গাম্বিয়ার কাছে হারছে সূচি জিতছে রোহিঙ্গারা
কূটনৈতিক রিপোর্টার : বৈদেশিক রীতিনীতির কূটচালে গাম্বিয়ার কাছে হেরে যেতে বসেছে মিয়ানমার। রাখাইনে রোহিঙ্গা গণহত্যা প্রমাণ হতে চলেছে। গত ৩ দিনের শুনানিতে নাকাল অবস্থা মিয়ানমারের নেত্রী সূচির। তাকে ইতিমধ্যে মিথ্যাবাদী বলে সম্মোধন করা হয়েছে।এমনকি গণহত্যা বন্ধে আদেশ দাবি করেছে গাম্বিয়া। অবস্থা দৃষ্টে প্রতিয়মান হচ্ছে গাম্বিয়ার কৌশলী চালে হারছে সূচি আর জিতছে রোহিঙ্গারা।নেদারল্যান্ডসের হেগে আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে (আইসিজে) রাখাইনে রোহিঙ্গা গণহত্যা ও নিপীড়নের মামলার শুনানির তৃতীয় ও শেষ দিনে গতকাল বৃহস্পতিবার মিয়ানমারের দাবিগুলো খন্ডন করে গাম্বিয়া।
দেশটির পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী আইনমন্ত্রী আবুবকর মারি তামবাদি বলেছেন, বিরোধী আইনজীবীদের (মিয়ানমারের) বক্তব্যে কোনোভাবেই প্রমাণ হয়নি যে তারা গণহত্যায় জড়িত নয়। এ জন্য রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় আদালতের কাছে ছয়টি ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা চেয়েছে গাম্বিয়া। তাদের আইনজীবীরা বলেছেন, গণহত্যায় দায়ী সেনাদের বিচার ও সহিংসতা বন্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে মিয়ানমারের ওপর আস্থা রাখা যায় না। এ ক্ষেত্রে জরুরি ভিত্তিতে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের আদেশ দেওয়ার উপযুক্ত কর্তৃত্ব একমাত্র আন্তর্জাতিক আদালতের।
আবেদনের ওপর শুনানিতে সমাপনী বক্তব্যে আবুবকর মারি তামবাদি বলেন, রোহিঙ্গা গণহত্যা বন্ধে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়া মামলা করেছে, কারণ তারা শান্তির পক্ষে। তার দেশ ওআইসির প্রতিভূ হিসেবে মামলা করেছে এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করে তামবাদু বলেন, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবেই গাম্বিয়া এককভাবে মামলা করেছে এবং ওআইসি তাদের অনুরোধে শুধু সহায়তা দিচ্ছে।গাম্বিয়ার বক্তব্যের পর আদালত বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত মুলতবি ছিল। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত পরবর্তী অধিবেশন শুরু হয়নি। পরের অধিবেশনে মিয়ানমারের আইনজীবীরা গাম্বিয়ার আইনজীবীদের যুক্তি খ-ন করবেন।
১৯৪৮ সালের জেনেভা কনভেনশনের অধীনে গত ১১ নভেম্বর মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আইসিজেতে মামলা করে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া। শুনানির আগের দুইদিনের মতো গতকালও আদালত ভবন দ্য হেগের পিস প্যালেসের বাইরে দুই পক্ষের বিক্ষোভকারীরা জড়ো হন। মিয়ানমারের প্রতিনিধি দল আদালত প্রাঙ্গণ ছাড়ার সময় তাদের একদল ‘মা সু, সুস্থ থাকো’ এবং রোহিঙ্গাদের পক্ষে আরেক দল ‘অং সান সু চি, শেম অন ইউ’ স্লোগান দিতে থাকে।
গাম্বিয়ার পক্ষে গতকাল আদালতে তিনজন আইন বিশেষজ্ঞ মিয়ানমারের দাবিগুলো খণ্ডন করে বক্তব্য উপস্থাপন করেন। যার মূলসুর ছিল মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের প্রতি অন্যায়-অবিচারের কথা অস্বীকার করেনি। ওই সব আচরণ বা কার্যক্রমে গণহত্যার উদ্দেশ্য ছিলনা বলে মিয়ানমার যে দাবি করেছে তা বিভ্রান্তিকর এবং আন্তর্জাতিক আইনের অপব্যাখ্যা।
