• রোববার , ২৬ জুলাই ২০২৬

প্রণোদনা সহায়তার ঋণে ঘুষ নেয়া হচ্ছে : সানেম জরিপ


প্রকাশিত: ১০:১৮ পিএম, ২৮ আগস্ট ২১ , শনিবার

নিউজটি পড়া হয়েছে ১১৫০ বার

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনোমিক মডেলিং’ (সানেম) পরিচালিত জরিপ ওয়েবিনারে বক্তব্য রাখছেন, সানেমের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান ও দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের বাংলাদেশ প্রতিনিধি কাজী ফয়সাল বিন সিরাজ

শফিক রহমান : প্রণোদনা সহায়তারঋণে ঘুষ নেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের কতিপয় সুবিধাভোগী কর্তা ব্যক্তি এসব ঘটনায় জড়িত। একটি বিশেষ জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ’সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনোমিক মডেলিং’ (সানেম) পরিচালিত এই জরিপে প্রণোদনা সহায়তা’য় ঋণে ঘুষ নেয়া হচ্ছে বলে তথ্য উঠে এসেছে।অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের বাংলাদেশ প্রতিনিধি কাজী ফয়সাল বিন সিরাজ।

জরিপের অভিযোগে ২৯ শতাংশ উদ্যোক্তা কিংবা তাদের প্রতিনিধিরা ঘুষ দাবি করেছেন বলে তথ্য উদঘাটিত হয়েছে। জরিপে ৪৭ শতাংশ হ্যা কিংবা না কোনোটাই বলেননি। এর অর্থ মৌনতা সম্মতির লক্ষণ হিসেবে ধরে হলে এরাও ঘুষের শিকার বলে ধরে নেওয়া যায়। উদ্যোক্তারা হয়তো নানান দিক থেকে ক্ষতির আশঙ্কা থেকেই সরাসরি হ্যা বলতে চাননি। আর মাত্র ২৪ শতাংশ জানিয়েছে, তাদের কাছে ঘুষ চাওয়া হয়নি।

৫০১টি শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা কিংবা তাদের প্রতিনিধিদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে গত জুলাই মাসে জরিপটি পরিচালনা করে সানেম। জরিপে দেখা যায়, ঘুষের দাবিসহ একরম বিভিন্ন কারণে জরিপে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে জুলাই পর্যন্ত ৭৯ শতাংশ প্রণোদনা প্যাকেজের বাইরে রয়ে গেছে। অর্থাৎ মাত্র ২১ শতাংশ প্যাকেজ থেকে ঋণ সুবিধা পেয়েছে।এ ব্যাপারে সানেমের নির্বাহী পরিচালক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান ওয়েবিনারে বলেন, ‘ঘুষের অভিযোগ তোলা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্ষুদ্র-মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাই বেশি। মোট ৪২ শতাংশ এ ধরনের প্রতিষ্ঠান। ৩৫ শতাংশ ক্ষুদ্র আকারের প্রতিষ্ঠান।’

তবে জরিপটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ব্যাংক কিংবা অন্য কোন প্রতিষ্ঠান থেকে ঘুষ দাবি করা হয়েছে- সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি সানেমের পক্ষ থেকে। এ সম্পর্কে ড. সেলিম রায়হান বলেন, ‘ঘুষ দাবি করা হয়েছে কিনা- এ প্রশ্নের হ্যা কিংবা না জবাবের বাইরে বিস্তারিত আর কিছু জানতে চাওয়া হয়নি জরিপে।’উল্লেখ্য, করোনার সময়ে অর্থনীতি সুরক্ষায় ঋণ আকারে কয়েক দফায় ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সরকার। এর মধ্যে শিল্প ঋণের জন্য ৩০ হাজার কোটি টাকা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পখাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা, রপ্তানিমুখী শিল্পের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ রয়েছে।

