• শনিবার , ৩০ মে ২০২৬

জিয়া হত্যা-ষড়যন্ত্র’র অজানা অধ্যায়-


প্রকাশিত: ১০:৪৭ পিএম, ৩০ মে ২৬ , শনিবার

নিউজটি পড়া হয়েছে ৩৭ বার

 

ভোররাতে সেনাবাহিনীর একটি দল সার্কিট হাউস ঘিরে ফেলে এবং মেশিনগানের গুলিবর্ষণ শুরু করে। মেজর মোজাফফর ও ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিন সার্কিট হাউসে প্রবেশ করে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন।সেখানে উপস্থিত হন চট্টগ্রাম অঞ্চলের সামরিক কমান্ডার মেজর জেনারেল আবুল মনজুর ও কর্নেল মতিউর রহমান। কর্নেল মতিউর রহমানের নেতৃত্বাধীন দলটি অত্যন্ত কাছ থেকে তাকে এসএমজি দিয়ে গুলি করে হত্যা করে।

 

শফিক রহমান : ১৯৮১ সালের ৩০শে মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান নির্মমভাবে নিহত হন। সেনাবাহিনীর বিপথগামী কিছু সদস্য এই হামলায় অংশ নেন। এই হত্যাকাণ্ডের ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব পড়ে এবং পরবর্তীতে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতায় আসেন।

উইকিপিডিয়া ও বাংলাদেশের তৎকালীন পত্রপত্রিকার তথ্য মতে, জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের উল্লেখযোগ্য কিছু দিক নিচে তুলে ধরা হলো: ১৯৮১ সালের ৩০শে মে, ভোর ৪টার দিকে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। স্থানীয় বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিরসনের লক্ষ্যে তিনি ২৯শে মে রাতে চট্টগ্রামে গিয়ে সার্কিট হাউসে অবস্থান করছিলেন। ভোররাতে সেনাবাহিনীর একটি দল সার্কিট হাউস ঘিরে ফেলে এবং মেশিনগানের গুলিবর্ষণ শুরু করে। মেজর মোজাফফর ও ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিন সার্কিট হাউসে প্রবেশ করে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন।

পরবর্তীতে সেখানে উপস্থিত হন চট্টগ্রাম অঞ্চলের সামরিক কমান্ডার মেজর জেনারেল আবুল মনজুর ও কর্নেল মতিউর রহমান। কর্নেল মতিউর রহমানের নেতৃত্বাধীন দলটি অত্যন্ত কাছ থেকে তাকে এসএমজি দিয়ে গুলি করে হত্যা করে। জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর হত্যাকারীরা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত সফল হতে পারেনি。পরবর্তীতে সামরিক আদালতে এই বিদ্রোহের বিচার সম্পন্ন হয় এবং অভিযুক্ত কয়েকজনের ফাঁসি ও বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয়। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল কুশীলব ও সম্পূর্ণ নেপথ্য কারণ এখনো বহুলাংশে অমীমাংসিত এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে এটি নিয়ে তুমুল বিতর্ক রয়েছে।

এর মধ্যে হত্যাকাণ্ডের দিন থেকে পরবর্তী সাতদিন সবচেয়ে ঘটনাবহুল এবং তাৎপর্যপূর্ণ ছিল বলে মনে করেন অনেকে।ঘটনার আগের দিন, অর্থাৎ ১৯৮১ সালের ২৯শে মে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দুই দিনের সফরে চট্টগ্রাম গিয়েছিলেন। তার সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল নিজের প্রতিষ্ঠা করা রাজনৈতিক দল বিএনপির স্থানীয় নেতাদের মধ্যকার বিরোধ নিরসন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথমদিন নেতাকর্মীদের সঙ্গে একের পর এক বৈঠক শেষে মধ্যরাতে ঘুমাতে যান মি. রহমান।

এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেনাবাহিনীর একটি দল তার উপর গুলি চালায় এবং তিনি ঘটনাস্থলেই নিহত হন। ঘটনার পর ৩০শে মে সকালে রেডিওতে প্রথমবারের মতো জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর খবর ঘোষণা করা হয়। তখনকার পত্র-পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে যে, অন্যান্য দিনের মতো সেদিনও চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে সকাল সাতটায় সংবাদ সম্প্রচার শুরু হয়। কিন্তু মাত্র তিন মিনিট চলার পর হঠাৎ-ই সংবাদ পাঠ বন্ধ হয়ে যায়।

এর কিছুক্ষণ পর চট্টগ্রাম সেনানিবাসের তৎকালীন জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরের বরাত দিয়ে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নিহত হওয়ার খবর প্রচার করা হয়। এই খবর প্রচারের আগ পর্যন্ত চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ এবং স্থানীয় প্রশাসনের বেশিরভাগ কর্মকর্তারা মি. রহমানের মৃত্যুর ব্যাপারে নিশ্চিতভাবে কিছু জানতেন না বলেও তৎকালীন পত্র-পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে।

অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাগ্রহণ

রেডিওতে ঘোষণা দেওয়ার পর জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর খবর দ্রুতই চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে।এক বিবৃতিতে তৎকালীন সরকার জানায় যে, ‘বিপ্লবী পরিষদ’ পরিচয় দেওয়া কিছু সেনা সদস্য রাষ্ট্রপতি মি. রহমানকে হত্যা করেছে।এমন পরিস্থিতিতে তৎকালীন উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
ক্ষমতা গ্রহণের পর জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভার সদস্য এবং বিভিন্ন বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে কয়েক দফায় বৈঠক করেন মি. সাত্তার।বৈঠকে তিন বাহিনীর প্রধান-সহ সবাই অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন বলে তখনকার গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে।

এরপর ৩০শে মে দুপুরে রেডিও এবং টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়েছিলেন মি. সাত্তার।তার সেই ভাষণের একটি অনুলিপি পরের দিন বাংলাদেশের বেশিরভাগ জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।“আমি গভীর বেদনা ও দুঃখ ভরে জানাচ্ছি যে, আমাদের প্রিয় নেতা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আজ (৩০শে মে, শুক্রবার) সকালে চট্টগ্রামে দুষ্কৃতিকারীদের হাতে নিহত হয়েছেন,” ভাষণের শুরুতেই বলেন মি. সাত্তার।

৪০ দিনের জাতীয় শোক

এর পরের লাইনেই তিনি বলেন, “আমি সংবিধানের ৫৫ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদে অধিষ্ঠিত হয়েছি।”দেশে তখনকার পরিস্থিতিকে ‘দুর্যোগময়’ উল্লেখ করে ধৈর্য্য ও সংহতি বজায় রাখার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান মি. সাত্তার।একই সঙ্গে, দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার লক্ষ্যে সরকারকে সব ধরনের সহায়তা করারও আহ্বান জানানো হয়।এছাড়া মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানানো হয় যেন তারা আগের মতোই নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করেন।

নিজের ভাষণে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট এটাও উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের সঙ্গে অন্যদেশের যত আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক চুক্তি রয়েছে, সেগুলো স্বাভাবিক নিয়মেই কার্যকর থাকবে। রাষ্ট্রপতির মৃত্যুতে ৪০ দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করার মাধ্যমে মি. সাক্তার তার ভাষণ শেষ করেন।

জরুরি অবস্থা জারি

ক্ষমতা গ্রহণের পর ৩০শে মে থেকে সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার।এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক একটি বিবৃতিও প্রকাশ করা হয়।সেখানে বলা হয় যে, রাষ্ট্রপতিকে হত্যার ঘটনায় জাতীয় নিরাপত্তা হুমকীর মুখে পড়েছে বলে মনে করে সরকার।
ফলে পরিস্থিতি বিবেচনায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে।পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত দেশের কোথাও সভাসমাবেশ, গণ-জমায়েত ও মিছিল নিষিদ্ধ করা হয়।
তবে জরুরি অবস্থা ঘোষণার ফলে সংবিধান বা সংসদ বাতিল হবে না বলে বিবৃতিতে জানায় সরকার।সঙ্গে এটাও জানানো হয় যে, দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ামাত্রই জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়া হবে।

গোপনে মরদেহ দাফন

হত্যাকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টা পরেই জিয়াউর রহমানের মরদেহ গোপনে চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকা রাঙ্গুনিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই একটি পাহাড়ের পাদদেশে জিয়াউর রহমানকে কবর দেওয়া হয় বলে তখনকার একাধিক পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে ১৯৮১ সালের দোসরা জুনে দৈনিক সংবাদের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, ৩০শে মে সকাল আটটা থেকে নয়টার মধ্যে সেনাবাহিনীর একটি দল চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে আসে।

তারা নিহত রাষ্ট্রপতি মি. রহমানসহ অন্তত তিনজনের মৃতদেহ গাড়িতে তুলে ‘অজ্ঞাত’ স্থানে নিয়ে যায়। ঘটনার পর ৩০শে মে সকালে সার্কিট হাউজে গিয়েছিলেন সেনাবাহিনীর তৎকালীন মেজর রেজাউল করিম রেজা। কয়েক বছর আগে তিনি বিবিসি বাংলাকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, তাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে সার্কিট হাউজে পাঠানো হয়েছিল সেখানে আগে থেকে অবস্থান নিয়ে থাকা সৈন্যদের নিরাপদে সরিয়ে নেবার জন্য।

“কর্নেল মতিউর রহমান আমাকে ডাকেন। ডেকে বলেন যে জিয়াউর রহমান ডেডবডিটা কিছু ট্রুপস সাথে নিয়ে সার্কিট হাউজ থেকে নিয়ে পাহাড়ের ভেতরে কোথাও কবর দেবার জন্য। আমি তখন তাকে বললাম যে আমাকে অন্য কাজ দেন। তারপর উনি মেজর শওকত আলীকে ডেকে ওই দায়িত্ব দিলেন। এরপর বেশ কয়েকজন সেনা সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে মেজর শওকত আলীই এরপর জিয়াউর রহমানের মৃতদেহ পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে দাফন করেন বলে জানান তিনি। মি. রহমানের সঙ্গে একই কবরে কর্নেল এহসান এবং ক্যাপ্টেন হাফিজের মৃতদেহও কবর সমাধিস্থ করা হয়েছিল।

