• রোববার , ২৬ জুলাই ২০২৬

তদবিরে তকদিরেও গুড়েবালি ইব্রাহিমের


প্রকাশিত: ১০:২২ পিএম, ৩০ নভেম্বর ২১ , মঙ্গলবার

নিউজটি পড়া হয়েছে ১৪২ বার

লাবণ্য চৌধুরী : তদবিরে তকদির ফিরলেও সব খোয়ালো জালিয়াত ছাত্রলীগার সেই ইব্রাহিম। সব গোমর ফাঁস হয়ে তা চলে গেছে নেত্রীর কানে। অতপর-ঢাকা মহানগর উত্তর শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ইব্রাহিম হোসেনকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (৩০ নভেম্বর) ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।

এতে বলা হয়, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের এক জরুরি সিদ্ধান্ত মোতাবেক জানানো যাচ্ছে যে, মো. ইব্রাহিম হোসেনকে (সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ঢাকা মহানগর উত্তর) তার নিজ পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হল। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সজীব আহমেদ (সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ঢাকা মহানগর উত্তর) এ শাখার ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন।

তবে কি কারণে ইব্রাহিমকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে সে ব্যাপারে কোনো স্পষ্ট করে কিছু জানানো হয়নি। এদিকে, সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর এক যৌথসভা শেষে দায়িত্বশীল নেতাদের এ নির্দেশনার কথা জানান দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এরপরেই সব ভেস্তে যায়। ছাত্রলীগের সভাপতি আল নাহিয়ান খান ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যকে বিষয়টি অবহিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন ওবায়দুল কাদের। এরপর বহিস্কার হতে বাধ্য হন ইব্রাহিম।

ইব্রাহিম সবশেষ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী হিসেবে ইউরোপে জলবায়ু সম্মেলনেও গিয়েছিলেন ইব্রাহিম। সম্মেলন থেকে ফেরার দিন তাকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দর এলাকায় অবস্থান নেন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। ইব্রাহিমের এই নেতাগিরী ফলানোটাও কাল হয়ে দাড়ায়। এতে বিমানবন্দর সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এ কারণে সেদিন এসএসসি পরীক্ষার্থীদের হলে পৌঁছাতে ভোগান্তি পোহাতে হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সভাপতি মো: ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে কমিটিতে পদ পেতে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বয়স কমানোর অভিযোগ উঠেছে। একটি ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র বানিয়ে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সবশেষ সম্মেলনে তিনি মনোনয়নপত্রে বয়স কমিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু বয়সই নয়, জালিয়াতি করতে গিয়ে মো: ইব্রাহিম তার বাবা-মায়ের নামও পরিবর্তন করেছেন বলে প্রমাণ মিলেছে।২০১৮ সালের ১১-১২ মে সবশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ ছাত্রলীগের।

সেই সম্মেলনের ২ মাস ২২ দিন পর বিতর্কিত শোভন-রব্বানীকে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক করে কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি ঘোষণা করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের শীর্ষ দু’টি পদে নেতাও। সেখানে ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সভাপতি পদে নাম ঘোষণা করা হয় মো: ইব্রাহিমের।ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, কমিটিতে পদ পাবেন সর্বোচ্চ ২৭ বছর বয়সী ছাত্ররা। তবে ২০১৮ সালের ২৯তম ওই সম্মেলনে কয়েকজন শীর্ষ পদ প্রত্যাশীর বয়স ২৮ বছর হওয়ায় বিশেষ বিবেচনায় সংগঠনটির অভিভাবক ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা অনূর্ধ্ব-২৮ বছর নির্ধারণ করে দেন।

দেখা যায় মো: ইব্রাহিম ঢাকা মহানগর উত্তর সভাপতির পদে ২২ নম্বর সিরিয়ালের মনোনয়নপত্র কিনে জমা দেন এপ্রিলের ২২ তারিখ। তার মনোনয়নপত্রটি গ্রহণ করেন ছাত্রলীগের তৎকালীন ঢাকা মহানগর উত্তরের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও সহ সভাপতি নুসরাত জাহান নূপুর। মনোনয়নপত্রে তিনি পিতার নাম উল্লেখ করেন মো: ইউনুস আলী ও মায়ের নামের জায়গায় লেখেন মেহেরুন নেসা। জন্ম তারিখ লেখেন ১৯৯০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। সে অনুযায়ী সম্মেলনের সময় মো: ইব্রাহিমের বয়স দাঁড়ায় ২৮ বছর আড়াই মাস। এ ছাড়া মনোনয়নপত্রে তার জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর লেখেন ১৯৯০৭৯১১৫৩৭০০০০৪৩।

কিন্তু অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে ভয়াবহ তথ্য। ইব্রাহিম মনোনয়নপত্রে যে তথ্য দিয়েছেন সেখানে নিজের নাম ছাড়া বাকি সব তথ্যই ছিল মিথ্যা। এমনকি বয়স কমাতে তিনি তার বাবা ও মায়ের নামও মনোনয়নপত্রে মিথ্যা লেখেন বলে প্রমাণ মিলেছে। আর জাতীয় পরিচয়পত্রের যে নম্বর লিখেছেন, নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র শাখায় খোঁজ নিয়ে এমন কোনো নম্বরের হদিসই পাওয়া যায়নি। তবে অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে মো: ইব্রাহিমের আসল পরিচয়। নির্বাচন কমিশন ও পাসপোর্ট অফিসে অনুসন্ধান করে হাতে এসেছে তার জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের আসল কপি। সেই পাসপোর্ট ব্যবহার করে তিনি বেশ কয়েকটি দেশ ভ্রমণও করেছেন।

