কংকাল চোরদের ভয়ে কবর পাহারা
গাজীপুর থেকে বিশেষ প্রতিনিধি : কংকাল চোরদের ভয়ে কবর পাহারা দেয়া হচ্ছে গাজীপুর জেলায় কয়েকটি থানা এলাকায়। পুলিশ এসব ঘটনা স্বীকার করলেও কার্যকরী ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গাজীপুর জেলার কয়েকটি থানায় কংকাল চুরি আশংকাজনকভাবে বেড়ে গেছে। মুসা নামের এক কংকাল চোর এর জনক। তার রয়েছে একাধিক শিষ্য। সকলে কংকাল চুরি করে ঢাকায় বিক্রি করে। এই চক্রটির নেতৃত্বে ঢাকায় বড় একটি সিন্ডিকেট মেডিকেলে কংকাল সাপ্লাই করে জেলায় সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্ঠি করছে।
কালিয়াকৈর কবরস্থান থেকে অন্তত এগারটি কবর খুঁড়ে কংকাল চুরির ঘটনা ঘটেছিলো। আর এ বছরের ৩০শে মার্চ রাতে মওনা থেকে মুসা নামে এক ব্যক্তিকে কবর খুঁড়ে কংকাল চুরির সময় আটক করে স্থানীয়রা।পরে তার কাছেই আরও অনেক লোকের জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেলেও তারা এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছে।সম্প্রতি এ জেলার একটি গ্রামেই কিছুদিনের মধ্যে ঘটে গেছে অনেকগুলো কবর চুরির ঘটনা।পুলিশ ও স্থানীয়রা বলছেন গ্রামের অরক্ষিত কবর থেকে কংকাল চুরি করে সেগুলো ঢাকায় পাঠায় স্থানীয় একটি চক্র।
সম্প্রতি কংকাল চুরির সময় আটক হন এক ব্যক্তি । তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চুরির পর একেকটি কংকাল থেকে প্রায় ত্রিশ হাজার টাকা পান তারা।এ সম্পর্কে শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাভেদুল ইসলাম বলছেন, দু-মাস আগে এমন একটি ঘটনার জের ধরে তারা এক ব্যক্তিকে আটক করেছেন।যাকে আটক করেছি, তার কাছ থেকে অনেক তথ্যও আমরা পেয়েছি। কবর চুরির কথা সে স্বীকারও করেছে। এরপর থেকে এ ধরণের ঘটনার খবর আমাদের কাছে আর আসেনি।
তবে শ্রীপুর উপজেলার গাজীপুর ইউনিয়নের নিজমাওনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো: নূরুল ইসলাম বলেন, ১০/১৫ দিন আগেও নিজমাওনা গ্রামে দুটি কবর চুরির ঘটনা ঘটেছে। এরপর এলাকাবাসীকে নিয়ে সতর্ক থাকতে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য ও গ্রাম্য চৌকিদারদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। চুরির ঘটনা জানার পর পুলিশকে জানানো হয়েছে। তারাই ব্যবস্থা নিচ্ছে। আর আমরাও সতর্ক হয়েছি। মেম্বারদের বলা হয়েছে।
ওই এলাকার মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সামাদ জানান, তার এক নিকটাত্মীয়ের কবর থেকে মৃতদেহ চুরি হয়েছে কিছুদিন আগে। আমার আত্মীয় ঢাকায় দুর্ঘটনায় মারা গেছিলো। পরে এলাকায় এনে কবর দেয়ার পর সেই কবরেও চুরি হয়েছে।তিনি জানান, এ ধরণের এমন আরও বেশ কয়েকটি ঘটনার খবর তারা পেয়েছেন ওই এলাকা থেকেই।আমাদের শ্রীপুর উপজেলা প্রতিনিধি জানান, এক মাসের মধ্যে এই এলাকায় ত্রিশটির মতো কবর চুরির ঘটনা ঘটেছে।শ্রীপুর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান লুৎফুন্নাহার জানান, তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন।
এলাকার আব্দুস সামাদ বলেন, সাধারণত পল্লী এলাকায় কবর দিয়ে বাঁশের বেড়া দিয়ে রাখা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেগুলো আর ইট দিয়ে বাধাই করা হয়না বা পাকা করা হয়না। এরপর ২/৩ মাস পরে অনেক সময় দেখা যায় মাটি খুঁড়ে রাখা হয়েছে। অনেকে ভাবে শিয়ালে খুঁড়েছে। কিন্তু গত কিছুদিনে অনেকগুলো কবরে এমন দেখার পর লোকজনের সন্দেহ হয়। দশদিন আগে আমার বাড়ির কাছেই এমন একটি কবর পাওয়া গেছে যেখান থেকে কংকাল চুরি হয়েছে।
তিনি জানান চুরির ঘটনায় এক ব্যক্তিকে ধরাও হয়েছিলো। তার কাছে থেকেই জানা গেছে, কংকাল সংগ্রহ করে সে স্থানীয় একটি মাছ ও মুরগির খাবার তৈরির কারখানায় রাখতো। পরে সেখান থেকে এগুলো ঢাকায় পাঠানো হতো।
অভিযোগ রয়েছে, গ্রামে যারা চুরি করে তারা ৩০/৪০ হাজার টাকায় সেগুলো বিক্রি করে ঢাকায় তাদের লোকজনের কাছে। তারা আবার এগুলো বিক্রি করে আরেকটি চক্রের কাছে। এভাবে মেডিকেল বিশেষ করে ঢাকার একটি নামকরা হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট লোকজনের কাছে পৌঁছায় বলে জানা গেছে।তিনি বলেন, একারণে গ্রামের কবরস্থানগুলোতে এবার পাহারার ব্যবস্থা করেছেন এলাকাবাসীরা।
এদিকে কালিয়াকৈর উপজেলার একটি গ্রামে গত বছর প্রায় দু-ডজন কংকাল চুরির ঘটনা বের হয়েছিলো।আরও কয়েকবছর আগে ২০১২ সালে গাজীপুর পৌর এলাকার একটি কবরস্থান থেকে লাশ ও কংকাল চুরির ঘটনা নিয়ে বেশ শোরগোল হয়েছিলো। সেবার মোট ২৩টি কবর থেকে চুরির ঘটনা ঘটেছিলো। এরপরেও জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে নিয়মিত এ ধরণের চুরির খবর পাওয়া গেছে।
গত বছরের নভেম্বরেও কালিয়াকৈর কবরস্থান থেকে অন্তত এগারটি কবর খুঁড়ে কংকাল চুরির ঘটনা ঘটেছিলো। আর এ বছরের ৩০শে মার্চ রাতে মওনা থেকে মুসা নামে এক ব্যক্তিকে কবর খুঁড়ে কংকাল চুরির সময় আটক করে স্থানীয়রা।পরে তার কাছেই আরও অনেক লোকের জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেলেও তারা এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছে।