সানেমের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান

৫০১টি প্রতিষ্ঠানের ওপর জরিপ-

করোনা মহামারিতে ব্যবসায় আস্থা সংক্রান্ত জরিপের পঞ্চম পর্যায়ের ফলাফল নিয়ে সানেম এবং দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের এই ওয়েবিনার আয়োজন করে। কোভিড-১৯ মহামারির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের আস্থা ও প্রত্যাশার উপর সানেম ও দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত জরিপের পঞ্চম পর্যায়ের ফলাফল উপস্থাপন করা হয় ২৮ আগস্ট ২০২১ তারিখে আয়োজিত ওয়েবিনারে। ওয়েবিনারে জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান।

পঞ্চম পর্যায়ে বাংলাদেশের ৮টি বিভাগের ৩৭টি জেলার মোট ৫০১টি ক্ষুদ্র, ছোট, মাঝারি ও বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর এই জরিপ করা হয়েছে। করোনা মহামারির সময়ে বাংলাদেশের শিল্প ও সেবা খাতের পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পেতে গত বছরের জুলাই থেকে সানেম এবং দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশন ধারাবাহিকভাবে তিন মাস অন্তর অন্তর জরিপ পরিচালনা করছে। প্রথম পর্যায়ে গত বছরে ৩০০ টি প্রতিষ্ঠানের ওপর এবং পরবর্তী পর্যায়গুলোতে প্রায় ৫০০ টি প্রতিষ্ঠানের ওপর জরিপ পরিচালিত হয়েছে। পঞ্চম পর্যায়ের জরিপে উৎপাদন খাতের ২৫৫টি এবং সেবা খাতের ২৪৬টি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীদের সাথে গত ২ থেকে ১৭ জুলাই ফোনালাপের মাধ্যমে জরিপটি পরিচালিত হয়। উৎপাদন খাতের তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, চামড়া ও চামড়াজাত পন্য, ফার্মাসিউটিক্যালস, হালকা প্রকৌশল ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের প্রতিষ্ঠানগুলি জরিপের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেবা খাতের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা, রেস্টুরেন্ট, পরিবহন, আইসিটি ও টেলিকমিউনিকেশন, আর্থিক খাত ও রিয়েল এস্টেট খাত জরিপের অন্তর্ভুক্ত ছিল।জরিপে অংশগ্রহণকারীদের তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মুনাফা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, আয়, ব্যবসার খরচ এবং বিক্রি বা রপ্তানি নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করা হয়। উত্তরগুলো ০-১০০র মানদণ্ডে পরিমাপ করা হয়েছে, যেখানে ০- খুব খারাপ, ২৫- খারাপ, ৫০- কোনো পরিবর্তন নেই, ৭৫- ভালো এবং ১০০- খুব ভালো অবস্থাকে ইঙ্গিত করে।

