• বৃহস্পতিবার , ২৮ মে ২০২৬

আদ-দ্বীন হাসপাতালে ‘শ্বাসরুদ্ধকর’ ছয় নবজাতকের মৃত্যু-তদন্ত কমিটি


প্রকাশিত: ৮:০৬ পিএম, ২৭ মে ২৬ , বুধবার

নিউজটি পড়া হয়েছে ১০ বার

 

 

 

বিশেষ প্রতিনিধি : রাজধানীর মগবাজারে আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডের যে অংশে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে, সেখানকার পরিবেশ ‘শ্বাসরুদ্ধকর’ ছিল বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস। বুধবার দুপুরে হাসপাতাল পরিদর্শনের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, “ভোরে এই রুমটিতে এসি জটিলতা অথবা যে কোনো কারণেই হোক ওখানের যে পরিবেশ একটি সাফোকেটিভ পরিবেশের মতো আমরা পেয়েছি। ওখানে আসলে এসি এমনভাবে ছিল যে, এসিটি বন্ধ করলে ওখানে আর ভেন্টিলেশনের কোনো ব্যবস্থা নেই।”এ ঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেছেন, আগামী তিন দিনের মধ্যে এই প্রতিবেদন দেবে।

কোরবানির ঈদের আগের দিন সকালে আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর খবর পুরো বাংলাদেশকে নাড়িয়ে দেয়। খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান পুলিশ ও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা।মৃত শিশুগুলোর পরিবারের পক্ষ থেকে অবহেলার অভিযোগ আনা হলেও ঠিক কী কারণে শিশুগুলোর মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি কেউ।এই ঘটনাকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ও অস্বাভাবিক’ হিসেবে বর্ণনা করে অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ওই ওয়ার্ডে ১১ জন মা ছিলেন। তাদের মধ্যে ৬ জন মা তাদের শিশুর সন্তানসহ ছিলেন। শিশুগুলোর বয়স একদিন থেকে তিন দিনের ভেতরে। আর বাকি পাঁচ শিশু এনআইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিল।

ওই ওয়ার্ডে এসি বন্ধ করলে বায়ু চলাচলের কোনো ব্যবস্থা ছিল না, ফলে একটি শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ সেখানে দেখার কথা বলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। তিনি বলেন, “এরকম একটি পরিস্থিতির মধ্যে এই নবজাতক শিশুরা এখানে যে সেবার জন্য ছিল। এরকম একটি পরিস্থিতিতে আমরা ভোরে ছয়জন শিশুকে হারিয়েছি।”সেখানে ব্যবস্থাপনার কোনো ত্রুটি ছিল কিনা, শিশুদের মৃত্যুর কারণ কী–তা সঠিকভাবে নির্ণয় করার জন্য একটি উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন ‘ইনকোয়ারি কমিটি’ গঠন করার কথা জানিয়ে ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল উইং-এর উপপরিচালক পদমর্যাদায় একজন এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আরো একজন কর্মকর্তাকে এই তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

“হাসপাতালের যে রুমটিতে আমরা এই শিশুদেরকে চিকিৎসারত অবস্থায় হারিয়েছি, তাদের এই চিকিৎসা ব্যবস্থায় কোনো ত্রুটি ছিল কিনা, এবং যে রুমটিতে উনারা অবস্থান করছিলেন, সেই রুমটিতে যে সেবা দেওয়া হচ্ছিল, সেই সেবার যে পরিবেশ, সেই পরিবেশের মধ্যে যে প্রশ্নটি এসেছে যে ওখানকার এসি জটিলতা অথবা যদি কারিগরি অন্য কোনো, ত্রুটি থাকে, সেগুলো সঠিকভাবে নির্ণয় করে এ বিষয়ে সঠিক তদন্তের মাধ্যমে তাদের মৃত্যুর কারণ উদঘাটন করে কমিটি আগামী ৪০ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে রিপোর্ট দেবে। রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেবে।”

মহাপরিচালক বলেন, এ ব্যাপারে যদি কারো কোনো গাফিলতি থাকে, হাসপাতাল কর্রতৃপক্ষের যদি কোনো অব্যবস্থাপনা থাকে, যদি অবকাঠামোগত কোনো কারিগরি ত্রুটি ধরা পড়ে, সবকিছুর জন্য ‘স্তর বেঁধে’ যথাযথ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ওই ছয় শিশুর ‘সাফোকেশন’ হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। তার কতক্ষণ পর একটা বাচ্চা মারা যায়? ওই সময় হাসপাতালের কোনো ডাক্তার, নার্স সেখানে ছিলেন কি না।

