আমেরিকায় গাধার পালে হাওয়া

লাবণ্য চৌধুরী : আজ আমেরিকার নির্বাচনে গাধা হাতির ভাগ্য পরীক্ষার একটি ঐতিহাসিক নির্বাচনের দিন। আজ মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভোটগ্রহণে গাধার পালে হাওয়া লেগেছে ইতিমধ্যে। এএফপি বলেছে, ইতিমধ্যে দুটি কেন্দ্রের ফলও জানা গেছে। এর মধ্যে একটি কেন্দ্রে ট্রাম্পকে বিপুল ভোটে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী জো বাইডেন। সাম্প্রতিক ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের দিন কারণ, বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশ আমেরিকায় গণতন্ত্র কতখানি অর্থময় থাকবে, আজকের ডোনাল্ড ট্রাম্প বনাম জো বাইডেন প্রতিদ্বন্দ্বিতা তা বলে দেবে।শুধু আমেরিকার জন্য নয়, সমগ্র পৃথিবীর জন্যই আজ গাধা হাতির লড়াই খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিসীম। কারণ, ভোটের ফলপ্রকাশের পর দেশব্যাপী গৃহযুদ্ধের আশঙ্কাও রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘সৌজন্যে’ বিশ্বের প্রধান শক্তির গৌরব ও মর্যাদা আমেরিকার হাত ফস্কে চলে গেছে। যাহোক, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোটগ্রহণ চলছে। দুই-চারটি কেন্দ্রের ভোট গণনা ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। দুটি কেন্দ্রের ফলও জানা গেছে। এর মধ্যে একটি কেন্দ্রে ট্রাম্পকে বিপুল ভোটে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী জো বাইডেন। কিছুক্ষণ আগে এএফপি বলেছে, নিউ হ্যাম্পশায়ারের ডিক্সভিলে নচ গ্রামের মানুষ সোমবার স্থানীয় সময় প্রথম প্রহরে ভোট দিয়েছেন। ৩ নভেম্বর প্রথম প্রহরে হেমলেট এলাকার বালসামস হোটেলের হেল হাউসে ডিক্সভিলে নচের ভোটাররা তাদের রায় জানিয়ে দেন।
তাৎক্ষণিকভাবে সেখানকার ভোটও গণনা করা হয়েছে। ফলও ঘোষিত হয়েছে। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন এ কেন্দ্রে পড়া ৫টি ভোটের সবই পেয়েছেন; ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাননি একটিও।তবে এ কেন্দ্রের ফলের সঙ্গে সবসময় রাজ্যের কারা সবচেয়ে বেশি ইলেকটোরাল ভোট পেতে যাচ্ছেন কিংবা কে হতে যাচ্ছেন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট, তার আভাস পাওয়া যায় না।
উনিশশো ষাটের দশকের সিভিল ওয়ারের পর সে দেশে গণতন্ত্রের যে স্থিত ও গভীর প্রসার ঘটেছিল, সেই অর্ধশতকব্যাপী যাত্রা আর অব্যাহত থাকবে কি না, তা আজ নির্ধারন হবে। কারণ, চার বৎসর যাবৎ আমেরিকা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভূতপূর্ব স্বেচ্ছাচারী শাসনে মানুষ অতিষ্ঠ। আরও চার বৎসর যাতে তা অব্যাহত না তাকে সেই চেষ্ঠা মার্কিন জনগনের। তবে আমেরিকানরা ফের স্বেচ্ছাচারে রাজি কি না, আজ তা স্থির