কৃষকরা আমের দাম পাচ্ছেনা কেন?
লাবণ্য চৌধুরী : কিনতে গেলে আমের দাম চড়া হলেও আমের পাইকারী বাজারে দাম পাচ্ছেননা কৃষকরা। দেশের বিভিন্ন জেলার
আম চাষীরা অভিযোগ করেছেন, তারা এবার ভাল ফলন পেলেও আম বিক্রিকালে দাম পাচ্ছেন না। সরেজমিনে জানা গেছে, রাজশাহী ও সাতক্ষীরার মতোই আম নিয়ে বিপদে আছেন সারা দেশের চাষী ও ব্যবসায়ী।
অনেক চাষী বলেছেন, আম পাড়ার সময় বেঁধে দেয়াটা কাল হিসেবে দেখা দিয়েছে।দেশে ৪৫ প্রজাতির আম রয়েছে।জনপ্রিয়তায় সবচেয়ে এগিয়ে আছে ল্যাংড়া, ফজলি, ক্ষীরসাপাতি (গোপালভোগ), হিমসাগর, লক্ষ্মণভোগ, মোহনভোগ, গোপালভোগ, বোম্বাই জাত।তবে এখন নতুন যোগ হয়েছে আম্রপালি ও মল্লিকা দিনাজপুরের সূর্যপুরী।
জানা গেছে এবার দেশে প্রায় ৩৫ হাজার হেক্টর জমিতে আমের উৎপাদন হলেও সবচেয়ে বেশি আবাদ হচ্ছে বৃহত্তর রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। এছাড়া সাতক্ষীরা, মেহেরপুর, রংপুর, দিনাজপুর জেলায়ও আমের আবাদ বেড়েছে।
রাজশাহী সদরের আম ব্যবসায়ী মো. সাইফুল জানান, এবার ৪০ বিঘা জমিতে প্রায় সাত প্রজাতির আমের বাগান করেন তিনি।
রফতানির উদ্দেশ্যে অনুসরণ করেছেন ব্যাগিং পদ্ধতিও। তবে রফতানি করতে পারেননি। মৌসুমের শুরুতে গোপালভোগ আমের কিছুটা দাম পেলেও এখন কোনো আমই বিক্রি করতে পারছেন না। ঈদের পর ৪৪০ কেজি ক্ষীরসাপাতি আম পাড়লেও বিক্রি করতে পেরেছেন মাত্র ১০০ কেজি। ক্রেতার অভাবে বাকি আম স্থানীয় বাজারে দাম ছাড়াই এক প্রকার ছেড়ে দিয়েছেন।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার আমবাগান মালিক করিম চৌধুরী বলেন, চলতি মৌসুমে ২৫ বিঘা জমিতে আমের বাগান তার। দুই বছর আগে প্রতি কেজি হিমসাগর আম ৭০ টাকায় বিক্রি করলেও এবার পেয়েছেন ৪০ টাকারও কম। আম্রপালির দাম পেয়েছেন আরো কম, প্রতি কেজি মাত্র ২৫ টাকা। যদিও ২৫ বিঘা জমির লিজ, উৎপাদন, পরিবহন, পরিচর্যা ও শ্রমিক বাবদ প্রায় ১৩ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। ৮০ শতাংশ আম বিক্রি করে ৭ লাখ টাকার মতো ঘরে তুলতে পেরেছেন। অবশিষ্ট আম বিক্রি করে আসতে পারে বড়জোর ১ লাখ টাকা। ফলে চলতি মৌসুমে ৪-৫ লাখ টাকা লোকসানে পড়ার আশঙ্কায় আছেন এ আমচাষী।
রাজশাহী মোকামের আড়তদার সাইফুল ইসলাম জাতিরকন্ঠকে জানান, বরাবরই এখানে বাইরে থেকে ব্যাপারীরা আম কিনতে আসেন। এবারো এলেও সংখ্যাটা খুবই কম। গত বছরের তুলনায় অর্ধেকেরও কম ব্যবসায়ী এসেছেন রাজশাহী অঞ্চলের বাজারগুলোয়। ক্রেতা না থাকায় আম নিয়ে চরম বিপাকে আছেন এখানকার কৃষক, বাগান মালিক ও আড়তদাররা। গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন দামে আম বিক্রি হচ্ছে। গত মৌসুমের অর্ধেক দামও মিলছে না।