কোরবানীর গরু’ ছাগলের হাহাকার!

লাবণ্য চৌধুরী : অবিশ্বাস্যভাবে রাজধানীর পশুর হাটের পশু বিক্রি প্রায় শেষ হতে চলেছে। রাজধানীর সবচেয়ে বড় গাবতলী হাটেও গরু ছাগলের হাহাকার অবস্থা।একই অবস্থায় নগরীর ১৭টি পশুর হাট’ও প্রায় শূণ্য। কোরবানির হাটগুলোতে পশু সংকট দেখা দিয়েছে। নগরীর অধিকাংশ হাট এরইমধ্যে ফাঁকা হয়ে গেছে। চাহিদার তুলনায় ছোট ও মাঝারি সাইজের গরু কম থাকায় অতিরিক্ত দামে পশু কিনতে হচ্ছে ক্রেতাদের।
এবার এই সঙ্কটে ক্রেতাদের ভরসার স্থল অনলাইন পশুর হাট। চলছে দেদারছে বেচাবিক্রি। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন বিভিন্ন মাধ্যম মিলে ইতোমধ্যে প্রায় ২৭ হাজার গরু ছাগল ও অন্যান্য কোরবানির পশু অনলাইনে বিক্রি হয়েছে। অনলাইন থেকে ছবি দেখে কৃষকের বাড়িতে এসে বা খামারে এসে ক্রেতারা যে পরিমাণ গরু ক্রয় করেছেন, তার সংখ্যা হবে এর তিন থেকে চারগুণ। শুক্রবার (৩১ জুলাই) ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ও ই-কমার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এর এক যৌথ অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানানো হয়।
রাজধানীর ১৭টি পশুর হাটে বৃহস্পতিবার দুপুরের পর থেকেই বিক্রি বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে রাত থেকেই কোরবানির পশু কমতে শুরু করে। মধ্যরাতের পর হাটগুলো একেবারে ফাঁকা হয়ে যায়। যারা ভেবে রেখেছিলেন সকালে হাটে গিয়ে কোরবানির পশু কিনবেন, তারা হাটে গিয়ে বিপাকে পড়েন। সকাল ৮টার পর হু হু করে বাকি পশুগুলো চড়া মূল্যে বিক্রি হয়ে যায়। সকালে রাজধানীর শনিরআখড়া, কমলাপুর, শাজাহানপুর ও আফতাবনগর হাটে গিয়ে দেখা গেছে গরুর চেয়ে ক্রেতার সংখ্যা অনেক বেশি। বেপারীরা ইচ্ছেমতো দাম হাঁকছেন। ক্রেতারা নিরুপায় হয়ে চড়া দামেই পশু কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
গরু না থাকায় খিলগাঁও রেলগেট সংলগ্ন হাটটি পরিষ্কারের কাজ করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। সকালের মধ্যে মূল হাটের বাঁশ খুঁটি অপসারণ করা হয়েছে। ইজারাদার জানিয়েছেন, গরু না থাকায় হাসিল ঘরে তারা অলস সময় কাটাচ্ছেন। এ কারণে এ বছর তাদের লোকসানে পড়তে হবে।মেরাদিয়া হাটেও দেখা গেছে একই চিত্র। এই হাটও সকালের মধ্যে অনেকটাই ফাঁকা হয়ে গেছে। ক্রেতারা ঘুরে বেড়াচ্ছেন। দাম একটু বেশি হলেও তারা গরু কেনার চেষ্টা করছেন। আর বিক্রেতারা গরু ছাড়তে চাচ্ছেন না। হাটে পর্যাপ্ত গরু না থাকায় বিক্রেতারা অপেক্ষাকৃত বেশি দাম চেয়ে বসে আছেন।
শুক্রবার (৩১ জুলাই) সকালে খিলগাঁও রেলগেট সংলগ্ন মৈত্রী সংঘের খেলার মাঠে গিয়ে দেখা গেছে, পুরো মাঠ ফাঁকা। মাঠে কোরবানির পশু নেই। তবে মাঠ সংলগ্ন প্রথম সড়কে কয়েকটি ছোট আকারের গরু দেখা গেছে। ক্রেতারা জানিয়েছেন, হাটে গরু নেই। যে কয়েকটি আছে তারও দাম অনেক চড়া। দাম নাগালের বাইরে থাকায় অনেকেই এখনও কোরবানির পশু কিনতে পারেননি।