হবে। শতাব্দীর বৃহত্তম অতিমারির ঋতুতে এই দেশটি সর্বাধিক ক্ষতি স্বীকার করেছে। বিশ্বের সেরা শক্তিমান ও সমৃদ্ধিশালী দেশ হিসাবে যাহার প্রতিপত্তি গগনচুম্বী, গত কয়েক মাসে তার গৌরবকেতন ধুলায় লুটাচ্ছে। এই বিপর্যয়ের প্রধান দায় যে স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের, তাঁর ভ্রান্ত নীতি, স্পর্ধিত অপশাসন, সহানুভূতিহীন ও পরিকল্পনাহীন স্বাস্থ্যবিধানের সে কথা আজ বিতর্কের ঊর্ধ্বে। বাস্তবিক, সব মিলিয়ে আমেরিকা আজ এক অভাবিত নিম্নবিন্দুতে ।
যা মিত্ররা তো বটেই শত্রুরাও বিস্মিত। এই পরিপ্রেক্ষিতে, আজ আমেরিকার নাগরিক ভোট দিবেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কিংবা পক্ষে।
তবে মার্কিণ নির্বাচনে দুটি কথা খুবই জরুরি। কারণ গণতন্ত্রের প্রকৃত অর্থ যদি হয় জনগণের স্বাধীন বিবেচনা অনুসারে শাসক নির্বাচন, তাহলে আজকের এই একটিমাত্র ব্যক্তি-কেন্দ্রিক উদ্ভ্রান্ত নির্বাচন গভীর ভাবে গ্লানিকর, ও গণতন্ত্রের মর্যাদা-হানিকর। তবে আশ্চর্য যে মাত্র চার বৎসর ক্রমাগত নিজেকে চর্চা করে, নিজেকে বিজ্ঞাপিত করে কোনও নেতা এক দৃঢ়প্রোথিত গণতন্ত্রকে এত দ্রুত এখানে অবনমিত করিতে পারিলেন। চার বৎসর আগে ওভাল অফিসে প্রবেশমুহূর্ত হইতে অসত্যভাষণ ও অভিসন্ধিমূলক প্রচারের মধ্যে তিনি ‘দেশশাসন’ বিষয়টিকে ডুবায় দিয়েছিলেন, নিজের সঙ্কীর্ণ স্বার্থকে দেশের স্বার্থ হিসাবে প্রতিষ্ঠার কাজ করে। দ্বিদলীয় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য আমেরিকার নির্বাচনের সঙ্কীর্ণতার সমালোচনা শোনা যায়। এই বারের নির্বাচন কিন্তু দুই দলের সংঘাত নয় এবার কেবল এক জন ব্যক্তির নামে রেফারেন্ডাম বা গণভোট নীতি, রীতি, আদর্শ, পরিকল্পনা, আর কিছুরই বিশেষ ভূমিকা নাই।
আমেরিকার ইতিহাসে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান, এই দল দুইটি নানা পরিক্রমা ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ভোলবদল করছে। কিন্তু আজ দুই দলের মধ্যে যে সামাজিক মেরুকরণ— শ্বেতবর্ণীয় সমাজের সংখ্যাগুরু এক দিকে, আর অশ্বেতবর্ণ সমাজ প্রায় সামগ্রিক ভাবে আর এক দিকে, এমন বিভাজন অদৃষ্টপূর্ব। সহজেই অনুমান করা যায়, এই রাজনৈতিক মেরুকরণের পিছনে কী বিপুল বিস্ফোরক সামাজিক সংঘাত ও বিদ্বেষ জাল পাতা রয়েছে। গত বৎসরখানেক ধরে আমেরিকায় বর্ণবিদ্বেষ কেন্দ্র করে আক্ষরিক ভাবে আগুন জ্বলছে, কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি অবিরাম আক্রমণ হচ্ছে, মানুষ হতাহত হচ্ছে, অপরাধ ও অন্যায়ের প্লাবনের মত বাড়ছে। ভোটের ফলপ্রকাশের পর দেশব্যাপী গৃহযুদ্ধের আশঙ্কাও রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘সৌজন্যে’ বিশ্বের প্রধান শক্তির গৌরব ও মর্যাদা আমেরিকার হাত ফস্কে চলে গেছে।