থমথমে চট্টগ্রামে যুদ্ধের পরিবেশ-

তৎকালীন সেনাবাহিনীর মেজর রেজাউল করিম রেজা বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, জানান যে, চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজ থেকে সেনানিবাসে ফিরে তিনি রীতিমত যুদ্ধের পরিবেশ দেখতে পান।মেজর রেজার মতো যেসব সেনা কর্মকর্তা হয়তো ছুটিতে ছিলেন নতুবা অন্য কোন কাজে ছিলেন, তাদের ডেকে এনে বিভিন্ন দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।মেজর রেজার কাঁধে নতুন চাপে মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তার দায়িত্ব।চট্টগ্রাম সেনানিবাসের তখনকার জিওসি মি. মঞ্জুর ৩০শে মে সারাদিন কর্মকর্তা ও সৈন্যদের বিভিন্ন ব্যারাকে ঘুরে-ঘুরে বক্তব্য দিচ্ছিলেন বলে জানান মি. রেজা।

ঢাকা সেনানিবাস থেকে একটি টেলিফোন আসে-

টেলিফোনের অপর প্রান্ত থেকে বলা হলো যে জেনারেল এরশাদ মেজর জেনারেল মঞ্জুরের সাথে কথা বলতে চান।কিন্তু জেনারেল এরশাদের সাথে কথা বলার বিষয়ে মোটেই আগ্রহী ছিলেন না জেনারেল মঞ্জুর।মি. রেজার কাছে মনে হয়েছিল যে, মেজর জেনারেল মঞ্জুরের সাথে সমঝোতার মাধ্যমে জেনারেল এরশাদ হয়তো ক্ষমতায় যেতে যাচ্ছেন।কিন্তু জেনারেল মঞ্জুর হয়তো জেনারেল এরশাদকে মেনে নিতে চাননি।

জিয়াউর রহমানকে হত্যা করার পর চট্টগ্রাম শহরের নিয়ন্ত্রণ নেয় অভ্যুত্থানকারীরা। জারি করা হয় সান্ধ্য আইন। ৩০শে মে থেকে পরবর্তী দু’দিন রাস্তায় রাস্তায় অভ্যুত্থানের পক্ষে থাকা সেনা সদস্যদের টহলও দেখা গেছে বলে তখনকার পত্র-পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে। খবরে আরও বলা হয়েছে, ওইদিন সকাল নয়টার পর ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রামের টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। অন্যদিকে, অভ্যুত্থানকারীরা অবস্থান নেওয়ায় সড়ক ও আকাশপথেও যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে চট্টগ্রাম পুরোপুরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

মরদেহ ঢাকায় আনার প্রচেষ্টা –

হত্যাকাণ্ডের ঘটনা জানার পর সেদিনই রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মরদেহ ঢাকায় আনার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল বলে জানায় তৎকালীন সরকার।কিন্তু সরাসরি যোগাযোগ করতে না পেরে পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক সংস্থা রেডক্রসের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির মরদেহ ঢাকায় পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয় বলে সাংবাদিকদের জানান তৎকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান। কিন্তু চট্টগ্রাম সেনানিবাসের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন বলে পরে এক বিবৃতিতে জানায় সরকার।

মনজুর কে আত্মসমর্পণের নির্দেশ এরশাদের-

চট্টগ্রামের অভ্যুত্থানকারী সেনারা জিয়াউর রহমানের মরদেহ হস্তান্তর না করায় সরকার ক্ষিপ্ত হয়।হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ‘কঠোর ব্যবস্থা’ গ্রহণের নির্দেশ দেন অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট মি. সাত্তার।এ অবস্থায় চট্টগ্রাম সেনানিবাসের জিওসি মেজর জেনারেল মঞ্জুর-সহ ‘অভ্যুত্থানে’ অংশগ্রহণকারী সদস্যদের সবাইকে ৩১শে মে দুপুর ১২টার মধ্যে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দেন তৎকালীন সেনা প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আত্মসমর্পণ করলে ‘পূর্ণ নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের সাধারণ ক্ষমা করা হবে বলে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়।

দৃশ্যপট বদল মনজুরের পলায়ন-

জিয়াউর রহমানকে হত্যার দিন অর্থাৎ ৩০শে মে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে যে যুদ্ধ পরিস্থিতি ছিল সেটি তার পরের দিন দ্রুত পাল্টাতে থাকে। জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের সময় বিএনপি’র বর্তমানে প্রয়াত নেতা হান্নান শাহ সেনাবাহিনীতে ব্রিগেডিয়ার পদমর্যাদায় চট্টগ্রাম মিলিটারি একাডেমিতে কর্মরত ছিলেন। ২০১৬ সালে মৃত্যুর কয়েক বছর আগে মি. শাহ বলেছিলেন যে, রাষ্ট্রপতিকে হত্যার পরের দু’দিন অভ্যুত্থানকারী সেনারা চট্টগ্রাম শহরকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন। কিন্তু ৩১শে মে তারিখে এসে অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত সৈনিক এবং কর্মকর্তাদের মধ্যে বিভক্তি দেখা গেল।