মনোনয়নপত্রে ইব্রাহিমের দেয়া তথ্যের সাথে আসল জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের তথ্যের কোনো মিল পাওয়া যায়নি। ইব্রাহিমের আসল জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর হলো ১৯৮৯৭৯১৫৮১৭০০০০০৪। আর পাসপোর্ট নম্বর ঊই ০৪৬৬৬২৯। যেখানে তার আসল জন্মতারিখ, বাবা মায়ের সঠিক নাম পাওয়া গেছে। সেখানে দেখা যায়, মো: ইব্রাহিমের পিতার আসল নাম মো: আদম আলী পাত্তর। মায়ের নাম শাহানারা আক্তার।

এ ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট অনুযায়ী, তার জন্মতারিখ ১৯৮৯ সালের পয়লা জানুয়ারি। এর মানে হলো- যে সম্মেলনে মো: ইব্রাহিম ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি হয়েছেন অর্থাৎ ২০১৮ সালের ১১ মের সম্মেলনের সময় তার বয়স ছিল ২৯ বছর চার মাস ১০ দিন, যা গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্ধারিত বয়সের চেয়ে দুই বছর চার মাস ১০ দিন বেশি।এমনকি আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বিশেষ বিবেচনায় যে বয়স নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন, তার চেয়েও প্রায় এক বছর সাড়ে চার মাস বেশি। পুরোপুরি মিথ্যার মাধ্যমে ইব্রাহিম ছাত্রলীগের শীর্ষ একটি পদ বাগিয়ে নিয়েছিলেন।

তবে বাবা-মায়ের নাম পরিবর্তন করে জালিয়াতির এমন নজির সচরাচর দেখা যায় না। তাই প্রশ্ন উঠেছিল এমন ভয়াবহ মিথ্যার আশ্রয় নিয়েও কিভাবে তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের একটি বৃহৎ ছাত্রসংগঠনের শীর্ষ পদে বসে আছেন ইব্রাহিম। অভিযোগ আছে, বরিশাল বিভাগে বাড়ি ছাত্রলীগের এমন একজন কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ নেতাকে মাসোহারা দিয়ে তিনি পদ ধরে রেখেছিলেন। বরিশালে বাড়ি ওই শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধেও গঠনতন্ত্র অমান্য করে বিয়ে করার অভিযোগ আছে।

এ দিকে বয়স ও বাবা-মায়ের নাম জালিয়াতি করা ইব্রাহিমের সাথে একজন নারীর ছবি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। অবিবাহিত হিসেবে পরিচিত ছাত্রলীগ নেতার সাথে এমন ঘনিষ্ঠ অবস্থার ছবি ছড়িয়ে পড়ায় বেশ অস্বস্তিতে পড়েছেন ছাত্রসংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে শুরু করে মধ্যম সারির সব নেতা। চারদিকে প্রশ্ন উঠেছে ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সভাপতি আদৌ অবিবাহিত নাকি কমিটিতে পদ পেতে বয়স কমানোর মতো বিয়ের বিষয়েও তিনি মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছিলেন।

ওই নারী মো: ইব্রাহিমের বিয়ে করা স্ত্রী নাকি বান্ধবী তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি কেউ। তবে অসমর্থিত একটি সূত্র জানিয়েছে, ওই নারী তার বিবাহিত স্ত্রী। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, তার বাড়ি বাগেরহাট জেলার রায়েন্দা থানার তাফালবাড়ি ইউনিয়নে। যদিও ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, বিবাহিত কেউ সংগঠনটির কোনো পদে জায়গা পাবেন না। এমনকি পদে থাকা অবস্থায় বিয়ে করলে কমিটি থেকে তাকে পদত্যাগ করতে হবে। আর পদত্যাগ না করলে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বিবাহিত নেতাকে বহিষ্কার করা হবে।

ছাত্রলীগের ত্যাগী ও মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা বলছেন, ইব্রাহিমের কারণে সমাজে তাদেরকে ছোট হতে হচ্ছে, যা নিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটি ছাড়াও ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা বলছেন, ইব্রাহিম সরাসরি প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সাথে বেঈমানি করছেন।তবে এত সব জালিয়াতি করেও থামেননি ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সভাপতি ইব্রাহিম। প্রভাবশালী সাবেক ছাত্রনেতাদের আশীর্বাদপুষ্ট ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে কমিটি বাণিজ্য, ছাত্রলীগের মধ্যে সিন্ডিকেট তৈরি ও চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে।


এসব বিষয়ে ইব্রাহিমের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সব তো জানেনই ভাই। এসব বাদ দেন। এগুলো পুরনো বিষয়। কেন বারবার সামনে নিয়ে আসছেন। আমার বিরোধী পক্ষ এসব অভিযোগ সামনে এনে আমাকে হেয় প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। আমার বিরুদ্ধে এগুলো ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। মেয়েসহ অন্তরঙ্গ ছবির বিষয়ে জানতে চাইলে বিষয়টি এড়িয়ে যান ইব্রাহিম।এ বিষয়ে ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য বলেন, আমরা কোনো অভিযোগ পাইনি। যদি অভিযোগ আসে তাহলে তদন্ত করে দেখব। তবে বিবাহিতরা কেউ ছাত্রলীগে থাকতে পারবে না।