জরিপের উত্তরের ওপর ভিত্তি করে সানেম তিনটি সূচকের মাধ্যমে তাদের গবেষণাপত্রটি উপস্থাপন করেছে —বার্ষিক প্রেজেন্ট বিজনেস স্ট্যাটাস ইনডেক্স বা পিবিএসআই-এ এক বছরের আগের তুলনায় জরিপকালীন সময়ে ব্যবসার সামগ্রিক পরিস্থিতি কেমন সে সম্পর্কে ধারণা দেয়; ত্রৈমাসিক প্রেজেন্ট বিজনেস স্ট্যাটাস ইনডেক্স-এ যার মাধ্যমে পূর্ববর্তী তিন মাসের তুলনায় জরিপকালীন ত্রৈমাসিকে ব্যবসার সামগ্রিক পরিস্থিতি কেমন তা বোঝা যায় এবং বিজনেস কনফিডেন্স ইনডেক্স-এর মাধ্যমে জরিপের সময়ের তুলনায় পরবর্তী তিন মাসের ব্যবসা সম্পর্কে ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা বোঝা যায়। এর মধ্যে বার্ষিক পিবিএসআই-এর মাধ্যমে ২০২০ সালের এপ্রিল-জুন মাসের সাথে ২০২১ সালের এপ্রিল-জুন মাসের ব্যবসার অবস্থার তুলনা করা হয়েছে। ত্রৈমাসিক পিবিএসআই-এ ২০২১ সালের এপ্রিল-জুন মাসের সাথে ২০২১ সালের জানুয়ারি-মার্চ মাসের ব্যবসার অবস্থার তুলনা করা হয়েছে। অন্যদিকে বিজনেস কনফিডেন্স ইনডেক্স বা বিসিআই-তে ২০২১ সালের এপ্রিল-জুন মাসের তুলনায় ২০২১ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর মাসে ব্যবসায়ীদের আস্থা কেমন, তা প্রকাশ করেছে। প্রতিটি সূচকই ০-১০০র মধ্যে মূল্যায়ন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে, ৫০ এর বেশি মানে অবস্থার উন্নতি হচ্ছে এবং ৫০ এর নিচে অবস্থানকে অবনতি ধরা হয়েছে।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই কাজী ফয়সাল বিন সিরাজ তার বক্তব্যে সানেম ও দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে পরিচালিত ব্যবসায় আস্থা জরিপে থেকে প্রাপ্ত ফলাফল নীতি নির্ধারনী পর্যায়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিভিন্ন পরিকল্পনায় সাহায্য করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।জরিপের ফলাফল উপস্থাপনের সময় অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, বার্ষিক পিবিএসআই সূচকে কিছুটা উন্নতি দেখা দিলেও ত্রৈমাসিক পিবিএসআই সূচকে উদ্বেগজনকভাবে অবস্থার অবনতি হয়েছে। অর্থাৎ গত বছরের এপ্রিল-জুনের তুলনায় এ বছরের এপ্রিল-জুনে ব্যবসায় খরচ ছাড়া প্রায় সবগুলো খাতে অবস্থার উন্নতি হয়েছে। অন্যদিকে ত্রৈমাসিক পিবিএসআই সূচকে দেখা যায়, লকডাউন এবং বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের কারণে এ বছরের প্রথম তিন মাসের তুলনায় এপ্রিল-জুনে ব্যবসায় পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। মুনাফা, বিনিয়োগ, ব্যবসায় খরচ, বিক্রি বা রপ্তানি খাতে গত বছরের এপ্রিল-জুন সবচেয়ে খারাপ সময় পার করে এবং আশঙ্কাজনকভাবে গত দেড় বছরে এপ্রিল-জুন ২০২১ এর সময়টি খারাপ অবস্থার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। ২০২০ সালের এপ্রিল-জুন সময়কালে ত্রৈমাসিক প্রেজেন্ট বিজনেস স্ট্যাটাস ইনডেক্সের মান ছিল ২৯.৪৮, ২০২০ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বরে ছিল ৪৭.৯৬, ২০২০ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর মাসে ছিল ৪৮.৮৩, ২০২১ সালের জানুয়ারি-মার্চে ছিল ৫১.৩৮, যেটি ২০২১ সালের এপ্রিল-জুনে কমে হয়েছে ৪২.৫৭।

ওয়েবিনারে বক্তব্য রাখছেন, দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের বাংলাদেশ প্রতিনিধি কাজী ফয়সাল বিন সিরাজ

পিবিএসআই এর ক্ষেত্রে প্রতিটি পর্যায়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ফার্মাসিউটিক্যাল প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলকভাবে ভাল অবস্থানে থাকলেও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, যানবাহন ও রিয়েল এস্টেট খাতগুলোর অবস্থা তুলনামূলকভাবে খারাপ। ত্রৈমাসিক প্রেজেন্ট বিজনেস স্ট্যাটাস ইনডেক্সে দেখা যায় ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলো সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে। ত্রৈমাসিক পিবিএসআই সূচকে ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানের মান ৩৯.৭০, মাঝারি প্রতিষ্ঠানের সূচকের মান ৪৩.৭৫ এবং বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের মান ৪৮.৮২। সেবাখাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর (সূচকের মান ৪১.৩১) অবস্থা উৎপাদন খাতের (সূচকের মান ৪৩.৭৯) চেয়ে শোচনীয়। একইসাথে রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান ব্যবসায় অবস্থা যেসব প্রতিষ্ঠান রপ্তানি করে না তাদের তুলনায় ভালো। ঢাকাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোও তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে।

