‘করোনা যুদ্ধে একযোগে কাজ চাই’

অধ্যাপক ডা. রিদওয়ানুর রহমান : বাংলাদেশে বর্তমানে করোনাভাইরাসের লিমিটেড কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হচ্ছে। লকডাউন করার কারণেই এটি এখনও লিমিটেড (নিয়ন্ত্রিত) আছে। তবে ঘনবসতিপূর্ণ ছোট এ দেশে গত ৩-৪ দিনে যেহেতু এক কোটির মতো মানুষ ঢাকার বাইরে গেছে তাই আশঙ্কা আছে এটি লিমিটেড না থেকে আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে।কিছু কিছু এলাকায় রোগ ও রোগীর সংখ্যা বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী তাৎক্ষণিকভাবে ওই এলাকায় রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা বা টেস্ট কিট বাড়াতে হবে; রোগীদের কোয়ারেন্টিন ও আইসোলেশনের ব্যবস্থা করতে হবে; সর্বোপরি ফিল্ড হাসপাতাল তৈরি করে চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য জনবল বাড়াতে হবে।
টেস্ট কিটের বর্তমানে যেহেতু স্বল্পতা আছে তাই প্রয়োজন ও প্রায়োরিটি দিয়ে এর সরবরাহ করতে হবে। সারাবিশ্বেই টেস্ট কিটের স্বল্পতা রয়েছে, তাই টেস্ট কিটের সংখ্যা বাড়ানোও রাতারাতি সম্ভব নয়।আইইডিসিআরের বর্তমান পলিসি অনুযায়ী হাসপাতালে ভর্তি সিরিয়াস রোগীদের এই টেস্ট কিটের মাধ্যমে করোনাভাইরাস শনাক্ত করে প্রয়োজনমাফিক চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হবে।
যেহেতু আমাদের ক্যাপাসিটি লিমিটেড, আমেরিকার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য তাই টেলিমেডিসিন সেবার ব্যাপক বিস্তৃতির মাধ্যমে এই কমিউনিটি ট্রান্সমিশন আমরা লিমিটেড রাখতে পারব। মনে রাখতে হবে রোগ ট্রান্সমিশন যদি ব্যাপক হয় তবে আমাদের দেশে মৃত্যুহার বাড়বে যা হয়তো অন্যান্য দেশকেও ছাড়িয়ে যাবে।রোগ শনাক্তকরণ বা ট্রান্সমিশন যদি বাড়তে থাকে তবে লকডাউনের সময়সীমা দুটি ইনকিউবেশন পিরিয়ড (রোগ শরীরে প্রবেশের পর লক্ষণ প্রকাশের সময়কাল) অর্থাৎ ২৮ দিন পর্যন্ত হতে হবে।
কেস যদি কমতে থাকে তবে লকডাউনের সময় কমতে পারে এবং ২৮ দিনের আগে যদি রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে তবে লকডাউন আরও বাড়াতে হবে। চীনে এ লকডাউন কার্যকর হওয়ার কারণেই রোগের বিস্তৃতি কমে গেছে।বিজ্ঞানীদের কাছে এখনও প্রমাণ নেই, কতদিন লকডাউন রাখলে রোগ নিয়ন্ত্রণে থাকবে। তবে লকডাউন করলেও কিছু কিছু এলাকায় ‘কমিউনিটি ফোকাল’ হতে পারে অর্থাৎ কিছু কিছু জায়গায় রোগ ও রোগীর সংখ্যা বাড়বে। সার্ভিলেন্স বা পর্যবেক্ষণ বাড়াতে হবে।এর সুবিধা হল কেস শনাক্ত হলে যাদের মৃদু লক্ষণ থাকবে তারা বাসায় বিশ্রাম বা চিকিৎসা নেয়ার পরামর্শ পাবে, যাদের মাঝারি ধরনের লক্ষণ থাকবে তারা প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে থাকবে এবং যাদের তীব্র লক্ষণ থাকবে তারা হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেবে। এভাবে সীমিত টেস্ট কিটের সর্বোচ্চ ব্যবহার হবে।
এসব করতে হলে কাজের সমন্বয় করতে হবে এবং ৫-৬ সদস্যের কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টার গঠন করতে হবে, যারা প্রতি মুহূর্তে অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত দ্রুত গ্রহণ করবেন।কস্ট-বেনিফিট অ্যানালাইসিস করে সম্পদের ব্যবহার করতে হবে, সর্বোপরি মানুষের মৃত্যুহার কমাতে হবে। তাই ডিটেকশন বা রোগ নির্ণয়, সার্ভিলেন্স বা পর্যবেক্ষণ এবং টেস্ট কিটের সংখ্যা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।বিশ্বে এ পর্যন্ত লকডাউনই সবচেয়ে কার্যকরী পন্থা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে, যদিও এর ইকোনমিক ইম্প্যাক্ট অত্যন্ত গভীর।
এ পর্যন্ত ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকাতেই কেস ডিটেকটেড হয়েছে। অন্যান্য এলাকাতে টেস্ট করার সুবিধা নেই বলেই হয়তো এমনটি হয়েছে। ঢাকা থেকে যে লোকগুলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে গেল তাদের মধ্যে কিছুসংখ্যক লোক আগেই ইনফেকশন নিয়ে গেছে।তারা ইনফেকশন লোকালি বাড়াচ্ছে। রোগ নিয়ন্ত্রণের যে পদ্ধতিগুলো সরকার বারবার ঘোষণা করছে তা যদি ৮০ ভাগ জনগণ মেনে চলে তাহলে রোগের বিস্তার সুনিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।
