দেশকে পিছিয়ে দিতে অপশক্তি এখনও সক্রিয়: প্রধানমন্ত্রী

বিশেষ প্রতিনিধি : দেশকে পিছিয়ে দিতে অপশক্তি এখনও সক্রিয় বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, এখন শুধু আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পালা। পিছনে ফিরে তাকানোর কোনো সুযোগ নেই। সকল বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে এদেশকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শোষণ-বঞ্চনামুক্ত, ক্ষুধা-দারিদ্র্য-নিরক্ষরতামুক্ত, অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলাদেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবই। নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে বাংলাদেশ যেখানে এসেছে, সেখান থেকে দেশকে পিছিয়ে দিতে বাংলাদেশরোধী অপশক্তি এখনও সক্রিয়। তবে তারা কোনোভাবেই সফল হতে পারবে না বলে জানান আত্মবিশ্বাসী জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনা।
বুধবার বিকেলে জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধনীর দিন এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। বিকাল সাড়ে ৪টায় জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে উপস্থিত হন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতি ইব্রাহিম মোহামেদ সলিহ। ১০ দিনের এ অনুষ্ঠানমালা শুরু হয় জাতীয় সংগীত দিয়ে। পরে গাওয়া হয় কবিগুরুর ‘আনন্দ লোকে’ গানটি।
পরে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতি ইব্রাহিম মোহামেদ সলিহকে নিয়ে আসন গ্রহণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন সংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সাবেক সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নুর। অতিথিদের আসন গ্রহনের পর পরিবেশন করা হয় মুজিব বর্ষের থিম সঙ্গীত। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নেয়া খোকা পরে হয়ে উঠেন বাঙালির আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কবল থেকে উদ্ধার করে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতির পিতা হয়ে উঠেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে বাংলাদেশ যে অবস্থানে পৌঁছেছে, সেখান থেকে তাকে সহজে অবনমন করা বা নামানো যাবে না। তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ – আমরা এই করোনাভাইরাস মহামারির অভিঘাত সফলভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছি। তবে আমাদের সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশবিরোধী অপশক্তি এখনও দেশে-বিদেশে সক্রিয় রয়েছে। তারা নানা অপতৎপরতার মাধ্যমে এ অর্জনকে নস্যাৎ করতে চায়।
জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীর আয়োজন এবার আরও বেশি আনন্দের হয়ে উঠেছে, একই বছর ৫০ বছর পূর্ণ হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতার। এই দুটি দিবসকে সামনে রেখে ১০ দিনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে সরকার, যার সূচনা হলো বঙ্গবন্ধুর জন্মের তারিখে। এই আয়োজনে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান ভিডিও বার্তা পাঠিয়েছেন। সশরীরে থাকছেন পাঁচটি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান। জাতির পিতার জন্মদিনে ঐক্যবদ্ধভাবে সকল অপতৎপরতা প্রতিহত করতে দেশবাসীকে আহ্বান জানান সরকারপ্রধান। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে প্রাধান্য পায় মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের প্রসঙ্গও।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির প্রতীক্ষার প্রহরের আজ অবসান হতে চলেছে। আজ এমন এক সময়ে আমরা জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করতে যাচ্ছি, যখন বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে মর্যাদাশীল উন্নয়নশীল দেশের কাতারে সামিল হওয়ার চূড়ান্ত সুপারিশ লাভ করেছে।
মাথাপিছু আয় সম্মানজনক দুই হাজার মার্কিন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে; দারিদ্র্যের হার ২০.৫ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে; দেশ খাদ্যশস্য উৎপাদনে স্বয়ং-সম্পূর্ণ হয়েছে; মানুষের গড় আয়ু ৭৩ বছরে উন্নীত হয়েছে। আর্থ-সামজিক সূচকে বাংলাদেশ প্রভূত উন্নয়ন সাধন করেছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের বিগত ১২ বছরের নিরলস প্রচেষ্টা এবং জনগণের ঐকান্তিক পরিশ্রমের ফসল আজকের এই প্রাপ্তি।
জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে দৃঢ় প্রতিজ্ঞার কথা আবারও স্মরণ করিয়ে দেন তার জ্যেষ্ঠ্য কন্যা শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, এখন শুধু আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পালা। পিছনে ফিরে তাকানোর কোনো সুযোগ নেই।সকল বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে এদেশকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শোষণ-বঞ্চনামুক্ত, ক্ষুধা-দারিদ্র্য-নিরক্ষরতামুক্ত, অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলাদেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার অঙ্গীকারের কথাও তুলে ধরেন জাতির পিতার কন্যা।জাতির পিতার জন্মদিনকে জাতীয় শিশু দিবস হিসেবেও পালন করা হয়। দিবস উপলক্ষে দেশের সব শিশুকে শুভেচ্ছাও জানান সরকার প্রধান। অনুষ্ঠানে যোগ দেয়া মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতি ইব্রাহিম মোহামেদ সলিহকে কৃতজ্ঞতা জানান প্রধানমন্ত্রী। শুভেচ্ছা জানান দেশটির জনগণকে।
ভিডিও বার্তা পাঠানোয় চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী ইয়োশিহিদে সুগাকেও ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান প্রধানমন্ত্রী। মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তীতে দেশ গঠনে সহযোগীতাকারী বন্ধু প্রতীম দেশ ও রাজনৈতিক নেতাদেরও কৃতজ্ঞতা জানান সরকারপ্রধান।প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাঙালির রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক মুক্তির লক্ষ্য নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ মাতৃভাষার মর্যাদা অর্জনের যে সংগ্রাম শুরু করেছিলেন সে ধারাবাহিক সংগ্রামের সাফল্যের ফসলই আমাদের স্বাধীনতা।
‘যুদ্ধ-বিধস্ত দেশ, তার উপর শত শত বছরের পরাধীনতার গ্লানি। শোষণ, বঞ্চনা, ক্ষুধা, দারিদ্র্য-পীড়িত মানুষের এ জনপদকে একটা পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার মতো কঠিন দায়িত্ব পালন করেছিলেন মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে। অসাধ্য সাধন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।অনেক স্বপ্ন ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। বাংলাদেশকে তিনি উন্নত সমৃদ্ধ ‘সোনার বাংলা’ হিসেবে গড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু ঘাতকের নির্মম বুলেট তাঁকে আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নেয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট।কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতবিতান থেকে কয়েকটি লাইন আবৃত্তি করে বক্তব্য শেষ করেন প্রধানমন্ত্রী।
গত কয়েক দিন ধরেই আয়োজন চলছে বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর আয়োজনের। ১০ দিনের জমকালো এই আয়োজন সামনে রেখে প্যারেড স্কয়ারে তৈরি করা হয়েছে শহীদ মিনার, পদ্মা সেতু, জাতীয় মাছ ইলিশসহ দৃষ্টিনন্দন নানা প্রতিরূপ, যা আবহমান বাংলা এবং উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে প্রতিনিধিত্ব করবে।করোনা মহামারির কারণে প্রতিদিন ৫০০ করে অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এ আয়োজনে, যাদের সবাইকে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হবে করোনা পরীক্ষা করে নেগেটিভ সনদ সঙ্গে নিয়ে। প্রথমদিনের অনুষ্ঠান সাজানো হয়েছে ‘ভেঙেছ দুয়ার, এসেছ জ্যোতির্ময়’ থিম দিয়ে।