অভ্যুত্থানকারীদের পক্ষ ত্যাগ করে অনেকেই অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে শুরু করেন। ৩১শে মে রাতে মেজর জেনারেল মঞ্জুর এবং কর্নেল মতিউর রহমান-সহ অভ্যুত্থানকারী বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা চট্টগ্রাম সেনানিবাস ছেড়ে পালিয়ে যান।সেই রাতের বর্ণনা দিতে গিয়ে সাবেক সেনা কর্মকর্তা হান্নান শাহ বলেন, “৩১শে মে রাত ১১টার দিকে জেনারেল মঞ্জুরের বাসা থেকে হঠাৎ একটি ফোন এলো।”তিনি আমাকে এবং আরো কয়েকজন কর্মকর্তাকে বসিয়ে রেখে ওনার অফিস থেকে বাসায় গেলেন। কিন্তু ঘণ্টা-খানেক পরেও তিনি ফিরে এলেন না।এমন অবস্থায় অন্য অফিসারদের তাদের কর্মস্থলে পাঠিয়ে দিয়ে আমি আমার কর্মস্থল মিলিটারি একাডেমিতে ফিরে আসলাম।ইতোমধ্যে আমি জানতে পারলাম, জেনারেল মঞ্জুর তাঁর পরিবার নিয়ে এবং অন্যান্য বিদ্রোহী অফিসাররা পার্বত্য চট্টগ্রামের দিকে পালিয়ে গেছে।

মনজুরকে ধরতে ৫ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা-

ঘটনা আরও নাটকীয় মোড় নেয় পহেলা জুন। সেদিন জানা যায় যে, অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহবুব চট্টগ্রাম থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় সরকার সমর্থিত সেনা সদস্যদের গুলিতে নিহত হয়েছেন। এ অবস্থার মধ্যেই মি. মঞ্জুরকে ধরার জন্য পাঁচ লাখ টাকার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। তখনকার পত্র-পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে যে, কেউ যদি পলাতক মি. মঞ্জুরকে জীবিত অথবা মৃত ধরে দিতে পারেন, সরকারের পক্ষ থেকে পুরস্কার হিসেবে তাকে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়া হবে। মেজর জেনারেল মঞ্জুর পালিয়ে যাওয়ার পর চট্টগ্রাম সেনানিবাস পুনরায় সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

আত্মসমর্পণের পর মনজুরের মৃত্যু-

মেজর জেনারেল মঞ্জুর এবং কর্নেল মতিউর রহমান যে গাড়ির বহরে পালিয়েছিলেন, সেই বহরে মেজর রেজাউল করিম রেজাও ছিলেন। তিনি জানান, কিছুদূর অগ্রসর হয়ে একটি পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছানোর পর সামনে গোলাগুলির শব্দ শুনতে পান তারা। তখন তারা এটাও লক্ষ্য করেন যে, সামনে কিছু সৈন্য পাহাড়ের দিকে ছোটছুটি করছে। সে সময় মি. মঞ্জুর গাড়ি ঘুরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেন। কিন্তু গাড়িটি হঠাৎ বিকল হয়ে পড়ায় সেটি করা সম্ভব হয় না।

তখন তারা অন্য আরেকটি গাড়িতে করে পেছনের দিকে চলে আসেন। সেখানে একটি গ্রামে তারা গাড়ি থেকে নেমে হাঁটা শুরু করেন। এলাকাটিতে চা বাগান ছিল। জেনারেল মঞ্জুর তখন চা বাগানের এক কুলির বাড়িতে আশ্রয় নেন। সেখানেই আত্মসমর্পণ করলে চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোস্তফা গোলাম কুদ্দুস তাকে আটক করে থানায় আনেন। এরপর তাকে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে নেওয়া হয়।

সেখানেই মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর হত্যার শিকার হন বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে তখনকার পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে যে, সেনানিবাসে নেওয়ার সময় একদল সশস্ত্র ব্যক্তি মি. মঞ্জুরকে ছিনিয়ে নেওয়ার সেনা সদস্যদের উপর হামলা করে। তখন দু’পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি হয়। এতে মি. মঞ্জুর আহত হন এবং পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান।

১৩ সামরিক কর্মকর্তার ফাঁসি-

সে সময় ‘বিদ্রোহের’ অভিযোগে ১৮ জন সামরিক কর্মকর্তার বিচার করা হয়েছিল। এদের মধ্য ১৩ জন সেনা কর্মকর্তার ফাঁসি এবং বাকিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল। যে সামরিক আদালতে কথিত অভ্যুত্থানকারীদের বিচার করা হয়েছিল, তাতে অভিযুক্তদের পক্ষে আইনি কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেছিলেন তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা এবং বর্তমানে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির প্রধান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহীম। তিনি দাবি করেছেন যে, তৎকালীন কর্তৃপক্ষ ওই সেনা আদালতকে যথাযথভাবে কাজ করতে দেয়নি।