জবাবে অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, “আমরা রুমটি পরিদর্শন করে যেটা দেখেছি, ওখানে কর্তব্যরত সেবিকা ছিলেন। একটি সেবিকাদের টিম ছিলেন। এবং আমরা জানতে পেরেছি যে ওই রুমে যখন কোনো বাচ্চা অসুস্থ হয়, ওনারা হাসপাতালের যে প্রচলিত যে সিস্টেমটি আমরা দেখেছি যে ওনারা এই বাচ্চাদেরকে পাঁচ তলায় এনআইসিইউতে চিকিৎসার জন্য পাঠান। “এই জায়গাটিতে আমাদের কাছে মনে হচ্ছে যে একটি দুর্বলতা আছে এবং কর্তৃপক্ষ এটি আমাদেরকে জানিয়েছেন। কিন্তু সেবার দিক থেকে কোনো ত্রুটি আছে কিনা, এটি আমরা অবশ্যই খতিয়ে দেখব এবং এ বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে।”

একজন সাংবাদিক এ সময় বলেন, অভিযোগ করা হচ্ছে রাত ১২টার পর শিশুরা অসুস্থ হওয়া শুরু করে, তাদের বমিভাব শুরু হয়। এরপরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রাত ১২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত কী ব্যবস্থা নিয়েছে?এ সময় মহাপরিচালকের পাশে থাকা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. জাহিদ রায়হান বলেন, “আমরা যে ঘটনাটা জানতে পারছি, সেটা হল, প্রথমে ২টার সময়, রাত ২টার সময় বাচ্চার কোনো একজন গার্ডিয়ান বাচ্চাদের ঠান্ডা লাগছে বলে এসি অফ করতে বলেন। এসিটা এক ঘণ্টা অফ ছিল। তাহলে হল ৩টা।

“৪টার সময় প্রথম বাচ্চাটা অসুস্থ হয়। একটা বাচ্চা কান্নাকাটি করে অসুস্থ হয়, তখন নার্স ওই বাচ্চাটাকে এনআইসিইউতে নিয়ে যায়। নিয়ে যাওয়ার ১৫-২০ মিনিট বা আধা ঘণ্টা পর বাচ্চাটা আবার ইম্প্রুভ করে। করার পর তাকে আবার এই ভিকটিম এরিয়াতে নিয়ে আসে।”ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, “এখানে আনার পর তখন হয়তো ধরেন সাড়ে ৪টা বা পৌনে ৫টা এরকম বাজে। ৬টার সময় নার্স খেয়াল করেন একজন বাচ্চা মারা গেছে। তাকে সাথে সাথে এনআইসিইউতে নেয়। সাবসিকোয়েন্টলি বাচ্চাগুলো খারাপ হতে থাকে। পরবর্তীতে সব বাচ্চাগুলোকেই এনআইসিইউতে নেওয়া হয় এবং দুঃখজনকভাবে এনআইসিইউতে তাদের মৃত্যু হয়, ছয়টা বাচ্চার।”

শিশুগুলোর মৃত্যু কীভাবে বা কী কারণে হল, ‘তদন্ত না করে তা বলা সম্ভব নয়’ বলে মন্তব্য করেন অতিরিক্ত মহাপরিচালক।তিনি বলেন, “আমরা যেটুকু বলতে পারি, সেটা হল যে ছয়জন বাচ্চার সাডেন মৃত্যু এটা চিকিৎসাজনিত কোনো জটিলতায় আমাদের মনে হয় না। মানে পরপর ছয়জন বাচ্চা একই সাথে মারা যাবে, এখানে কোনো একটা টেকনিক্যাল ফল্টের কারণে এই ঘটনাটা ঘটছে বলে আমরা মনে করি।”

এটা বোঝার জন্য ‘ডাক্তার হওয়ার দরকার নাই’ মন্তব্য করে ডা. জাহিদ রায়হান বলেন, “এটা খুব সাধারণ একটা কমন সেন্স কাজ করবে যে এক ঘণ্টা বা দুই ঘণ্টার মধ্যে ছয়টা বাচ্চা হঠাৎ করে কেন মারা গেল।“আপনারা শুনে আশ্বস্ত হবেন, সিআইডির টেকনিক্যাল এক্সপার্ট, এসি এবং অন্যান্য ইলেকট্রিক ইকুইপমেন্টসের ম্যানেজমেন্ট ব্যাপারে যারা এক্সপার্ট, তারা ওই রুমটা বন্ধ করে তাদের মত তদন্ত করছেন। এই তদন্ত রিপোর্টটা আমাদের কাছে ডেফিনেটলি আসবে। সেই অনুযায়ী আমরা একটা সিদ্ধান্তে আসতে পারব।”

