হাসিনার ক্যারিশমায় হতাশ বিএনপি

 

H-1সরদার সিরাজুল ইসলাম: 
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিশ্বের বৃহৎ গণতন্ত্রের দেশ ভারতে দক্ষিণপন্থী বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদির বিজয়ে বিএনপি উল্লসিত। তারা বিভিন্ন অবস্থান থেকে দাবি করছে, যেহেতু কংগ্রেস এদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহায়ক শক্তি এবং আওয়ামী লীগের মিত্র সেহেতু কংগ্রেস বিপক্ষ বিজেপি বিএনপির বন্ধু। তারা আরও দাবি করে যে, তারেক জিয়া নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে কথা বলেছেন, তাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। মোদি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা সাধারণ এক চা বিক্রেতার সন্তান, ৪ বার গুজরাটের সফল মুখ্যমন্ত্রী। আর তারেক খুনী জিয়াপুত্র, অশিক্ষিত, সন্ত্রাসী, ভারতের বিরুদ্ধে জঙ্গী মদদদাতা এবং বর্তমানে বিভিন্ন মামলার ফেরার আসামি। আইএসআই-এর এজেন্ট। ভদ্রতার খাতিরে ভারত এর প্রতিবাদ করেনি বা এসব খবর ভারতের কোন মিডিয়া খায় না। সংবাদপত্রের বদৌলতে এখন একথা সবাই জানে, তারেক এবং তারেকের বন্ধু বিশ্বের সবচাইতে বড় অস্ত্র চোরাকারবারি পাকিস্তানী দাউদ ইব্রাহিম।
নরেন্দ্র মোদি ১৯৯২ সালে বাবরী মসজিদ ভেঙ্গে রামমন্দির বানানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত ছিলেন এবং এ বছর নতুন করে রামমন্দির বানানোর অঙ্গীকার করেছেন। তার নির্বাচনী প্রচারে সাম্প্রদায়িকতা সবচাইতে বড় মাপে স্থান পেয়েছে। এবং এটাই তার ক্যারিশমা। তবে ১৯৪৭ সালের ভারতের একমাত্র প্রধান শক্তি ছিল কংগ্রেস। পরবর্তী অবস্থানে কমিউনিস্ট পার্টি যা এখন বিভক্ত হয়ে মুমুর্ষু অবস্থায় সোভিয়েত ও চীনপন্থী। পশ্চিমবঙ্গে চীনপন্থী জ্যোতিবসুরা ৩০ বছর প্রাদেশিক সরকার চালিয়েছিল। জ্যোতিবসুর সুযোগ ছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কিন্তু তার কেন্দ্রীয় পার্টি তা হতে দেয়নি। আর কংগ্রেস বহুভাগে বিভক্ত। পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জি, তৃণমূল কংগ্রেস নাম দিয়ে কখনও বিজেপি। গত কংগ্রেস জোটে গিয়ে কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী, পরে প্রাদেশিক নির্বাচনে বিজয় হয়ে মুখ্যমন্ত্রী। এবার কেন্দ্রীয় নির্বাচনে প্রদেশের ৪২টির মধ্যে ৩৪টি (বিজেপি ২, কমিউনিস্ট ২, কংগ্রেস ৪) আসন কাক্সিক্ষত কিং মেকারের খায়েশ তো দূরে থাক বরং মোদির শপথ অনুষ্ঠান বর্জন করে যে অবস্থার সৃষ্টি করেছে তার খেসারত মমতাকে দিতে হবে। এখন নির্বাচনী বিজয়ী নরেন্দ্র মোদি কোন্দিকে যাবেন। তিনি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের সঙ্গেই আছেন। শ্রদ্ধা জানিয়েছেন মহাত্মা গান্ধী, নেহরু এমনকি কংগ্রেসের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জিকেও। এও বলেছেন যে, তার সরকার প্রণব মুখার্জির মতো সফল অর্থমন্ত্রী পেলে ভাল হতো।
গান্ধী পরিবারের আরেক উত্তরাধিকার ইন্দিরা গান্ধীর কনিষ্ঠপুত্র সঞ্জয় গান্ধীর (’৭৬ সালে নিহত) স্ত্রীর মেনকা গান্ধীর সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধীর বনিবনা না থাকায় মেনকা এবং তৎপুত্র বরুণ গান্ধী এখন বিজেপির নীতিনির্ধারক পর্যায় অবস্থান নিয়েছেন।