তবে আশার বিষয় এই যে চতুর্থ পর্যায়ে জরিপের অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ব্যবসায় আস্থা কম দেখা গেলেও পঞ্চম পর্যায়ের জরিপে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ২০২০ সালের জুলাই মাসে পরিচালিত জরিপে বিজনেস কনফিডেন্স ইনডেক্স বা ব্যবসার আস্থা সূচকের মান ছিল ৫১.০৬, ২০২০ সালের অক্টোবর মাসে পরিচালিত জরিপে এই সূচক ছিল ৫৫.২৪, ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে এই সূচক ছিল ৫৭.৯০, ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে পরিচালিত চতুর্থ পর্যায়ের জরিপে এই সূচক ছিল ৪১.৩৯ এবং পঞ্চম পর্যায়ে এই সূচকের মান বেড়ে হয়েছে ৪৯.৭৪। ব্যবসার বর্তমান অবস্থা এবং ব্যবসায় আস্থা এই দুটির অনুপাত করে দেখা যায় চতুর্থ পর্যায়ে কিছুটা অবনতি হলেও পঞ্চম পর্যায়ে এটির কিছুটা উন্নতি হয়েছে।

তবে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের দিক থেকে কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। ৪র্থ পর্যায়ের জরিপে ২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী পুনরুদ্ধারের কথা বললেও এপ্রিল-জুনে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ শতাংশে, মাঝারি পুনরুদ্ধারের ৩১ শতাংশ থেকে ২৭ শতাংশ এবং দুর্বল পুনরুদ্ধার ৬৭ শতাংশ থেকে কমে ৬৪ শতাংশে পৌছেছে। ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানের তুলনা করতে গেলে দুর্বল ও মাঝারি পুনরুদ্ধার অনেকটা আগের মতো থাকলেও শক্তিশালী পুনরুদ্ধারের কথা মনে করছে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান। এক্ষেত্রে রেমিট্যান্স, রপ্তানির সুযোগ, আর্থিক সাহায্য ও টিকাদান কর্মসূচি একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে বলে লক্ষ্য করা যায়। ২০২০ সালের মার্চ মাসের তুলনায় ২০২১ এর মার্চ মাসে প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায় ৫৭ শতাংশ পুনরুদ্ধার হলেও জুন ২০২১ সালে পুনরুদ্ধারের মাত্রা কমে দাঁড়ায় ৩৫ শতাংশে। এক্ষেত্রে বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলোই তুলনামূলক কম ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।

চতুর্থ পর্যায়ের জরিপে যারা জানিয়েছিলেন তাঁরা প্রণোদনা প্যাকেজ পাননি, তাঁদের মধ্যে ৬% প্রতিষ্ঠান পঞ্চম পর্যায়ের জরিপে জানিয়েছেন তাঁরা প্রণোদনা প্যাকেজ পেয়েছেন। তবে এ ক্ষেত্রেও বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রণোদনা পাওয়ার হার বেশি। নতুন ৬% প্রণোদনা পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৪% ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান ও ১৭% বৃহৎ প্রতিষ্ঠান গ্রহণ করেছে। জরিপকৃত মাঝারি কোন প্রতিষ্ঠান নতুন করে কোন প্রনোদনা প্যাকেজ গ্রহণ করেনি। প্রণোদনা প্যাকেজগুলো গ্রহণ না করার কারণ হিসেবে প্রায় প্রতিটি সূচকে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। তবে, এই পর্যায়ে উদ্বেগজনকভাবে ঘুষের বিষয়টি লক্ষ্য করা যায়। এ ক্ষেত্রেও ঘুষ চাওয়ায় সবচেয়ে বেশি সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো।