তবে এখন যেমন হামের প্রাদুর্ভাব চলছে, কিংবা ডায়রিয়া বা অন্য কোনো রোগে আধা দিনের মধ্যে একটি হাসপাতালে ছয়টি শিশু হঠাৎ করে মারা যাবে–বিষয়টি তেমন হওয়ার কথা নয় বলে মনে করেন অতিরিক্ত মহাপরিচালক। তিনি বলেন, “এটা হয়ত কোনো টেকনিক্যাল ত্রুটি বা ফল্টের কারণে হচ্ছে। এটা আমাদের দয়া করে একটু সময় দেবেন, আমরা একটু খতিয়ে দেখছি।”

শিশুগুলোর ময়নাতদন্ত করা হবে কি না, সেই প্রশ্নের স্পষ্ট কোনো উত্তর দিতে পারেননি ডা. জাহিদ রায়হান।পুরো পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “অস্বাভাবিক মৃত্যুর জন্য আইনগত যে কথা, সেটা হল ময়নাতদন্ত করা উচিত। কিন্তু এই ছোট বাচ্চা, একেবারেই ছোট, একজন একটা বাচ্চা নিয়ে এসে আমাকে দেখাইছেন এইটুকু একটা বাচ্চা। আমাকে উনি প্রশ্ন করছেন যে এই বাচ্চার ওপর কাটাকুটি কোথায় করবেন আপনারা? আমি উনাকে উত্তর দিতে পারি নাই।

“তো এটা আমার মনে হয় যে গার্ডিয়ানদের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত। আইন আইনের মতো চলবে ইনশাআল্লাহ। আমরা এটাতে সম্পূর্ণ ইনভলভ আছি।”একজন সংবাদিক প্রশ্ন করেন, “আপনি কি মনে করেন যে ময়নাতদন্ত ছাড়া মূল ঘটনা কেন হয়েছে সেটা আইডেন্টিফাই করা যাবে?”জবাবে অতিরিক্ত মহাপরিচালকত বলেন, “ময়নাতদন্ত ছাড়া মূল ঘটনা আইডেন্টিফাই করা ডিফিকাল্ট। ডিফিকাল্ট, কিন্তু তখন আইন আদালত যে কাজটা করবে, সেটা হল সারকামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্সের ওপর ভিত্তি করে আইনের গতি পথ নির্ধারণ হবে।”

ঘটনাস্থলে বম্ব ডিসপোজাল ইউনিট

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ ৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় কারণ অনুসন্ধান ও রহস্য উদ্‌ঘাটনে ঘটনাস্থলে গেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ-এর বম্ব ডিসপোজাল ইউনিট। সেখানে কোনো ধরনের বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি বা ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা ঘটেছে কি না, তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। বুধবার (২৭ মে) দুপুরের পর ডিএমপির বম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের একটি টিম আদ-দ্বীন হাসপাতালে পৌঁছায়।

ডিএমপির বম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের এক সদস্য বলেন, সিনিয়র কর্মকর্তাদের নির্দেশে আমরা এখানে এসেছি। যে কক্ষে নবজাতকেরা মারা গেছে, সেখানে উন্নত প্রযুক্তির কিছু ডিভাইস দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। কোনো বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়েছে কিনা, ছড়ালে সেটি কী ধরনের গ্যাস এবং কী পরিমাণে ছিল, তা তদন্ত শেষে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

এর আগে বেলা ১১টার দিকে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ঘটনাস্থলে এসে বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করে। সিআইডির ক্রাইম সিন টিম হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ রুমে প্রবেশ করে বিভিন্ন আলামত ও নমুনা সংগ্রহ করে। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে তারা সেখানে কাজ করেন। তিনি আরও বলেন, সব ধরনের সম্ভাবনাকে সামনে রেখেই আমরা নমুনা সংগ্রহ করছি। ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে এই নিষ্পাপ শিশুদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানার চেষ্টা করা হবে।

এ বিষয়ে ডিএমপির রমনা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, এখন পর্যন্ত আমরা ছয় শিশুর মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত হয়েছি। তবে কী কারণে তাদের মৃত্যু হয়েছে, তা এখনো জানা যায়নি। সিআইডির বিশেষজ্ঞ দল নমুনা সংগ্রহ করছে। তদন্তের পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, এ ঘটনায় আরও পাঁচ শিশু হাসপাতালের এনআইসিইউতে ভর্তি রয়েছে। তাদের চিকিৎসা চলছে।

তবে ভর্তি শিশুদের বর্তমান শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাননি প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে, এনআইসিইউতে চিকিৎসাধীন শিশুদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এছাড়া কয়েকজন শিশুর শরীর নীল বর্ণ ধারণ করেছে বলেও জানা গেছে।