সরেজমিনে শনিরআখড়া হাটে গিয়ে দেখা গেছে, একটা গরুর জন্য কমপক্ষে ২০জন ক্রেতা দরদাম করছেন। এই সুযোগে বৃহস্পতিবারেও যে গরুর দাম হাঁকা হয়েছিল ৭০ হাজার একই সাইজের গরু আজ দাম হাঁকা হচ্ছে ১ লাখ বা তারও বেশি।
পশুর হাটের এই সঙ্কটে অনেকে অনলাইনের শরনাপন্ন হন। একটার পর একটা অর্ডার করতে থাকেন। তবে ব্যাংক বন্ধ থাকায় ক্রেতাদেরকে সশরীরে উপস্থিত হয়ে টাকা পেমেন্ট করতে ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। অনেক ক্রেতা আবার বুকিং দিয়েই পছন্দের পশু পাননি বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে, আজ শুক্রবার ঢাকা উত্তর কর্পোরেশন এবং ই-কমার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এর আয়োজনে কোরবানি পশু বিক্রির অনলাইন প্লাটফর্ম ‘ডিজিটাল হাট’ ও সারাদেশে অনলাইনে গরু ক্রয় বিক্রয় সংক্রান্ত বিষয়ে গণমাধ্যমকে অবহিত করতে এই অনলাইন সংবাদ সম্মেলন এর আয়োজন করা হয়।সংবাদ সম্মেলনে তথ্য উপস্থাপন করে জানানো হয়, সারাদেশে শুক্রবার (৩১ জুলাই) পর্যন্ত ২৭ হাজার কোরবানির পশু অনলাইনে বিক্রি হয়েছে। ডিজিটাল হাট, ডিজিটাল হাটের সাথে সম্পৃক্ত মার্চেন্ট ও ই-ক্যাব মেম্বারদের অনলাইনে বিক্রিত গরু, ছাগল ও ভেড়ার সংখ্যা ৬হাজার ৮শ।
জেলাভিত্তিক সরকারী প্লাটফরম কমপক্ষে ৫ হাজার ৫শ গরু-ছাগল বিক্রির কথা জানা গিয়েছে। এর মধ্যে নরসিংদী জেলা এগিয়ে রয়েছে। এই জেলায় সরকারী অনলাইন প্লাটফর্মে পশু বিক্রি হয়েছে ৫১৭টি। বাংলাদেশ ডেইরী ফার্ম এসোসিয়েশন এর সদস্যভূক্ত কোম্পানীর অনলাইন ফ্লাটফর্ম থেকে বিক্রিত পশু ৯ হাজার ৫শর কাছাকাছি। বিচ্ছিন্ন অন্যান্য প্লাটফর্ম থেকে ৫ শতাধিক গরু বিক্রির ধারণা পাওয়া গিয়েছে। সরকারী প্লাটফরম ফুড ফর ন্যাশন ৪০০০ গরু বিক্রি ট্র্যাক করতে পেরেছে। এভাবে পুরো অনলাইন বাজারে প্রত্যক্ষ বিক্রিত পশুর সংখ্যা বের হয়ে আসছে। ধারণা করা হয় আরো লাখখানেক কোরবানির পরোক্ষভাবে এবারের বিভিন্নভাবে অনলাইন শপ থেকে বিক্রি করা হয়েছে। এবং অন্তত পাঁচলাখ গরু ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্লাটফর্মে প্রদর্শিত হয়েছে।
ডিজিটাল হাট সম্পর্কে ডিএনসিসির মেয়র জনাব আতিকুল ইসলাম বলেন, এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল করতে গিয়ে ডিএনসিসি, আইসিটি ডিভিশন ই-ক্যাব, আইএসএসএল, ধানসিড়ি ও সাদিক এগ্রোর সম্মিলিত টিমকে রাতদিন পরিশ্রম করতে হয়েছে। নানা ধরনের জটিল ইস্যু ছিল এগুলো তারা আন্তরিকতার সাথে সমাধান করেছে। ৪শ গরু ক্যাটারিং করার ব্যবস্থাপনা আমি নিজে তদারক করছি। তিনি ঈদের দিন ক্যাটারিং হাউজে গিয়ে স্বশরীরে পুরো ব্যাপারটা দেখভাল করব। তিনি নগরবাসীর প্রতি উদাত্ত আহবান জানান, তারা যেন যেখানে সেখানে গরু জবাই না করেন এবং গরুর বর্জ্য অপসারণে সিটি কর্পোরেশনকে সহযোগিতা করেন।
এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পুরো বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ঈদের ছুটির মধ্যে ১১ হাজার কর্মী তৎপর থাকবে।প্রধানমন্ত্রীর বরাত দিয়ে মেয়র বলেন, আমাদের এই উদ্যোগে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত খুশি হয়েছেন। গরু জবাই করে মাংস ৪ কেজির প্যাকেটে করে বাসায় পাঠিয়ে দেয়ার এই প্রচেষ্টাকে প্রধানমন্ত্রী সাধুবাদ জানিয়েছেন।মেয়র ডিজিটাল হাটের সাথে সম্পৃক্ত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, আইসিটি মন্ত্রণালয়, প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, ই-ক্যাব, ডেইরী ফার্ম এসোসিয়েশন, দারাজ, নগদ, মাস্টারকার্ডসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানান।
বাংলাদেশ ডেইরী ফার্ম এসোসিয়েশন এর প্রেসিন্টে জনাব মোহাম্মদ ইমরান হোসেন বলেন, এই বিশাল কর্মযজ্ঞে ধাপে ধাপে মান বজায় রাখতে হয়েছে। বিশেষ করে নতুন করে যেহেতু ক্রেতাদের এই অনলাইন ব্যবস্থায় অভ্যাস করার জন্য তাদের সন্তুষ্টিকে আমরা প্রাধান্য দিয়েছি। কারণ তারা নতুন এই প্লাটফর্মের উপর আস্থা রেখেছেন।
ই-ক্যাবের জেনারেল সেক্রেটারী জনাব মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহেদ তমাল বলেন, পুরো প্রক্রিয়াকে সঠিকভাবে সম্পন্ন করার জন্য প্রতিটি ধাপে আমাদেরকে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে হয়েছে। সঠিক গরু এসেছে কিনা? ওজন ঠিক আছে কিনা? গরুর কোনো রোগ আছে কিনা? ক্রেতা বা খামারিরা পেমেন্ট পেল কিনা? প্রতিটি ধাপে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করে আমাদের এগিয়ে যেতে হয়েছে।
এটুআই এর হেড অব ই-কমার্স জনাব রেজওয়ানুল হক জামি বলেন, এত অল্প সময়ের মধ্যে এরকম একটি প্লাটফরম তৈরী করে সেখানে শ’খানেক উদ্যোক্তাকে সংযুক্ত করে দেশব্যাপী সচেতনতা সৃষ্টি করে ২৭ হাজার গরু অনলাইনের মাধ্যমে ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেয়ার এই কাজ ই-কমার্সের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।
যাচাই ডট কম-এর সিইও জনাব আজিজুল হক বলেন, আমরা অনলাইনে ২৩৭ টি গরু বিক্রি করেছি। আরো কিছু ক্রেতা রয়েছেন যারা অনলাইনে ছবি দেখে খামারে এসে গরু নিয়েছেন। ডিএনসিসি’র ডিজিটাল হাট ক্রেতা-বিক্রেতার আস্থা তৈরীতে যে ভূমিকা রেখেছে তার ফল সবাই ভোগ করেছে।
আজকের ডিল-এর সিইও জনাব ফাহিম মাশরুর বলেন, করোনা মহামারী পরিস্থিতিতে এই ধরনের উদ্যোগ সবার জন্য সুফল নিয়ে এসেছে। এখানে বিক্রির সংখ্যার চেয়ে ক্রেতাদের আস্থাটাই বড়ো কথা। ভবিষ্যতে এই আস্থা আরো বৃদ্ধি পাবে।
রেইন ফরেস্ট-এর সিইও জাহিদুজ্জামান সাইদ বলেন, আমরা প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকের গরু অনলাইনের মাধ্যমে দূরের বা শহরের ক্রেতার কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছি। এটাই এই উদ্যোগের সবচেয়ে ভাল দিক। প্রযুক্তি হাজারো গ্রামীণ খামারীকেও এই প্লাটফর্মের সাথে যুক্ত করে দিয়েছে।
ডেলিভারী পার্টনার ই-কুরিয়ারের সিইও জনাব বিপ্লব রাহুল বলেন, গরু জবাই হওয়া মাংস প্যাকিং হওয়ার ২ ঘন্টার মধ্যে আমরা ক্রেতাদের ঠিকানায় পৌঁছে দেব। আমাদের গাড়ীতে আইসবক্স থাকবে যাতে মাংস ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।



