ইউএস বাংলার লক্কর বিমানে ৭১ পরিবারের স্বপ্ন চুরমার

নেপাল প্রতিনিধি/বিশেষ প্রতিনিধি : নেপালে বিধ্বস্ত ইউএস বাংলার বোম্বাইডার ড্যাস কিউ ৪০০(S2-AGU) বিমানটি ছিলো লক্কর মার্কা বাসের মতো। এদের কারণে ৭১ পরিবারের স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেছে। এর প্রমাণ মিলেছে ২০১৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর সৈয়দপুরে। ওই সময় যে ফ্লাইটটি দূর্ঘটনার শিকার হয়েছিল সেটিই আজকে নেপালে বিধ্বস্ত ইউএস বাংলার যাস কিউ ৪০০(S2-AGU) ফ্লাইটটি। ওই ঘটনা ধামাচাপা দিতে দিতে শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্ঠা করছেন ইউএস বাংলা কর্তৃপক্ষ।আজ সোমবার তারা এক সাংবাদিক সম্মেলনে দাবি করেছে, নেপালের রাজধানীর কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের(টিআইএ) কন্ট্রোলরুমের ভুলে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে বলে দাবি করেছে ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স।
কিন্তু টিআইএ’র দাবি, ভুল ছিল পাইলটের। নিহত ৫০-নেপাল সেনাবাহিনীওদিকে ঢাকা থেকে নেপালের উদ্দেশ্যে ৬৭ যাত্রী নিয়ে ছেড়ে যাওয়া ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমানটি কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিধ্বস্ত হয়ে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৫০ জন নিহতের খবর জানিয়েছে নেপালের সেনাবাহিনী। গুরুতর আহতাবস্থায় যারা উদ্ধার হয়েছেন তাদের স্থানীয় কয়েকটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
লক্কর মার্কা ছিল বিমানটি- ২০১৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর সৈয়দপুরে দুর্ঘটনায় পড়েছিল নেপালে বিধ্বস্ত ইউএস বাংলার বোম্বাইডার ড্যাস কিউ৪০০(S2-AGU) বিমানটি। ওই সময়ও বলা হয়েছিল কথিত যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিমানটি রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ে মাঠে।পরে জানা গেলো নীলফামারীর সৈয়দপুর বিমানবন্দরে অবতরণের পর রানওয়ের শেষ প্রান্তে গিয়ে ইউএস বাংলা এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজের পেছনের চাকা ছিটকে গিয়েছিল। তবে ওইসময় হতাহতের কোনো ঘটনা ঘটেনি।
ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের স্টেশন ম্যানেজার রাকিব মোস্তাকিম ওই সময় সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছিলেন বিমানটি রানওয়ের পাশের জমিতে ছিটকে পড়ে। এতে বিমানটির সামনের চাকা (হুইল নোজ) পাশের জমিতে দেবে যায়। তবে বিমানের ৭৪ যাত্রী অক্ষত ছিল।এ ঘটনার আড়াই বছর পর আজ সেই বিমানটি নেপালে বিধ্বস্ত হলো।কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে অবতরণের সময় রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ে বিধ্বস্ত হয়ে অর্ধ শতাধিক মানুষের মৃত্যু ঘটে।
ক্রুসহ ৭১ যাত্রীর করুণ পরিণতি-