বিজিপির অন্যতম সাধারণ সম্পাদক ও লোকসভার সদস্য বরুণ গান্ধী হিন্দুস্থান টাইস পত্রিকায় একটি নিবন্ধ লিখেছেন যা প্রথম আলো ২১/০৬/১৪ তারিখে ভাষান্তর হয়ে প্রকাশিত হয়। সুলিখিত তথ্যবহুল জ্ঞানগর্ভ ‘প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের পুনরুজ্জীবন’ শিরোনামের এই নিবন্ধে ‘প্রথমেই, পাকিস্তানকে বরাবরের মতোই একটি বিরক্তিকর প্রতিবেশী হিসেবে থাকবে। নৌঘাঁটি ও করাচী বিমানবন্দরে জঙ্গীদের হামলার পর বোঝা যাচ্ছে সেখানে একটি ক্ষমতার লড়াই চলছে।’
modi-hasina-www.jatirkhantha.com.bdবিএনপি ইতোপূর্বে বেশ ক’বার অপপ্রচার চালায় যে, আওয়ামী লীগ কংগ্রেস তথা ভারতের কাছে দেশ বিক্রি করেছে। এটি মূর্খের ভাবনা। কারণ আওয়ামী লীগের সম্পর্ক ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বের কোন ব্যক্তি বা দলের সঙ্গে নয়। একথা সত্য যে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় কংগ্রেস ভারতের ক্ষমতায় ছিল, তবে সেই সময় কংগ্রেসের কোন প্রতিপক্ষ ভারতে ছিল না। উল্লেখ্য, ১৯৭৫-৮১ সময়কালে শেখ হাসিনা ভারত সরকারের মেহমান ছিলেন।
কিন্তু ১৯৭৭ সালে কংগ্রেস প্রথমবারের মতো পরাজয় বরণ করলেও শেখ হাসিনার মর্যাদার ঘাটতি ছিল না। আরও উল্লেখ্য, ১৯৯৭ সালে ভারতের সঙ্গে শেখ হাসিনার ৩০ বছর মেয়াদী গঙ্গার পানি চুক্তির সময়ও কংগ্রেস ক্ষমতায় ছিল। সে সময় বিজেপি ছিল না। কিন্তু প্রয়াত জিয়া এবং বিএনপি যে আসলে ভারত বিরোধী নয় এবং ছিল না বরং ভারতের ভয়ে ভীত এক তাঁবেদার দল সেটি তো ইতিহাসের অংশ যা বিগত ৩৭ বছরে খুবই লজ্জাজনক। এটি নিয়ে কিঞ্চিত আলোচনা হতে পারে।
১৯৭৪ সালের স্বাধীনতা দিবস সংখ্যার বিচিত্রায় (পৃঃ ৫৩-৫৭) মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান একটি জাতির জন্ম শিরোনামে প্রবন্ধ লিখেছিলেন। এতে তার ভারত প্রীতির কথা বিধৃত ছিল এভাবেÑ ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হচ্ছে আর একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। সে সময়ে আমি ছিলাম পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যার নামে গর্ববোধ করত। তেমনি একটা ব্যাটালিয়ানের কোম্পানি কমান্ডার। সেই ব্যাটালিয়ান এখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীরও গর্বের বস্তু।
খেমকারান রণাঙ্গনের বেদিয়ানে তখন আমরা যুদ্ধ করেছিলাম। সেখানে আমাদের ব্যাটালিয়ান বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিল। এই ব্যাটালিয়ানই লাভ করেছিল পাক বাহিনীর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বাধিক বীরত্ব পদক। ব্যাটালিয়ানের পুরস্কার বিজয়ী কোম্পানি ছিল আমার কোম্পানি, আলফা কোম্পানি। এই কোম্পানি যুদ্ধ করেছিল ভারতীয় সপ্তদশ ইনফ্যান্ট্রি, ষোড়শ পাঞ্জাব ও সপ্তম লাইট ক্যাভারলির (সাঁজোয়া বহর) বিরুদ্ধে। এই কোম্পানির জওয়ানরা বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে, ঘায়েল করেছে প্রতিপক্ষকে। বহুসংখ্যক প্রতিপক্ষকে হতাহত করে, যুদ্ধবন্দী হিসেবে আটক করে এই কোম্পানি অর্জন করেছিল সৈনিকসুলভ মর্যাদা, প্রশংসা পেয়েছিল তাদের প্রীতির।
