দেয়া।

শাহরিয়ার কবির জাতিরকন্ঠ কে বলেন, দেখুন এটা কোন সাধারণ হত্যাকান্ড নয়।
তাছাড়া বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার খুবই দায়সারাভাবে করা হয়েছে । এর কারণ, যারা দায়িত্বে ছিলেন, তদন্তে এবং প্রতিকিউশনে এটার ;দায় তাদের। তারা কেন করেননি সেটা তারাই ভাল জানেন। জাতির পিতাকে হত্যা করল, একজন রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করল। এর নেপথ্য নায়ক কারা? এর পেছনে কোন আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র আছে কি না, এটার কোন ‘প্রপার’ তদন্ত হবে না! এটা কি করে হয়।

খোঁজ নিয়ে দেখেন, বিচার প্রক্রিয়ার সময় কমিশন গঠনের কথা বার বার বলা হয়েছিল। কিন্তু সেটা কই?? কি করছে আইনমন্ত্রী?? ভারতীয় সাংবাদিক এএল খতিবের লেখা ‘হু কিল্ড মুজিব’সহ বেশকিছু গ্রন্থ ও বিদেশি গবেষকদের বরাত দিয়ে শাহরিয়ার কবির বলেন, তারা গবেষণা করে দেখিয়েছেন, তাদের বইতে আছে, বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে সিআইএ (সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের আওতাধীন বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থা) কীভাবে জড়িত ছিল, আইএসআই (ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স, পাকিস্তানের গোয়ন্দো সংস্থা) কীভাবে জড়িত ছিল। যাদের বিচার করা হয়েছে-এরা তো (আত্মস্বীকৃত খুনিরা) শুধুমাত্র এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছে। আবার এরাও (আত্মস্বীকৃত খুনিরা) কিছু নাম বলেছে। এরা জিয়াউর রহমানের নাম বলেছে, মোশতাকের (খন্দকার মোশতাক আহমদ) নাম বলেছে। এগুলো কোন কিছুই এখানে (তদন্তে) আমলে আনা হয়নি।

যে কারণে উচ্চ আদলতের রায়ে বলা হয়েছে, একটা কমিশন গঠন করে এদের পরিচয় জাতির সামনে তুলে ধরা। নেপথ্য নায়কদের চিনিয়ে দেয়া। ষড়যন্ত্রটা কেন হয়েছে… বলেন শাহরিয়ার কবির।তিনি বলেন এখন কমিশন গঠন হলে কী করবে আমি জানি না। আমরা দীর্ঘদিন যাবত যেটা বলছি, আসলে সে পর্যন্ত যাবে কি না।নিজের নির্মিত চলচ্চিত্রে মুফতি হান্নানের সাক্ষাৎকারের কথা উল্লেখ করে শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘তারা বলেছে, ‘হরকতের নেতা, বিএনপি-জামায়াত, ফ্রিডম পার্টি, সবাই মিলে গোপনে বেঠক করেছে। শেখ হাসিনাকে বাঁচিয়ে রাখলে বাংলাদেশে ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করা যাবে না।

‘যে রাজনীতি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে, সে রাজনীতি তো এখনও প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বসে আছে। এদের যদি বহাল থাকতে দেয়া হয়, তাহলে বঙ্গবন্ধু কন্যাও নিরাপদ থাকবেন না, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিরাপদ থাকবে না। যে কারণে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে, একই কারণে শেখ হাসিনাকেও বার বার হত্যার চেষ্টা করা হচ্ছে। এদের নেপথ্যে কারা, এখনও কারা ষড়যন্ত্র করছে, এসব তো বের করতে হবে।’

এই কমিশনের গঠন কেমন হওয়া উচিত, কাদের কমিশনে রাখা দরকার? এমন প্রশ্নের জবাবে শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘নেপথ্যের কারণগুলো খুঁজে বের করতে হবে। কারণগুলো খোঁজার জন্য যারা যোগ্য ব্যক্তি তাদের কমিশনে রাখতে হবে।এখন যদি এমন হয়, কমিশনে আওয়ামী লীগের এমন কিছু লোক এলো, যাদের পাকিস্তানের সঙ্গে প্রেম আছে, মহব্বত আছে, যারা পাকিস্তানের নাম মুখে নেবে না। আমেরিকাপ্রেমী আছে, যারা সিআইএর নাম মুখে নেবে না, তাহলে তো মুশকিল হয়ে যাবে।’

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক এএসএম সামছুল আরেফিন উল্লেখ করেছেন, বঙ্গবন্ধুকে যখন হত্যা করা হয়, রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা একেবারে সামরিক বাহিনীর প্রধান থেকে শুরু করে সমস্ত পজিশনে, গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান যে ছিলেন, স্বরাষ্ট্র সচিব যে ছিলেন, রাষ্ট্রপতির সচিব যে ছিলেন, সমস্ত কর্মকর্তাদের তালিকা তৈরি করেছেন। ৫০ জনের ওই তালিকায় দেখা যাচ্ছে ৩৪ জন হচ্ছেন পাকিস্তানপন্থি, অমুক্তিযোদ্ধা। বঙ্গবন্ধুকে তো তারা (পাকিস্তানপন্থিরা) ঘিরেই ফেলেছিলেন। বঙ্গবন্ধু জানতেন না। জানার কথাও না। তিনি তো যে রকম উদার মনের মানুষ, সবাইকে ক্ষমা করার পক্ষে।

যাহোক, আগের আইনমন্ত্রী তো (ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ) তদন্ত শুরু করে দিয়েছিলেন জামায়াতের বিচার করার বিষয়ে, পাকিস্তানি হাইকমান্ডের বিচার করার বিষয়ে। আমাদের এতো চেষ্টা-উদ্যোগের পর দুটো ট্রাইবুনাল পূর্ণোদ্যমে শুরু হলো। দুটো ট্রাইবুনালেই বিচার হচ্ছিল। এখন উনি (বর্তমান আইনমন্ত্রী) একটা ট্রাইবুনাল করে দিলেন। বিচারক নাই, প্রসিকিউশন নাই, তদন্ত কর্মকর্তা নাই। দুটো ট্রাইবুনালের জায়গায় একটা করে দিলেন। ট্রাইবুনালও তো এখন অচল হয়ে গেছে।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে থাকার কারণে প্রাণে বেঁচে যান। ওই হত্যাকান্ডের মামলা হয় ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে। নিম্ন আদালতে ওই মামলার রায় হয় আরও দুই বছর পর ১৯৯৮ সালে। আদালতের রায়ে হত্যাকান্ডের পেছনের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ ছিল। কিন্তু বিস্তারিত উঠে আসেনি। উচ্চ আদলতে আপিল পরবর্তী রায়ে ১২ জনের ফাঁসির দন্ড কার্যকর প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১০ সালে। এরমধ্যে ৬ জনের দন্ড কার্যকর করা হয়েছে। একজন বিদেশে মারা গেছেন বলে জানা গেছে। তবে এখনও পলাতক পাঁচ আসামি। সরকারের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পলাতকদের ফিরিয়ে আনতে কূটনেতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।