জানা গেছে, বিধ্বস্ত বিমানে ৩২ জন বাংলাদেশি, ৩৩ জন নেপালি, একজন মালদ্বীপের ও একজন চীনা নাগরিক ছিলেন। বাকিরা ছিলেন বিমানের পাইলটসহ স্টাফ।ইউএস বাংলার সূ্ত্রে বিমানের যাত্রীদের একটি তালিকা পাওয়া গেছে। সেই তালিকায় যাদের নাম পাওয়া গেছে তারা হলেন- রিজনা আব্দুল্লাহ, ফয়সাল আহমেদ, শামরিন আহম্মেদ, ইয়াকুব আলী, আলিফুজ্জামান, আলমুন নাহার অ্যানি, বিলকিস আরা, শিলা বসগেইন, নুরুন্নাহার বেগম, আলজিনা বড়াল, চারু বড়াল, আক্তারা বেগম, শাহীন বেপারী, সোভিন্দ্র বোহারা, বসন্ত বোহারা, সামিরা বাজানকার, প্রবীণ চিত্রকর, নাজিয়া চৌধুরী, সাজেনা দেবকোটা, প্রিন্সি ধামী, গয়োন্ত গ্রুঙ, রেজোয়ানুল হক, রকিবুল হাসান, মেহেদী হাসান, মো. কবির হোসেন, দিনেশ হুমাগাইন, সানজিদা হক, হাসান ইমাম, মো. নজরুল ইসলাম, শ্রেয়া ঝা, পূর্ণিমা লোহানী, মিলি মহারাজন, নিগা মহারাজন, সঞ্জয় মহারাজন, ঝাং মিং, আঁখি মনি, মিনহাজ বিন নাসির, শেখর পান্ডে, প্রসন্ন পান্ডে, বিনোদ রাজ পাডোয়াল, শঙ্করহরি পাডোয়াল, সঞ্জয় পাডোয়াল, এফএইচ প্রতিক, তামারা প্রিয়ন্ময়ী, মতিউর রহমান, শেখ রুবায়াত, কৃষ্ণকুমার শাহানী, উম্মে সালমা, আসেনা শাকিয়া, সানাম শাকিয়া, অঞ্জিলা শ্রেষ্ঠা, সারোনা শ্রেষ্ঠা, সত্য শর্মা, হরিপ্রসাদ সুবেদি, দয়ারাম তাম্রকার, বালকৃষ্ণ থাপা, সেতা থাপা, কিশোর ত্রিপাঠি, অবদেশ কুমার যাদব, অনিরুদ্ধ জামান, নুরুজ্জামান, রফিক জামান।এদিকে বিমানটিতে সিলেটের রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজের ১৩জন শিক্ষার্থী রয়েছেন বলে কলেজ সূত্রে জানা গেছে। এরমধ্যে ১১ জন ছাত্রী ও ২ জন ছাত্র।অপরদিকে গুরুতর আহতাবস্থায় উদ্ধারকারীদের স্থানীয় কয়েকটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
নেপালের রাজধানীর কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের(টিআইএ) কন্ট্রোলরুমের ভুলে BS-211 বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে বলে দাবি করেছে ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স। কিন্তু টিআইএ’র দাবি, ভুল পাইলটের। সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বারিধারায় ইউএস-বাংলার অফিসে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা(সিইও) ইমরান আসিফ বলেন, কন্ট্রোলরুম থেকে একেকবার একেক নির্দেশনা দেয়া হয়। যার কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। তিনি বলেন, গত তিন বছরে ইউএস-বাংলা ৩৬ হাজার ফ্লাইট পরিচালনা করেছে কোনো ত্রুটি ছাড়া। এই ফ্লাইটেও কোনো ত্রুটি ছিল না।
তবে টিআইএ’র জেনারেল ম্যানেজার রাজকুমার ছেট্রির বরাত দিয়ে নেপালের গণমাধ্যম কাঠমান্ডুপোস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে ভুল পথে অবতরণের জন্য।ছেট্রি বলেন, যখন কন্ট্রোলরুম থেকে পাইলটের কাছে অবতরণের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা আছে কিনা জানতে চাওয়া হয়, তখন তিনি বলেন যে সবকিছু ঠিক আছে।
কিন্তু উত্তর দিকের পরিবর্তে উত্তর-পূর্ব দিক দিয়ে অবতরণের চেষ্টা করা হয়।তিনি বলেন, কন্ট্রোলরুমের পক্ষ থেকে পাইলটের কাছে আবারও জানতে চাওয়া হয় যে সবকিছু ঠিক থাকলে বিমানটিকে অবতরণ করাচ্ছেন না কেন? উত্তরে তিনি বলেন যে সবকিছু ঠিক আছে এবং তিনি অবতরণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।কিন্তু অবতরণের জন্য কন্ট্রোলরুমের নির্দেশিত পথে ছিল না বিমানটি। যখন এই ব্যাপারে জানতে চাওয়া হয়, তখন কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। পরে বিমানবন্দরের পাশের একটি ফুটবল মাঠে বিমানটি বিধ্বস্ত হয় বলে জানান টিআইএ’র জেনারেল ম্যানেজার।
পাইলট বলছিল সব ঠিক আছে-তাহলে..