জরিপে অংশগ্রহণকারী ৬৫.৭% প্রতিষ্ঠান আর্থিক ক্ষতি সামাল দেয়ার জন্য ব্যক্তিগত সঞ্চয়ের উপর নির্ভর করেছেন, ২৮.১% ধার নিয়েছেন, ১৯.০% কর্মী ছাটাই করেছেন, ৮.৮% কর্মীদের বেতন কমিয়ে দিয়েছেন ও ১৭.৮% প্রতিষ্ঠান প্রণোদনা প্যাকেজের আশ্রয় নিয়েছেন। বিশেষত ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সঞ্চয়ের উপর নির্ভরশীলতা একটি উদ্বেগজনক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। আগামীতে কোন সাহায্য না পেলে এই প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা যায়।

টিকা গ্রহণের ব্যাপারে জরিপকৃত প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের নিকট থেকে জানা যায় প্রায় ৬০% নির্বাহী অন্তত এক ডোজ ভ্যাকসিন গ্রহণ করেছেন। আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ফার্মাসিউটিক্যাল প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেই টিকা গ্রহণের প্রবণতা বেশি দেখা গেছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীদের তুলনায় বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীদের টিকা গ্রহণের প্রবণতা বেশি। একইসাথে ঢাকায় অবস্থিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের মধ্যে টিকা নেওয়ার প্রবণতা বেশি। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের তাদের প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের টিকা গ্রহণের বিষয়ে জানতে চাইলে জানা যায়, প্রায় ২৫% কর্মী অন্তত এক ডোজ টিকা গ্রহণ করেছেন। এক্ষেত্রে উৎপাদন খাত ও ঢাকায় অবস্থিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের টিকা গ্রহণ করার প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা যায়।

অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, গত দেড় বছরে কোভিড মহামারি ও লকডাউন সহ বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের মাঝে কোভিড পরিস্থিতির একটি প্যাটার্ন লক্ষ্য করা যায়। সেক্ষেত্রে এই প্যাটার্নকে মাথায় রেখে এলাকা ও খাত ভিত্তিক প্রোটোকল গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। বিভিন্ন প্রোটোকল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসন নির্ভর সিদ্ধান্ত না নিয়ে সকল স্টেকহোল্ডার, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, শ্রমিক ইউনিয়ন ও জনগণকে সাথে নিয়ে করোনা পরিস্থিতি ও লকডাউনের মাঝেই কিভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ব্যবসা পরিচালনা করা যায় সেটি দেখতে হবে। এছাড়াও সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে দুটি ক্ষেত্রে- টিকাদান কর্মসূচি ও প্রণোদনা প্যাকেজ। এখনো একটি বড় অংশের কর্মীদের মধ্যে অন্তত এক ডোজ টিকাও না পাওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। সেক্ষেত্রে যত দ্রুত সম্ভব এই অবস্থার উন্নতি না করলে এই অনিশ্চিত পরিস্থিতি পরবর্তীতে আরও খারাপ হতে পারে। নতুন প্রণোদনা প্যাকেজ প্রদানের পূর্বে বর্তমান অবস্থাকে সঠিকভাবে যাচাই করে প্রণোদনা প্যাকেজগুলো যাতে সঠিক প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌছায় সে বিষয়ে সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নিবে বলে আশা করেন ড. সেলিম রায়হান। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও এগিয়ে আসার কথা বলা হয়। মহামারির আর্থিক দিকগুলো সংস্কারের পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও অন্যান্য খাতের সংস্কার এই মুহূর্তে অতীব গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিহিত করেন ড. সেলিম রায়হান।