অধ্যাপক আরিফের চোখে জিয়া হত্যা

১৯৮১ সালের ২৯ মে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম সফরে শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সফরসঙ্গী ছিলেন শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিক অধ্যাপক আরিফ মঈনউদ্দীন। জিয়ার অত্যন্ত ঘনিষ্ট এই অধ্যাপক রাজনীতিকের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল সেদিন কি ঘটেছিল চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে। তিনি বললেন, জিয়াউর রহমান হত্যাকান্ড ছিল একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ। সেনাবাহিনীর একদল বিপথগামী সদস্যের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন শহিদ জিয়া। কেন এই হত্যাকান্ড, কার কার ইশারা ছিল এর নেপথ্যে তা এখনো অজানা।বিচারের বাণী যেন নীরবে নিভৃতে কাঁদছে!

জিয়ার অর্থনৈতিক দর্শন ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি পরবর্তীতে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে বিএনপির রাজনীতিতে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত হয়েছিলেন।এর আগে অধ্যাপক আরিফ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জিয়ার ডাকেই তিনি ‘জাগদল’ গঠনে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন।

অধ্যাপক আরিফ বলেন, ‘১৯৭৬ সালের আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময়ে একটি ফোন পেয়ে আমি জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে যাই। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সেখানে গিয়ে দেখি, জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের অপেক্ষায় সারিতে রয়েছেন জহিরউদ্দিন খান (১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের সাবেক মন্ত্রী), ফজল করিম চৌধুরী (চট্টগ্রাম পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান), প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা মওলানা আবু তাহের এবং ‘পিপলস ভিউ’-এর সম্পাদক নুরুল ইসলাম চৌধুরী।’

অধ্যাপক আরিফ বলেন, ‘সবার মধ্যে আমিই প্রথম তৎকালীন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (ডিসিএমএলএ) জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পাই। এটিই ছিল তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ। সংক্ষিপ্ত পরিচয় পর্বের পর তিনি আমার সংসদীয় আসন সম্পর্কে জানতে চান এবং যুবসমাজকে সংগঠিত করার পরামর্শ দেন। এরপর থেকে আমি প্রতি মাসে একবার তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতাম।’

অধ্যাপক আরিফ বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর ১৯৭৭ সালের ৩ অক্টোবর আমাকে বঙ্গভবনে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য ডাকা হয়। সেখানে তিনি তাঁর স্বপ্নের প্রকল্প- যশোরের উলশী-যদুনাথপুরের ‘স্বনির্ভর প্রকল্প’ সম্পর্কে আমাকে অবহিত করেন এবং কয়েকজন ছাত্র ও যুবককে সঙ্গে নিয়ে প্রকল্পটি পরিদর্শনের পরামর্শ দেন। পরে আমি প্রায় ৩৫-৪০ জন ছাত্রকে নিয়ে সেখানে যাই এবং আমাদের পর্যবেক্ষণ ও প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশ টেলিভিশনের মাধ্যমে তুলে ধরি।’তিনি বলেন, ‘ওই বছরের শেষ দিকে জিয়ার লক্ষ্য ও দর্শনের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে চট্টগ্রামের মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে ছাত্রদের এক বিশাল সমাবেশের আয়োজন করি।’

অধ্যাপক আরিফ বলেন, ‘সমাবেশের মঞ্চে আমরা ‘জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল’-এর ব্যানার টাঙিয়েছিলাম এবং প্রধান অতিথি হিসেবে সমাবেশে বক্তব্য দেন বিচারপতি আবদুস সাত্তার।’তিনি দাবি করেন, ‘আমরাই এ প্রথম ‘জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল’ নামটি ব্যবহার করি, যা পরবর্তীতে বিএনপির ছাত্রসংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।’অধ্যাপক আরিফ স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি জিয়ার লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশকে একটি স্বনির্ভর দেশে পরিণত করা, বিশেষ করে সবুজ বিপ্লবের মাধ্যমে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা। এমনকি তিনি খাদ্যশস্য রপ্তানির স্বপ্নও দেখতেন।’

রাষ্ট্রপতি জিয়ার শেষ চট্টগ্রাম সফরের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অধ্যাপক আরিফ বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি জিয়ার চট্টগ্রাম সফরের কর্মসূচিটি বেশ তড়িঘড়ি করেই নির্ধারণ করা হয়েছিল।নির্ধারিত তারিখের মাত্র একদিন আগে, অর্থাৎ ২৮মে তৎকালীন বিএনপির দপ্তর সম্পাদক কর্নেল (অব.) আলাউদ্দিনের ফোনে আমি প্রথম সফরের বিষয়টি জানতে পারি। তিনি আমাকে পরদিন সকাল সাড়ে ৮টায় তৎকালীন টঙ্গী বিমানবন্দরে রাষ্ট্রপতির সফরসঙ্গী হিসেবে উপস্থিত থাকতে বলেন।’