রানওয়েতে আছড়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিমানটিতে আগুন ধরে যায়। কাঠমান্ডু, নেপাল, ১২ মার্চ। রানওয়েতে আছড়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিমানটিতে আগুন ধরে যায়। কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিধ্বস্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত উড়োজাহাজটির পাইলট নিয়ন্ত্রণ কক্ষকে জানিয়েছিলেন কোনো সমস্যা নেই। তবে পাইলট উড়োজাহাজটিকে একটি নির্দিষ্ট দিকে অবতরণ করাতে চাইছিলেন।
ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মহাব্যবস্থাপক রাজ কুমার ছেত্রি বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ কথা জানিয়েছে।রাজ কুমার ছেত্রি বলেন, বিমানবন্দরে নামার অনুমতি পাওয়ার পর উড়োজাহাজটির পাইলট বলেন, তিনি উত্তর দিকে অবতরণ করতে চান। তখন কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে জানতে চাওয়া হয়, কোনো সমস্যা আছে কি না। এর জবাবে পাইলট জানিয়েছিলেন, কোনো সমস্যা নেই। অবতরণের আগে দুবার আকাশে চক্কর দেয় উড়োজাহাজটি।
আবার নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার থেকে জানতে চাওয়া হয়, সবকিছু কি ঠিক আছে? জবাবে পাইলট জানান, ঠিক আছে। এরপর অবতরণে অসংগতি দেখে নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার থেকে পাইলটকে জানিয়ে দেওয়া হয়, উড়োজাহাজটি ঠিকভাবে অবতরণ করছে না। কিন্তু এ কথার কোনো জবাব পাইলটের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। এরপর নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার থেকে পাইলটের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
মহাব্যবস্থাপক রাজ কুমার ছেত্রি বলেন, অবতরণের সময় যথাযথ নির্দেশনায় থাকা উচিত ছিল উড়োজাহাজটির। কিন্তু উড়োজাহাজটি কোনো কারণে ওই নির্দেশনায় ছিল না। একপর্যায়ে উড়োজাহাজটি বিমানবন্দরের দেয়ালের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ে ও সঙ্গে সঙ্গে আগুন ধরে যায়।রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, পাইলট দুর্ঘটনার আশঙ্কা জানিয়ে নিয়ন্ত্রণকক্ষে কোনো সংকেত পাঠিয়েছিলেন কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।সোমবার ইউএস বাংলার উড়োজাহাজটি ঢাকা থেকে ৭১ জন আরোহী নিয়ে নেপালের উদ্দেশে যাত্রা করে। রয়টার্স জানিয়েছে, উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হয়ে অন্তত ৫০ জন নিহত হয়েছেন।

ম্যারেজ ডে’র আনন্দে বিষাদ-
এ যেন হরিষে বিষাদের মতো ঘটনা। বিয়ে বার্ষিকীর আনন্দ উদযাপন করতে গিয়ে সপরিবারে নিহত হয়েছেন মেহেদী হাসান অমিও ও সোনা মণি নামে এক দম্পতি। ঘটনার পর সোমবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এক স্বজন এভাবে তার আহাজারির কথা জানান।এই দম্পতি তাদের শিশু সন্তানসহ বিয়েবার্ষিকী পালনের জন্য কাঠমান্ডুতে যাচ্ছিলেন। বিমান দুর্ঘটনায় নিহত শিশু দুটির মধ্যে একজন এই দম্পতির বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিমানে ছিল বৈশাখী’র রিপোর্টার-
জানা গেছে, বিধ্বস্ত বিমানে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল বৈশাখীর স্টাফ রিপোর্টার ফয়সাল আহমেদ ছিলেন। ফ্লাইটের যাত্রীদের তালিকা থেকেই এ বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। সোমবার থেকে পাঁচদিনের ছুটি নিয়েছিলেন ফয়সাল আহমেদ। তবে তিনি অফিসকে এই সফরের বিষয়ে কিছু জানাননি। পরে ফ্লাইটের যাত্রী তালিকায় নাম দেখে পাসপোর্ট নম্বর মিলিয়ে আমরা বুঝতে পারি ফয়সাল সেই ফ্লাইটে ছিলেন। ফয়সাল বৈশাখীর হয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিটের খবর কভার করতেন। ফয়সালের গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুর। বাবা-মা দুজনেই গ্রামের বাড়িতে থাকেন।

প্রধানমন্ত্রীর গভীর শোক-
নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলির সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই ঘটনায় গভীর শোক জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর খোলার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে সাহায্যকারী দল নেপালে পাঠানো হবে। এই ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সাহায্য করবে বাংলাদেশ। নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্ঘটনার পরপরই আমি ঘটনাস্থলে ছুটে যাই এবং উদ্ধার কার্যক্রমের খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিই।বর্তমানে রাষ্ট্রীয় সফরে সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ৫০ মিনিটে কেপি শর্মাকে শেখ হাসিনা ফোন করেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী প্রেস ইহসানুল করিম।





