আবজাল লাপাত্তা:সম্পদ বেচছে শ্বাশুড়ি
এস রহমান : এবার দুর্নীতিবাজ আবজালের সম্পদ বেচছে শ্বাশুড়ি। আবজালের বিভিন্ন সম্পদ তার নামে থাকায় তিনি তা বিক্রি করে নিজের আখের গোছাচ্ছেন। আবজালের এই শ্বাশুড়ির নাম রেহেনা বেগম। আবজালের শ্যালক রেজাউল ইসলাম বুলবুল কে নিয়ে শ্বাশুড়ি এই অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। ওদিকে বিষয়টি ফাঁস হয়ে গেলে দুদক আবজালের শাশুড়ি রেহেনা বেগম ও শ্যালক রেজাউল ইসলামকে (বুলবুল) জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করে। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ওই তলবি চিঠি পাঠানো হয়।
এদিকে আবজাল ও তার স্ত্রী কে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা বলে অভিযোগ উঠেছে। তাকে হন্য হয়ে খুঁজছে দুদকসহ গোয়েন্দারা। এ অবস্থায় আজ স্বাস্থ্য অধিদফতরের মেডিকেল এডুকেশন শাখার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. আবজাল হোসেন ও তার স্ত্রী রুবিনা খানমের সম্পদ ক্রোক করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) । সোমবার সকালে দুদকের উপপরিচালক মো. তৌফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে ১৫ জনের দল রাজধানীর উত্তরা মডেল টাউনে ১৩ নম্বর সেক্টরের ১১ নম্বর সড়কে আবজালের বাড়িটি ক্রোক করে।
‘তামান্না ভিলা’ নামে পাঁচতলা বাড়িতে থাকতেন আবজাল হোসেন। অভিযানের সময় বাড়িটি তালাবদ্ধ ছিল। আবজাল হোসেন কোথায় আছেন তাও কেউ জানাতে পারেননি। পরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আবজাল হোসেন ও তাঁর স্ত্রী রুবিনা খানমের সম্পদের ক্রোকাদেশ বিলবোর্ড আকারে প্রকাশ্যে স্থাপন করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
গত ২১ জানুয়ারি আবজাল হোসেন ও তার স্ত্রী রুবিনা খানমের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি জব্দের আদেশ দেন আদালত। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কে এম ইমরুল কায়েশ দুর্নীতি দমন কমিশনের এক আবেদনের শুনানি শেষে এই আদেশ দেন। আদালতের আদেশের পর তাদের সব ধরনের সম্পদ স্থানান্তর, হস্তান্তর, বিক্রি, লেনদেন বন্ধ করা হয়।
দুদক উপপরিচালক ও আবজাল দম্পতির অভিযোগ অনুসন্ধান দলের প্রধান সামছুল আলম তাদের সব ধরনের সম্পত্তি জব্দ করার আবেদনটি আদালতে পেশ করেছিলেন। গত ১০ জানুয়ারি এই কর্মকর্তা আবজালকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশের বিশেষ শাখা থেকে আবজাল ও তার স্ত্রীর বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।
অনুসন্ধানে তাদের নামে স্থাবর-অস্থাবর বিপুল পরিমাণ সম্পদ পাওয়া গেছে, যা তাদের বৈধ আয়ের সঙ্গে কোনোভাবেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তাদের নামে বাড়ি, গাড়ি, জমি, প্লট, মেয়াদি আমানত, বিভিন্ন ব্যাংকে জমানো টাকা, ব্যবসায়িক কোম্পানিসহ নানা ধরনের সম্পদ পাওয়া গেছে। তারা গোপনে অর্থ পাচার করে বিদেশেও সম্পদ করেছেন। অনুসন্ধানে তাদের নামে মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে।
