কামালের হুংকার-পালানোর পথ পাবেননা
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি : জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম প্রধান নেতা ড. কামাল হোসেন বলেছেন, জনগণ জেগে উঠেছে, আওয়ামী লীগ সরকার আর পালানোর পথ পাবে না। জনগণ সকল ক্ষমতার মালিক সেটা তারা বেমালুম ভুলে গেছে। আর এই বাংলাদেশ কারও পৈত্রিক সম্পত্তি নয়, এই দেশের মালিক জনগণ। তাই জনগণের দাবি মেনে নিতে হবে।শনিবার বিকালে চট্টগ্রামের কাজির দেউড়িতে অবস্থিত মহানগর বিএনপির কার্যালয় নসিমন ভবনের সামনে আয়োজিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দ্বিতীয় সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, আপনারা সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন, আপনাদের শাস্তি পেতেই হবে। জনগণকে কষ্ট দিচ্ছে কারা, কারা লালদীঘি মাঠে সমাবেশের অনুমতি দিতে দেয় নাই তাদের খুঁজে বের করা হবে। তখন এই সব কিছুর কৈফিয়ত দিতে হবে। সংবিধানে করা শপথ যারা ভঙ্গ করেছে, সেই শপথ ভঙ্গের জবাব দিতে হবে। আমি বেঁচে থাকলে এর বিরুদ্ধে মামলা করে এর জবাব নেবো। স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার, ভোটের অধিকার সবাই চায়। তাই সাত দফা ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট করা হয়েছে। এ সাত দফা অমান্য করলে যে শাস্তি পাবেন তা কল্পনাও করতে পারবেন না। এই সাতদফা আদায় না হলে ঐক্যফ্রন্ট ঘরে ফিরবে না। এটা গণমানুষের দাবি।
বাংলাদেশের প্রথম এই আইনমন্ত্রী আরও বলেন, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধান ভঙ্গ করেছে। এর জবাব দিতে হবে। শাস্তি পেতে হবে এদেরকে। সময় থাকতে মেনে নিন, না হয় জনগণ পালানোর সেই সুযোগও দেবে না। সিলেটের মানুষ জেগেছে, চট্টগ্রামের মানুষ জেগেছ, এভাবে একদিন সারাদেশের মানুষ জেগে উঠবে। সেই দিনই এই সরকারের পতন ঘটবে।
ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘যারা আমাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, অপরাধ করে—তারা মনে করে, পার তো পেয়ে গেছি। এখন কে আমাদের বিচার করবে? ইনশাআল্লাহ, এবার ন্যূনতম যেটা আমাদের দাবি, যে সাত দফা দাবি এগুলো সময় থাকতে মেনে নিন। কিন্তু, এটা অমান্য করলে বিচার হবে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হয়নি। ওই নির্বাচন সংবিধানবিরোধী হয়েছে। ২০১৪ সাল থেকে সংবিধান লঙ্ঘন করার জবাবদিহিতা, সেটাও জনগণ আপনাদের থেকে আদায় করবে।’
সিলেটে গণরায় হয়েছে উল্লেখ করে উপস্থিত জনতার উদ্দেশে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘আজকে আপনারা জানিয়ে দিন, যারা ক্ষমতা আকড়িয়ে বসে আছে তাদের। হাত উঁচু করে বলুন, আপনারা সাত দফার পক্ষে আছেন কি না। আপনার রায় দিয়েছেন, এখানেও গণরায় হয়ে গেছে। এরপর আমরা রাজশাহীতে যাবো, শেষে ঢাকায় এটাকে আমরা সম্পন্ন করবো। এবার জনগণ যখন ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। আপনারা জেনে রাখুন, এই চিটাগং থেকে জনসভা করে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। অর্থাৎ এটা অসম্ভব না। এটা সম্ভব।’
এ বক্তব্যেও ঐক্যফ্রন্টের পক্ষের দাবি ও দেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার সময় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবির কথা তিনি শুরুতে বলেননি। এ সময় পাশ থেকে এক নেতা তাকে বিষয়টি মনে করিয়ে দিলে তিনি বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি চাওয়ার ব্যাপার নয়, এটা তো হওয়ার ব্যাপার। এটা আর কত চাওয়া হবে। চাইতে চাইতে তো মানুষ ক্লান্ত হয়ে গেছে। ওর মুক্তি অবশ্যই হোক।’উল্লেখ্য, এর আগে গত ২৪ অক্টোবর সিলেটে প্রথম সমাবেশ করে ঐক্যফ্রন্ট। সেখানেও জনসভার শেষদিকে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে অপর এক নেতা মনে করিয়ে দিলে, খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি তো সাত দফার মধ্যেই আছে বলে মন্তব্য করেন ড. কামাল হোসেন।
জনসভায় প্রধান বক্তা ছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, জনগণ যদি ভোট দিতে পারে তা হলে আর কেউ ভাঙা নৌকায় উঠবে না। একটি স্বাধীন দেশে জনসভা হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সরকার এখন ভয় পেয়েছে। তাই জনসভা করতে দিচ্ছে না। এসময় তিনি প্রশ্ন ছুড়ে দেন ‘সরকারের কেন এত ভয়?’