এর আগে গত বুধবার শুনানির দ্বিতীয় দিনে মিয়ানমারের পক্ষে দেশটির রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সু চি গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। তিনি রাখাইনে বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাস দমনে তাদের সশস্ত্রবাহিনী যদি মানবাধিকার আইন লঙ্ঘন করে থাকে তা দেশটির নিজস্ব ব্যবস্থায় বিচারের কথা বলেছেন। এছাড়া রাখাইনে কোনো প্রাণহানি ও নৃশংসতায় গণহত্যার উদ্দেশ্য প্রমাণিত হয়নি দাবি করে মিয়ানমারের আইনজীবীরা গাম্বিয়ার আবেদন খারিজের দাবি জানান।
গতকাল নেদারল্যান্ডস সময় সকাল ১০টায় আদালতের প্রেসিডেন্ট ইউসুফের সভাপতিত্বে শুনানি শুরু হলে গাম্বিয়ার পক্ষে তাদের কৌঁসুলি পল রাইখলার বলেন, মিয়ানমার অপরাধের কথা অস্বীকার করেনি। এছাড়া দেশটির আইনজীবীরা জাতিসংঘ তদন্তকারীদের প্রতিবেদনের উপসংহারগুলোও নাকচ করেননি। সেইসঙ্গে দেশটির প্রতিনিধি অং সান সু চি বলেছেন, সামরিক বাহিনীর কেউ কেউ অপরাধ করে থাকতে পারেন, সে জন্যে তাদের বিচার হবে। তাদের আপত্তি প্রধানত দুটো। মিয়ানমার মূলত রোহিঙ্গাদের প্রতি আচরণে গণহত্যার উদ্দেশ্য অস্বীকার করেছে। দ্বিতীয়ত তারা দাবি করেছে, গণহত্যার উদ্দেশ্য অনুমান করা হলেও তার ভিত্তিতে অন্তর্বর্তী আদেশ দেওয়া যায় না।
রাইখলার বলেন, মিয়ানমারের আইনজীবী অধ্যাপক সাবাস গণহত্যার উদ্দেশ্য প্রমাণের জন্য সাতটি নির্দেশক থাকা আবশ্যক বলে দাবি করেছেন। সেই সাতটি নির্দেশকের কথা গাম্বিয়ার আবেদনে রয়েছে এবং মিয়ানমার সেগুলো অস্বীকার করেনি। তারপরও বলা হচ্ছে নৃশংসতায় গণহত্যার উদ্দেশ্য ছিল না। রাইখলার এসব নির্দেশক বা লক্ষণগুলো একে একে তুলে ধরে প্রত্যেকটি বিষয়ে মিয়ানমারের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন, তারা এগুলোর কোনোটিই অস্বীকার করেনি। এ সময় রাইখলার রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ানোর নীতি অনুসরণের বিভিন্ন নজির তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আদালত নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন সু চি আদালতে রোহিঙ্গা বিশেষণটি ব্যবহার করেননি। শুধু বিচ্ছিন্নতাবাদী আরসা গোষ্ঠীর কথা বলার সময় ছাড়া তিনি তাদের মুসলিম হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের প্রত্যাবাসন বিষয়ে মিয়ানমারের বক্তব্যকে প্রতারণা অভিহিত করে রাইখলার বলেন, তারা নিজেরাই স্বীকার করেছে যে খুব সামান্যসংখ্যক রোহিঙ্গা দেশে ফিরেছে। মিয়ানমারের আইনজীবী মিস ওকোয়া প্রত্যাবাসনের বিষয়ে বাংলাদেশের আগ্রহ এবং চীন, জাপান ও ভারতের সহায়তার বিষয়টিকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। বাংলাদেশ বলেছে, মিয়ানমার প্রত্যাবাসনের জন্য কিছুই করেনি। তবে চীন, জাপান ও ভারত সহায়তার যে প্রস্তাব দিয়েছে সেজন্য তাদের ধন্যবাদ প্রাপ্য। কিন্তু প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরির দায়িত্ব মিয়ানমারের। তারা সেটি পালনে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি এ ক্ষেত্রে গত নভেম্বরে বাংলাদেশের দেওয়া বিবৃতি থেকে উদ্ধৃত করে বলেন, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদার সঙ্গে ফেরার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রে কিছুই করেনি।