সফরসঙ্গীদের মধ্যে তৎকালীন দলের মহাসচিব ডা. বি. চৌধুরীসহ বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী ও শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা নির্ধারিত সময়ে বিশেষ বিমানে উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব কর্নেল মাহফুজ জিয়ার পাশের আসনে বসেছিলেন। সামনের দুটি আসন সরিয়ে সেখানে একটি ছোট টেবিল রাখা হয় এবং সিভিল পিএস সৈয়দ আমিনুর রহমান একের পর এক ফাইল এগিয়ে দিলে রাষ্ট্রপতি জিয়া সেগুলোতে স্বাক্ষর করতে শুরু করেন।

অধ্যাপক আরিফ বলেন, ‘সকাল প্রায় ১০টার দিকে আমরা চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে পৌঁছি। সেখানে ওপরে লাউঞ্জে অপেক্ষমাণ রাষ্ট্রপতি জিয়া আমাকে ডাকেন। একপর্যায়ে তিনি কালো সানগ্লাস পরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করছিলেন। দক্ষিণ দিকের বিস্তীর্ণ খোলা জায়গা থেকে আসা মৃদু বাতাস তাঁকে স্পর্শ করছিল। হঠাৎ জিয়া আমাকে বললেন, ‘আরিফ, তুমি চট্টগ্রামে থাকো না কেন ? কী সুন্দর শহর! আমি চট্টগ্রামের কোনো পাহাড়ের চূড়ায় একটি বাড়ি করতে চাই।’তিনি আরও বলেন, ‘এ সময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এ এফ এম ইউসুফ সেখানে উপস্থিত হন।

তখন রাষ্ট্রপতি জিয়া তাকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আমার জন্য একটি জায়গা দেখুন, আমি এখানে থাকার জন্য একটি বাড়ি করতে চাই।’অধ্যাপক আরিফ বলেন, ‘কিছুক্ষণ পর আমরা রাষ্ট্রপতি জিয়াকে সঙ্গে নিয়ে শতবর্ষী ও অনন্য স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত উঁচু মিনারবিশিষ্ট চন্দনপুরা মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করি। এটিও পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচির অংশ ছিল না।’অধ্যাপক আরিফ বলেন, ‘জুমার নামাজ শেষে আমরা সার্কিট হাউসে ফিরে আসি। সেখানে রাষ্ট্রপতি আমাকে ডাকেন এবং অন্যদের কাছ থেকে আমার সম্পর্কে শোনা একটি বিষয় নিয়ে কয়েকটি প্রশ্ন করেন। আমি তাঁর প্রশ্নগুলোর জবাব দিই।’

তিনি আরও বলেন, ‘একপর্যায়ে রাষ্ট্রপতি আমাকে বলেন, ‘এসব বাদ দিন, সিরিয়াস রাজনীতি করুন।’ এরপর তিনি স্থায়ী কমিটির সদস্যদের কাছে জানতে চান, তাঁরা আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করতে চান কি না।অধ্যাপক আরিফ বলেন, ‘কিছুক্ষণ পর রাষ্ট্রপতি জিয়া আমাকে তাঁর কক্ষে নিয়ে যান এবং কাঁধে হাত রেখে বলেন, ‘ওস্তাদ (সামরিক পরিভাষায় অনানুষ্ঠানিকভাবে সুবেদার মেজরকে সম্বোধনের একটি শব্দ), তাকে সমর্থন করবেন না।’

তবে রাষ্ট্রপতি জিয়া কাকে ইঙ্গিত করে এ কথা বলেছিলেন, সেই নামটি অধ্যাপক আরিফ প্রকাশ করেননি।অধ্যাপক আরিফ বলেন, ‘আমি তাঁকে বলেছিলাম, ‘আমি তাকে সমর্থন করেছি, কারণ তিনি আপনার খুব ঘনিষ্ঠ।’ তখনই রাষ্ট্রপতি জিয়া বলেন, ‘আমার কাছে কেউ বিশেষ ঘনিষ্ঠ নয়, প্রত্যেককে তার মেধার ভিত্তিতে বিবেচনা করি।’তিনি আরও বলেন, ‘রাত প্রায় ১২টার দিকে রাষ্ট্রপতি আমাকে বিদায় জানান এবং দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘আরিফ, বাসায় যান এবং ফোনের কাছে থাকবেন, আমি আবার আপনাকে ফোন করব।’

নিজের রাজনৈতিক গুরু রাষ্ট্রপতি জিয়ার সঙ্গে শেষ সাক্ষাতের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে গভীর বেদনায় অধ্যাপক আরিফ মঈনউদ্দীন বলেন, ‘এটাই ছিল আমার প্রিয় রাষ্ট্রপতির সঙ্গে শেষ কথোপকথন। তিনি আর তাঁর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আমাকে ফোন করতে পারেননি, কারণ ঘাতকরা একজন মহান আত্মা, এই মাটির এক সাহসী সন্তান এবং আধুনিক, অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টার জীবন কেড়ে নিয়েছিল।’