যুদ্ধ বিরতির সময় বিভিন্ন সুযোগে আমি দেখা করেছিলাম কিছুসংখ্যক ভারতীয় অফিসার ও সৈনিকের সঙ্গে। আমি তখন তাদের সঙ্গে কোলাকুলি করেছি, হাত মিলিয়েছি। আমার ভাল লাগত তাদের সঙ্গে হাত মেলাতে। কেননা আমি তখন দেখেছিলাম, তারাও অত্যন্ত উঁচুমানের সৈনিক। আমরা তখন মতবিনিময় করেছিলাম। সৈনিক হিসেবেই আমাদের মাঝে একটি হৃদ্যও গড়ে উঠেছিল, আমরা বন্ধুতে পরিণত হয়েছিলাম। এই প্রীতিই দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশে হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে পাশাপাশি ভাইয়ের মতো দাঁড়িয়ে সংগ্রাম করতে উদ্বুদ্ধ করেছে আমাদের।
জিয়াউর রহমান ভারতের ভয়ে যে কত বেশি আতঙ্কিত ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় বেশ কিছু ঘটনায়। জিয়া ক্ষমতা দখলের পর ঢাকার রাজপথে কোরানের আয়াত লিখিত অসংখ্য বোর্ড স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু ১৯৭৯ সালের ১৬ এপ্রিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোবাররজি দেশাইয়ের ঢাকা আগমনের পূর্বে ওই বিলবোর্ড মুছে ফেলেছিলেন। বঙ্গবন্ধু ভারতের সঙ্গে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি করে আদায় করেছিলেন ৪৪ হাজার কিউসেক আর পরে চুক্তিবিহীন অবস্থায় শেষ পর্যন্ত জিয়া তার পরিবর্তে ৩৪ হাজার কিউসেক নিয়ে খুশি ছিলেন। ’৯৬ সালে শেখ হাসিনা ৩০ বছর মেয়াদী চুক্তি করেন। জিয়ার সময় দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপে ভারতীয় সৈন্য অবতরণের বিরুদ্ধে সংসদে আলোচনা পর্যন্ত করতে দেয়া হয়নি। অথচ তালপট্টি নিয়ে বঙ্গবন্ধু ভারতের ‘বড়ভাই’ সুলভ আচরণের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন। জেনারেল এরশাদের ভারত তোষণের প্রমাণ রয়েছে বিভিন্ন কর্মকা-ে; যার একটি প্রমাণ হচ্ছে ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর এরশাদ ভারত যান এবং শোক প্রকাশ করে রাজীব গান্ধীকে বলেন, ‘শুধু আপনার নয়, আমার মাও মারা গেলেন।’
ম্যাডামের ভারত সফরের শুরু হয়েছিল ভারতের সংসদে বিরোধী দলনেতা বিজেপির সুষমা স্বরাজের সাক্ষাত দিয়ে। বিজেপি সভাপতি, ভারতের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর স্বল্পতম সময়ের দর্শন মিললেও কংগ্রেস নেতা সোনিয়া গান্ধীর দর্শন মেলেনি। অথচ সেটি তার ইচ্ছাসূচীর মধ্যে সর্বাধিকারেই ছিল।
ম্যাডামের সফরের শেষে পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত কলামে সফরের মূল্যায়ন হয়েছে এবং আশাবাদ ব্যক্ত হয়েছে এই বলে যে, ম্যাডামের দল ভারত বিরোধীতা নীতি ত্যাগ করেছে এবং ভারতের স্বার্থ রক্ষায় আরও বেশি সুবোধ হওয়ার অঙ্গীকার করেছে। উদ্ধৃত কলামের শিরোনামই বলে দেয় সফরের সারকথা। অধিক মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।
ম্যাডাম আবার ক্ষমতায় যাওয়ার দিবা স্বপ্ন দেখছেন। বরিশালের ১৯/১১/১২ তারিখের জনসভায় বলেন ‘আরেকবার সুযোগ দিন, দেশের চেহারা পাল্টে দেব। (প্রথম আলো/জনকণ্ঠ ২০/১১/১২)।’ পুত্র তারেকের জন্মদিনে বয়সে প্রবীণতার সীমাবদ্ধতা উপেক্ষা করে বরাবরের মতো ম্যাডাম একটি গাঢ় নীল শাড়ি পরে এই প্রথমবার পুত্র বন্দনায় নেমেছিলেন। সবাইকে স্তম্ভিত করে বলেছেন ‘তারেক ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা।’ ‘তারেক সৎ’ ছেলে বলে ম্যাডাম যা বলেছেন তা তার দলের লোকরাও বিশ্বাস করে না। তারেকের দুর্নীতির তথ্য খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারী দফতরে সুরক্ষিত। মার্কিন ফেডারেল ব্যুরো অব ইন্টেলিজেন্টের কর্মকর্তারা ঢাকায় এসে তারেকের দুর্নীতির সাক্ষী দিয়ে গেছে। আরাফাত কোকোর বিদেশে পাচারকৃত এবং সিঙ্গাপুর ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রা ২০ লাখ ৪১ হাজার ডলার (প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি টাকা) দুদকের তহবিলে (ব্যাংকে) জমা হয়েছে (প্রথম আলো, জনকণ্ঠ ২৩/১১/১২)। তারেকের হিসেবটা আরও বড়। তারেক লন্ডনে জাঁকজমকভাবে আছেন। কি চিকিৎসা হচ্ছে, কে জানে!