এরপর গাম্বিয়ার পক্ষে আইনজীবী পিঁয়ের দ্য আর্জেন বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, গাম্বিয়া স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে এই মামলা করেছে। গাম্বিয়া ওআইসির ছায়া হিসেবে মামলা করেনি। ওআইসি এবং অন্য সংস্থার সাহায্য গাম্বিয়া চাইতেই পারে। সুতরাং বলা যাবে না যে ওআইসি এই মামলার আবেদনকারী।তিনি বলেন, গাম্বিয়া ওআইসি মন্ত্রিসভা কমিটির সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর মামলা করেছে বলে মিয়ানমারের আইনজীবী স্টকারের দাবি বিভ্রান্তিকর। মিয়ানমারের সঙ্গে বিরোধ গাম্বিয়ার, ওআইসির নয়। গাম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট জাতিসংঘে গণহত্যার কথা বলেননি বলে যুক্তি দিয়ে দাবি করা হয়েছে, ওআইসির সিদ্ধান্তের পরই গাম্বিয়া মামলা করেছে, কথাটি ঠিক নয়।
গাম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট জাতিসংঘে বক্তব্য দেওয়ার পর জাতিসংঘ তদন্ত কমিটির রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে এবং সেই রিপোর্টের তথ্যের ভিত্তিতেই গণহত্যার অভিযোগ নিয়ে গাম্বিয়া আদালতে আসার সিদ্ধান্ত নেয়।পিয়েঁর দ্য আর্জেন মিয়ানমারের আইনজীবী স্টকারকে উদ্ধৃত করে বলেন, তিনি (স্টকার) দাবি করেছেন রাখাইনে কোনো অপরাধ যদি ঘটেও থাকে তারপরেও গাম্বিয়ার সে বিষয়ে মামলা করার অধিকার নেই। স্টকারের এসব বক্তব্য সঠিক নয়। গাম্বিয়া সনদের স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে সনদ লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদনের অধিকার রাখে।
অধ্যাপক ফিলিপ স্যান্ডস গাম্বিয়ার পক্ষে দাঁড়িয়ে বলেন, মিয়ানমার ১৯৪৮ সালের গণহত্যা সনদের বাধ্যবাধকতা পূরণ করছে কিনা সে প্রশ্ন তোলার অধিকার গাম্বিয়ার অবশ্যই রয়েছে। এ বিষয়ে তিনি অতীতের রায়ের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক সনদের অংশীদার হিসেবে অন্তর্বর্তী আদেশের আবেদন করার অধিকার তাদের রয়েছে।অধ্যাপক ফিলিপ স্যান্ডস বলেন, গণহত্যার উদ্দেশ্য সম্পর্কে মিয়ানমারের আইনজীবী অধ্যাপক সাবাস একটি নতুন আইনগত মান নির্ধারণ করার চেষ্টা করেছেন, যেটি পরীক্ষিত নয়। কিছু কিছু কার্যক্রম গণহত্যা নির্দেশিকার ধারণা তৈরি করলেও সব কার্যক্রম গণহত্যার ধারণা প্রমাণ করে না এমন দাবি ঠিক নয়।
অধ্যাপক স্যান্ডস আরও বলেন, বসনিয়ায় আদেশ দেওয়ার পরও সেব্রেনিৎসায় যে গণহত্যা হয়েছিল সেই দৃষ্টান্ত দিয়েই আমরা বলেছি সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা কেন প্রয়োজন এবং তার বাস্তবায়নের সময় বেঁধে দেওয়া জরুরি।গাম্বিয়ার পক্ষে শুনানিতে সর্বশেষ বক্তব্য দেন দেশটির প্রতিনিধি আইনমন্ত্রী আবুবকর তামবাদু। তিনি বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের জীবন হুমকির মুখে। গাম্বিয়া প্রতিবেশী নাও হতে পারে, কিন্তু গণহত্যা সনদের স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে রাখাইনে গণহত্যা বন্ধ এবং তা প্রতিরোধে আমাদের দায়িত্ব রয়েছে।