এসময় তিনি আরও বলেন, ‘মামলা অনেক হয়েছে, গায়েবি মামলা অনেক দিয়েছেন। কিন্তু সাত দফা দাবি আদায় না করে আমরা ঘরে ফিরবো না। নিজেরা নাশকতা-সহিংসতা করে উল্টো বিরোধীদলের ওপর দোষ দেন। আমরা অন্যায়ের কাছে মাথানত করবো না।সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন আ স ম আব্দুর রব। সরকার এখন একঘরে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সোজা আঙ্গুলে ঘি না উঠলে আঙ্গুল বাঁকা করতে হবে। সারা দেশে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। পায়ের তলায় মাটি এখন নড়বড়ে হয়ে গেছে তাই সরকার নির্বাচন দিতে উঠে পড়ে লেগেছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, গণতন্ত্র এখন আওয়ামী লীগ সরকারের বাক্সবন্দি। খালেদা জিয়াই এদেশে সর্বদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে অতি শীঘ্রই নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন। বর্তমান সরকার বিএনপির যৌক্তিক দাবিগুলোকে ভয় পায়।আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করতে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ নেতারা যা করছে না প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিরা তা করছে। আপনাদেরও জনগণের আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।
ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বলেন, ‘স্বাধীনতা ৪৭ বছর পরও আমরা ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। দেশে যে নৈরাজ্য সৃষ্টি হবে তার জন্য দায়ী সরকার। আমরা এখন গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হারিয়েছি, কথা বলার স্বাধীনতা হারিয়েছি , এ থেকে মুক্তির একমাত্র পথ জাতীয় ঐক্য।’গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ বলেন, আপনারা লাল দিঘির ময়দানে জনসভা করতে দিতে ভয় পান। বন্দর চট্টগ্রামে কিন্তু বন্দরের অফিস কেন ঢাকায়? শাহজাহান কি চট্টগ্রামে আসতে ভয় পান? সরকারের বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে আরও উন্নত করা হবে।
তিনি আরও বলেন, ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে যে ঐক্য গঠন করা হয়েছে তাতে সকলকে একমত হতে হবে। এসময় বি. চৌধুরী আবারও ঐক্যফ্রন্টে যোগ দেবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, আমাদের ভিন্ন মতাদর্শ থাকতে পারে কিন্তু লক্ষ এক। আমরা সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবো। সভায় আরও বলা হয়, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট শুধু জাতীয় স্বার্থে কাজ করবে, কোনও ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়।
সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আবদুল মঈন খান, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, গণফোরামের সদস্য সচিব মোস্তাফা মহসিন মন্টু, ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মো. মনসুর, কল্যাণ পার্টি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মো. ইব্রাহিম, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, জেএসডির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন, নাগরিক ঐক্য সদস্য সচিব মোস্তাফা আমিন, এলডিপি মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহম্মেদ, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু।সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন মহানগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন।
এর আগে দুপুর থেকে চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে মিছিল নিয়ে নেতাকর্মীরা সমাবেশে যোগ দিতে থাকে। দুপুর ১টার আগেই মূল সমাবেশ শুরু হয়। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের এই সমাবেশকে কেন্দ্র করে কাজির দেউরি এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করেছে পুলিশ। সমাবেশকে ঘিরে ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
সমাবেশ শুরুর আগে সকাল ১০টায় গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ ঐক্যফ্রন্টের নেতারা চট্টগ্রাম পৌঁছান। এরপর তারা হজরত শাহ আমানত (রহ.) এর মাজার জিয়ারত করেন।