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটেও একই অবস্থা। আম ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড সূত্রে জানা গেছে, গত মৌসুমে গাছ থেকেই হিমসাগর মণপ্রতি ২ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছিল। ল্যাংড়া বিক্রি হয়েছিল ২ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকায়। এবার অর্ধেক দামেও বিকোচ্ছে না। রাজধানীতে আম নিয়ে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হওয়ার কারণে ব্যবসায়ীরা আসছেন না। ফলে স্থানীয় বাজারগুলো অনেকটাই ক্রেতাশূন্য। জমেনি কানসাটের আমের বাজারও।
কানসাট মোকাম থেকে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে নিয়মিত আম সরবরাহ করেন সেখানকার বাসিন্দা কবির । তার মতে, রকমভেদে ২৫ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে আম বিক্রি করতে হচ্ছে। পরিবহন খরচ যোগ করে আমে এবার লাভ হচ্ছে না বললেই চলে। তার পরও বাধ্য হয়ে দীর্ঘদিনের এ ব্যবসা চালিয়ে নিতে হচ্ছে।
হাঁড়িভাঙ্গা আমের জন্য বিশেষ পরিচিতি রয়েছে রংপুরের। সপ্তাহখানেক আগে স্থানীয় বাজারে এ জাতের আম ওঠা শুরু হলেও ক্রেতাদের উপস্থিতি নগণ্য। ফলে কম দামেই আম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন বাগান মালিকরা। ঈদের আগে ও পরে পরিবহন বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীরা রংপুরের বাইরে আম পাঠাতে পারেননি। সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় অনেকটা পানির দরেই আম বিক্রি করছেন তারা।
আমের হাট ঘুরে দেখা যায়, প্রতি মণ আম বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায়। একই আম গত বছর এ সময় বিক্রি হয়েছিল ২ হাজার ৫০০ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকায়। নীলকণ্ঠের আম ব্যবসায়ী রাজ্জাক মিয়া জানান, এ বছর ১১ লাখ টাকায় ছয়টি বাগান লিজ নিয়েছিলাম। গত বছর ১১ লাখ টাকায় সাতটি বাগান নিয়েছিলাম। সে বছর সব খরচ বাদে মুনাফা হয়েছিল দেড় লাখ টাকার মতো। আমের দাম না থাকায় এবার আর তা হবে না বলেই মনে হচ্ছে। তার পরও আশায় আছি— দাম যদি কিছুটা বাড়ে।
রংপুর কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এবার রংপুর জেলায় ৩ হাজার ৫ হেক্টর জমিতে আমের ফলন হয়েছে। এর মধ্যে হাঁড়িভাঙ্গার আবাদ হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬০০ হেক্টরে। ফলনও ভালো হয়েছে। এ বছর হাঁড়িভাঙ্গার উৎপাদন আশা করা হচ্ছে ২০ হাজার টনের উপরে। গত বছর জেলায় এ জাতের আম পাওয়া গিয়েছিল ১৬ হাজার টনের কাছাকাছি।
ওদিকে মেহেরপুরের ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত বছর প্রতি মণ আম ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হলেও এবার ১ হাজার ২০০ টাকার বেশি দাম পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতি বছর বাইরে থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে আম কিনতে এলেও এবার আসেননি। আম পাড়ার সময় প্রায় কাছাকাছি নির্ধারণ করায় সরবরাহ বেড়ে গেছে, যা আমের দাম আরো কমিয়ে দিচ্ছে।