অধ্যাপক আরিফ বলেন, ‘সেই বিভীষিকাময় কালো রাতে, শেষ পর্যন্ত রাত প্রায় ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার মধ্যে আমি ফোন পাই, তবে সেটি আমার রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে নয়, অন্য একজনের কাছ থেকে। হঠাৎ আমার শয়নকক্ষের টেলিফোন বেজে ওঠে। প্রথম ফোনটি আসে তৎকালীন বাগমনিরাম ওয়ার্ড কমিশনার মান্নানের কাছ থেকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এরপর একের পর এক যেসব ফোন পাই, সেগুলোতে হয় সার্কিট হাউসে ব্যাপক গোলাগুলির খবর জানানো হচ্ছিল, নয়তো আগের রাতে সেখানে কী ঘটেছে সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হচ্ছিল।’

অধ্যাপক আরিফ বলেন, ‘রাত প্রায় ২টার পর থেকে ঝড়ো হাওয়াসহ প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়। ভোর প্রায় ৫টার দিকে আমি সার্কিট হাউসের উদ্দেশে রওনা হই। তখনও গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল। সার্কিট হাউস থেকে কয়েক গজ দুরে কাজীর দেউড়ি মোড়ে এক পুলিশ সার্জেন্ট আমাকে আটকে দেন, তবে মুহুর্তের মধ্যেই তিনি আমাকে চিনতে পেরে সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি প্রধান ফটকে পৌঁছে দেখি, সব গেট খোলা এবং সব নিরাপত্তাকর্মী (দারোয়ান) দরবার হলের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। সাধারণত প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা সেই স্থাপনাটির চারপাশে তখন ছিল অস্বাভাবিক নীরবতা, যেন এক ভৌতিক পরিবেশ।’অধ্যাপক আরিফ বলেন, ‘প্রধান ফটকে গিয়ে আমি তৎকালীন সিএমপির ট্রাফিক বিভাগের ডিএসপি ইফতেখারকে দেখতে পাই। তিনি আমাকে সঙ্গে সঙ্গে অনুরোধ করে বলেন, ‘স্যার, এখান থেকে চলে যান, রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কিছুক্ষণ পর তৎকালীন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দিন আহমদ ঘটনাস্থলে এসে আমাকে প্রশ্ন করেন, ‘স্যার, এসব কীভাবে ঘটল?’ দুই পুলিশ কর্মকর্তা বারবার আমাকে সেখান থেকে চলে যেতে অনুরোধ করে বলেন, ‘স্যার, তারা (বিদ্রোহী সেনাসদস্যরা) ফিরে এলে আপনাকেও হত্যা করবে।’অধ্যাপক আরিফ জানান, ‘কয়েক মিনিট পর আমি দরবার হলের সামনে রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব কর্নেল মাহফুজকে স্থানীয় কয়েকজন শীর্ষ বেসামরিক কর্মকর্তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। হঠাৎ একটি মাইক্রোবাস সেখানে এসে থামে এবং সেখান থেকে দুজন আলোকচিত্রী নেমে আসেন।’

অধ্যাপক আরিফ বলেন, ‘এরপর আমি দেখি, তৎকালীন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা চট্টগ্রাম ক্লাবের দিক থেকে ধীরে ধীরে সার্কিট হাউসের দিকে হেঁটে আসছেন। কাছে এসে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আরিফ, কী হয়েছে?’অধ্যাপক আরিফ বলেন, ‘আমি উত্তরে বললাম, ‘রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করা হয়েছে।’ তখনই তিনি মন্তব্য করেন, ‘তাহলে বিচারপতি সাত্তার বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন।’অধ্যাপক আরিফ বলেন, ‘তাঁর তাৎক্ষণিক মন্তব্য শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে যাই। কারণ, তাঁর মুখে আমি কোনো উদ্বেগ বা শোকের ছাপ দেখিনি; এমনকি তিনি ‘ইন্না লিল্লাহ….’ পর্যন্ত উচ্চারণ করেননি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এরপর তিনি আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে যে গাড়িতে এসেছিলেন, সেটিতে করেই ঢাকা রওনা হন এবং আমাকে চট্টেশ্বরী রোডে রাসুল নিজামের বাসায় নামিয়ে দেন। পরে আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী ও তার আরেক ভাই আমাকে সেখান থেকে নিয়ে যান তাদের মেহেদীবাগের বাসভবনে। বাসভবনটি ছিল বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব মরহুম মাহমুদুন্নবী চৌধুরীর, যিনি বর্তমান অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর পিতা।’