লেখাটা শুরু হয়েছিল নরেন্দ্র মোদির বিজয় নিয়ে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদি সরকারের সম্পর্ক কি হবে? স্বাভাবিকভাবেই তার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। কিন্তু জাপান সফরের কারণে শেখ হাসিনা যেতে না পারলেও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন জাতীয় সংসদের স্পীকার শিরীন সারমিন চৌধুরী। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ ভারতীয় পদস্থ কর্মকর্তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ আগামী ২৬ জুন বাংলাদেশ সফরে আসছেন। গত ১৩ জুন বিজেপির সঙ্গে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সুসম্পর্কের ওপর ‘নিজেই বাজারে গিয়ে শেখ হাসিনার জন্য শাড়ি কিনেছিলেন সুষমা স্বরাজ’ শিরোনামে প্রতিবেদন লিখেছেন সিনিয়র সাংবাদিক নঈম নিজাম। এখানে লেখাটি থেকে খানিকটা উদ্ধৃত্তি করার লোভ সামলানো গেল না, ‘২০০১ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর প্রথম দিল্লি সফরে গেলেন শেখ হাসিনা।
Hasina-Kaleda--------------২০০২ সালের কথা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখন বিরোধীদলীয় নেতা। এর মধ্যে এক সকালে শেখ হাসিনার তখনকার সহকারী একান্ত সচিব আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিমকে ফোন করেন তথ্যমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের একান্ত সচিব। তিনি বললেন, সুষমা স্বরাজ ব্যক্তিগতভাবে তার বাড়িতে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে। আলাউদ্দিন নাসিম বললেন, নেত্রীর টাইট শিডিউল। তবুও সুষমা স্বরাজ হোটেলে এলে একটা টাইম নির্ধারণ করতে পারি বিকালের দিকে। তুমি আমাকে জানাও। কিছুক্ষণ পর আবার টেলিফোন এলো নাসিমের ফোনে। তবে এবার একান্ত সচিব নন, ফোনে সরাসরি কথা বললেন সুষমা স্বরাজ নিজেই। বললেন, মি. নাসিম আপনি হয়ত প্রটোকল চিন্তা করে আমাকে হোটেলে আমন্ত্রণ করেছেন। এটা প্রটোকলের বিষয় নয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে আমার বাসভবনে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি মুজিবকন্যা শেখ হাসিনাকে।
গত ২৬ বছর আমি শপিংয়ে যাইনি। কিন্তু গতকাল বাজারে গিয়ে তার জন্য একটি শাড়ি কিনেছি। আজ একটু পর তার জন্য বিকালের নাস্তা বানাব। আপনি তাকে এখনই এই বার্তাটি দিন। আলাউদ্দিন নাসিম ছুটে গেলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর কক্ষে। বিস্তারিত জানালেন নেত্রীকে। শেখ হাসিনা প্রথম থেকে শেষ সব শুনলেন। তারপর বললেন, চলো আজ বিকালেই যাব সুষমার বাড়ি। যেমন কথা তেমন কাজ। বিকালেই সফরসঙ্গীদের নিয়ে ছুটে গেলেন সুষমার বাড়িতে। বাড়ির গেটে স্বামীকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলনে সুষমা নিজেই। স্বাগত জানালেন বাংলাদেশের বিরোধীদলীয় নেতাকে।