যে রোগী করোনাভাইরাসের কারণে তীব্র মাত্রায় কাশি বা শ্বাসকষ্টে ভুগবে, যাকে মেডিকেল পরিভাষায় এআরডিএস বলে তাদের অক্সিজেনেশন সাপোর্ট লাগবে। এ জন্য ইনভেসিভ ভেন্টিলেটর মেশিন লাগবে অর্থাৎ শরীরের মধ্যে নল ঢুকিয়ে অক্সিজেনের সরবরাহ যা বাংলাদেশে নিতান্তই অপ্রতুল। এ রোগীদের মৃত্যুঝুঁকি সর্বাধিক।রোগীর সঠিক সংখ্যা যদি আমরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্ববাসীকে না জানাতে পারি তাহলে আমরা তাদের কাছে বিশ্বসযোগ্যতা হারাব। এত কম সংখ্যা ও মৃত্যু হলে বিদেশি সংগঠনগুলো মহামারী শেষে আমাদের দেশকে লকডাউন রাখতে পারে সঠিক অবস্থা ও সংখ্যা পর্যবেক্ষণের জন্য।
কিন্তু ভাইরাস রোগ বিস্তারের প্রাকৃতিক ধরন অনুযায়ী বাংলাদেশের এ অঞ্চলে রোগের বিস্তার আবার কমও হতে পারে, লকডাউন শতভাগ কার্যকর করতে পারলে দুই সপ্তাহের লকডাউনই যথেষ্ট। কারণ এ ভাইরাস এর চেয়ে বেশিদিন বাঁচে না এবং ভাইরাস মুভড হবে না, মুভ বা চলাচল করে মানুষ।যে রোগীদের কোভিড পজিটিভ ও শ্বাসকষ্ট হচ্ছে তখন কিন্তু আমাদের দায়িত্ব এই রোগীদের সঠিক অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে অ্যাপ্রোপিয়েট চিকিৎসা ফ্যাসিলিটিতে নিয়ে আসা।
বর্তমানে সারা দেশে অ্যাপ্রোপ্রিয়েট ফ্যাসিলিটিসের অভাব রয়েছে, তবে বর্তমানে যেহেতু আর্মি মাঠে আছে তাদের ক্যাপাসিটি আছে ফিল্ড হাসপাতালগুলোর উন্নত করে ভেন্টিলেটরের ব্যবস্থা করা। এ পরিকল্পনাগুলো এক-দুই মাস আগে থেকে করা দরকার। কারণ সারা বিশ্বেই এখন ভেন্টিলেটরের অভাব রয়েছে।আমরা যেহেতু প্রথম থেকেই বলে এসেছি, আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা পর্যাপ্ত রয়েছে, তাই উপযুক্ত ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা আমরা করতে ব্যর্থ হয়েছি। টেস্ট কিটের দাম একেকটির প্রায় পাঁচ হাজার টাকা।
এ টেস্টগুলো যেহেতু বিনামূল্যে করতে হচ্ছে তাই বেসরকারি হাসপাতাল হয়তো আগ্রহ দেখাবে না এ টেস্টগুলো করতে। আগে থেকেই যদি এক হাজার কোটি টাকা খরচ করে কিট ও ভেন্টিলেটর আনা যেত তাহলে হয়তো ভবিষ্যতে লকডাউনের জন্য লক্ষকোটি টাকা বাঁচানো সম্ভব হতো।মানুষকে আশ্বস্ত করতে হলে দৃশ্যমান কিছু কর্মকাণ্ড চালাতে হবে। যেমন- ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বড় কোভিড হাসপাতাল নির্মাণ, টেস্ট কিটের সহজলভ্যতা ও লকডাউন মানার বাধ্যবাধ্যকতা তৈরির মাধ্যমে অসুস্থতার হার ও ক্যাজুয়ালিটি কমানো সম্ভব।
আমাদের দেশে বেশির ভাগ মানুষ এখন সচেতন যে, এ রোগটি যে কারও হতে পারে এবং এতে মৃত্যুও হতে পারে। তবে অ্যাকশন প্ল্যান ঠিক নেই। হাত ধোয়ার ক্ষেত্রে আমরা বিশ্বরেকর্ড করলেও তার মধ্যে ১৫ ভাগ জনগণ ঠিক নিয়মে প্রতিদিন হাত ধোয় কিনা সে ব্যাপারে সন্দেহ আছে।কিন্তু বর্তমানে ৫০ ভাগের বেশিও মানুষ করোনার ভয়ে ঠিকমতো হাত ধুচ্ছে। প্রয়োজনে ৮০ ভাগেরও বেশি মানুষ সঠিক নিয়মে হাত ধোবে- তাহলেই করোনাসহ অন্যান্য অনেক সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধ করা সহজ হবে।
কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করে রোগের বিস্তার কমাতে সহজ হবে। এজন্য জনগণকে সঠিক তথ্য দিতে হবে। যে কোনো মহামারী অ্যাকশন প্ল্যান তৈরির জন্য সঠিক তথ্য উপস্থাপন করা জরুরি।একে হোল অব সোসাইটি অ্যাপ্রোচ বলে। হোল অব গভর্মেন্ট অ্যাপ্রোচে একে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে সরকারের সব মন্ত্রণালয় ও মেশিনারিজ একযোগে কাজ করতে হবে। এর লক্ষ্য হবে কীভাবে মানুষের মৃত্যু কমানো যায় এবং কীভাবে ক্ষতি কমানো যায়। তার জন্য বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা। লেখক: সাবেক বিভাগীয় প্রধান, মেডিসিন বিভাগ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ চিফ, ইউনিভার্সাল মেডিকেল রিসার্চ সেন্টার, ঢাকা