দুদক সূত্র জাতিরকন্ঠ কে জানায়, এ বিষয়ে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।দুদক পরিচালক (প্রশাসন) জালাল সাইফুর রহমান জানান কমিটির সদস্যরা হলেন, আবজালের দুর্নীতি অনুসন্ধানে নিয়োজিত অনুসন্ধান কর্মকর্তা ও সংস্থার উপপরিচালক মো. তৌফিকুল ইসলাম, সাবেক অনুসন্ধান কর্মকর্তা ও উপপরিচালক মো. সামছুল আলম এবং উপপরিচালক (অতিরিক্ত পুলিশ সুপার) এ কে এম মাহবুবুর রহমান।
কমিটির পরিকল্পনা অনুযায়ী আজ ১৮ মার্চ রাজধানীর উত্তরায় (বাড়ি নম্বর ৪৭, সড়ক ১১ সেক্টর ১৩) আবজাল দম্পতির বাড়িতে ক্রোক বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়। এরপর আবজাল দম্পতির মালিকানায় থাকা অন্য স্থাপনা ও সম্পদেও বিলবোর্ড স্থাপন করার প্রক্রিয়া চলছে।গত ২১ জানুয়ারি দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আবজাল হোসেন ও তাঁর স্ত্রী রুবিনা খানমের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ক্রোক অর্থাৎ হস্তান্তর বা লেনদেন বন্ধ এবং ব্যাংক হিসাবগুলোর লেনদেন জব্দ (ফ্রিজ) করার আদেশ দেন ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালত।
আদালতের আদেশের পরপরই বিজি প্রেস থেকে গেজেট প্রকাশ হয়। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোয় আদালতের আদেশ পৌঁছে দেওয়া হয়। আদালতের নির্দেশ অনুসারে ইংরেজি দৈনিক ডেইলি সান ও বাংলা দৈনিক অগ্রসর পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া গত ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের মহাব্যবস্থাপক বরাবর দুদক থেকে চিঠি পাঠানো হয় বলে জানায় দুদক সূত্র। চিঠিতে আবজাল, তাঁর স্ত্রী ও নিকটাত্মীয়দের সব ব্যাংক হিসাবের বিষয়ে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়।
এদিকে আবজাল হোসেন ও তাঁর স্ত্রী রুবিনা খানমের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ জব্দ করার জন্য আদালত আদেশ দিলেও তাঁদের সব ব্যাংক হিসাব জব্দ হয়নি। ব্যাংকের এসব হিসাব থেকে টাকা উত্তোলনসহ অন্যান্য লেনদেন চলছে। আদালতের আদেশের পর দুই সপ্তাহেই আবজাল হোসেন, তাঁর স্ত্রী রুবিনা খানম ও অন্যান্য কয়েকজন নিকটাত্মীয়ের ব্যাংক হিসাবে নিয়মিত লেনদেন হয়েছে। রুবিনা খানমের মালিকানাধীন রহমান ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে সরকারি ঠিকাদারি কাজের বিল আদায় হতো। সেই প্রতিষ্ঠানের হিসাবটিও সচল আছে এবং লেনদেন চলছে। আবজালের নিজের নামে ও তাঁর যেসব নিকটাত্মীয়কে দুদক জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় এনেছে, তাঁদের হিসাবও সচল।
ওই সব ব্যাংকের কর্মকর্তারা জাতিরকন্ঠ কে বলেছেন, জব্দের কোনো আদেশ না থাকায় এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছেন তাঁরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, তাঁদের কাছে এ-সংক্রান্ত কোনো আদেশ নেই।ওদিকে দুদক বলেছে, তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট যেসব ব্যাংক হিসাবের তথ্য ছিল, সেগুলোর তথ্য উল্লেখ করে ব্যবস্থা নিতে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে টাকা তুলে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। দুদকের কাছে থাকা তথ্যের বাইরে কোনো ব্যাংক হিসাব থাকলে সেখান থেকে হয়তো টাকা তুলতে পারে। কিন্তু আদালতের নির্দেশের পর কোনো ব্যাংক ওই দম্পতির টাকা ছাড় করলে সে বিষয়ে দুদক ব্যবস্থা নেবে।