জম্পেশ আড্ডা জমে ওঠে দুই নেত্রীর মধ্যে। আলোচনা শুধু দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক সব কিছু নিয়েই তারা কথা বলেন। দীর্ঘ আড্ডার পর শেখ হাসিনা ফিরে আসেন তার হোটেলে। বিদায়ের আগে সুষমা ভোলেননি নিজের হাতে কেনা শাড়িটি তুলে দিতে। এ সময় সুষমা বললেন, দেখো ২৫-২৬ বছর বাজারে যাই না। আমার সব কিছু কিনে দেয় বোন। কিন্তু অনেকদিন পর বাজারে গেলাম শুধু তোমার জন্য শাড়ি কিনতে। শেখ হাসিনা ধন্যবাদ জানালেন সুষমাকে। অনেক বছর পর শেখ হাসিনা এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। অন্যদিকে সুষমা স্বরাজ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। মোদি সরকারের প্রধান নীতিনির্ধারকদের একজন।’
সুষমা স্বরাজ প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও সাক্ষাত করেছেন রাষ্ট্রপতি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ এবং বিএনপি-জামায়াত জোটনেত্রী ম্যাডাম খালেদা জিয়ার সঙ্গে। সরকারের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনায় জঙ্গীবাদ দমন, দেশের উন্নয়ন এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ভূয়সী প্রশংসা করেন, তিস্তা চুক্তি এবং বর্ডারে সিটমহল সমস্যার সমাধানের আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। সুষমার বাংলাদেশে অবস্থানকালেই (২৭.০৬.১৪) কলকাতায় আটক নারায়ণগঞ্জের ৭ খুনের আসামি নুর হোসেনকে ফেরত পাঠাতে ভারতের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন বলে খবরে প্রকাশ। বিএনপি-জামায়াত জোটনেত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতকালে (বস্তুত ম্যাডামের উপদেষ্টা শমসের মুবিন চৌধুরীর বক্তব্যে) তিনি ক্ষমতায় যাওয়ার আকুতি প্রকাশ করে অভিযোগ করেছেন যে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র নেই। এর জবাবে ঢাকা ত্যাগের প্রাক্কালে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সুষমা স্বরাজের সফরসঙ্গী সৈয়দ আকবার উদ্দিন বলেছেন, এগুলো দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার হওয়ায় ভারতের হস্তক্ষেপ করার কোন সুযোগ নেই (২৭.০৬.১৪)। তবে শতব্যস্ততার মধ্যেও সুষমা স্বরাজ ২৭.০৬.১৪ তারিখ সকালে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে পূজায় অংশগ্রহণ করেছেন।
নরেন্দ্র মোদি যেভাবেই ক্ষমতায় আসেন না কেন ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণপ্রজাতন্ত্রী বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের দেশ। সেখানে জাতিধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে দেখা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সরকার পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু সরকারের কোন মন্ত্রণালয়ের কোন কর্মকর্তার পরিবর্তন হয়নি। রাষ্ট্রীয়, পররাষ্ট্রীয় নীতিমালায় পরিবর্তনের কোন সম্ভাবনা নেই। কেননা, কংগ্রেস যে পররাষ্ট্রনীতি অবলম্বন করেছিল তাতে বিজেপির দ্বিমত ছিল না।
লেখক : গবেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

আপনি চাইলে এই এইচটিএমএল ট্যাগগুলোও ব্যবহার করতে পারেন: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <strike> <strong>

Facebook Auto Publish Powered By : XYZScripts.com