অধ্যাপক আরিফ মঈনউদ্দীন বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে রাষ্ট্রপতি জিয়া ছিলেন শতভাগ সৎ। সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে তাঁর ডিওএইচএসে ১০কাঠার একটি আবাসিক প্লট পাওয়ার নিয়ম থাকলেও তিনি তা গ্রহণ করেননি।’তিনি আরও বলেন, ‘আমি তাঁর মতো এত সাধারণ ও অনাড়ম্বর জীবনযাপনকারী মানুষ খুব কমই দেখেছি। তিনি অকল্পনীয়ভাবে সহজ জীবন যাপন করতেন। তাঁর পরিধানের জন্য ছিল মাত্র তিন সেট সাফারি স্যুট- সাদা, ধূসর ও ক্রিম রঙের।’

শোনা যায়, তিনি যে সাফারি স্যুট পরতেন, তা সারাদিন ব্যবহার করার পর রাতে ধুয়ে নিতেন এবং সার্কিট হাউসের রুমের ফ্যানের বাতাসে শুকিয়ে সকালে আবার তা পরতেন।তিনি প্রায় ২৪ ঘণ্টাই কাজের মধ্যে ব্যস্ত থাকতেন; রাতের বেলা কখন তিনি ঘুমাতেন, তা কারো পক্ষে নির্দিষ্ট করে জানা ছিল কঠিন। তিনি ছিলেন একেবারেই কর্মনিষ্ঠ ও কাজপাগল মানুষ ‘কোনো কাজকে জরুরি মনে করলে তা সঙ্গে সঙ্গেই সম্পন্ন করার চেষ্টা করতেন এবং সময় নষ্ট করতেন না।’অধ্যাপক আরিফ মঈনউদ্দীন বলেন, ‘বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান ও বিশ্বখ্যাত নেতারা রাষ্ট্রপতি জিয়াকে কতটা ভালোবাসতেন ও সম্মান করতেন, তা কল্পনাও করা যায় না।’

তিনি রাষ্ট্রপতির সফরসঙ্গী হিসেবে উত্তর কোরিয়া সফরের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে এ মন্তব্য করে বলেন, তৎকালীন উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রপতি কিম ইল-সুং তার ক্ষমতায় আরোহণের ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। উক্ত সাড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে ১১১টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।অধ্যাপক আরিফ স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আমাদের শেষ সফর পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াকে অসাধারণ সম্মান প্রদর্শন করেন এবং তিনি (জিয়া) মূল অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।’

তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রয়াত জিয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে ইরান-ইরাক যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তিনি গিনি প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট ড. আহমেদ সেকে তুরে-র সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করেন এবং জাপানকে পরাজিত করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

অধ্যাপক আরিফ মঈনউদ্দীন মত প্রকাশ করে বলেন, ‘৩০ মে রাতে জিয়াকে হত্যার ঘটনায় অংশ নেওয়া সেনাসদস্যরা মূলত একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। এটি ছিল একটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্র।’অধ্যাপক আরিফ মঈনউদ্দীন বলেন, ঐতিহাসিক সেই ট্র্যাজেডির ১০ বছর পর ১৯৯১ সালে তৎকালীন যুবলীগ নেতা (১৯৭৮-১৯৮২) প্রয়াত কামাল; যিনি ‘শহরের প্রখ্যাত ‘চিম্বুক রেস্তোরাঁ’র মালিক হিসেবে ‘চিম্বুক কামাল’ নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি রাষ্ট্রপতি জিয়ার হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা সম্পর্কে একটি তথ্য আমার সঙ্গে শেয়ার করেন।

কামাল আমাকে জানান, ২৯ মে সকালে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে অবস্থানরত সেনাবাহিনীর একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা মেজর খালেদ থেকে তিনি এ সংক্রান্ত তথ্য পেয়েছিলেন।অধ্যাপক আরিফ কামালের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘মেজর খালেদ আমাকে ঐদিন অর্থাৎ ২৯মে সকালে বলেন, রাষ্ট্রপতি জিয়ার হত্যার ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানাতে।কামাল, তুমি কাউকে বলো যেন রাষ্ট্রপতি জিয়াকে চট্টগ্রাম আসা থেকে বিরত রাখা হয়, কারণ তাঁকে হত্যা করা হবে। কিন্তু সেই সতর্কবার্তা যথাসময়ে জিয়ার কাছে পৌঁছায়নি।

কারণ, কামাল কাউকে এ তথ্য জানিয়েছিলেন কিনা আমাকে নির্দিষ্ট করতে পারেননি।’আমি কামালকে তীব্র হতাশা নিয়ে জিজ্ঞেস করি, তিনি কেন এমন একটি সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আমাকে জানাননি। কামাল নিচু স্বরে অস্পষ্টভাবে কিছু বলেন, তবে তিনি কারও নাম উল্লেখ না করেই তথ্যটি শেয়ার করেন বলে জানান।অধ্যাপক আরিফের ভাষায়, ‘এমন একজন দূরদর্শী নেতার হত্যাকাণ্ডের পেছনের পরামর্শদাতা, উসকানিদাতা, পরিকল্পনাকারী এবং প্রকৃত উদ্দেশ্য আজও রহস্যাবৃত রয়ে গেছে।’