প্লট জালিয়াতি রাসেল জেলে আশফাক পালিয়ে
ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৯-এ হাজির হয়ে জামিন প্রার্থনা করলে বিচারক মো. আব্দুস সালাম তাঁর আবেদন নাকচ করে তাঁকে সরাসরি কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
বিশেষ প্রতিনিধি : রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট জালিয়াতি ও দুর্নীতির মামলায় ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পপতি ও আম্বার গ্রুপের চেয়ারম্যান শওকত আজিজ রাসেল অবশেষে আদালতের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন।
আজ রোববার বিকেলে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৯-এ হাজির হয়ে জামিন প্রার্থনা করলে বিচারক মো. আব্দুস সালাম তাঁর আবেদন নাকচ করে তাঁকে সরাসরি কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এর মাধ্যমে দীর্ঘ ২২ বছর আগের এক চাঞ্চল্যকর political জালিয়াতি এবং তার আড়ালে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক অর্থ পাচারকাণ্ডের আইনি পরিণতি দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। তবে মামলার অন্যতম মূল হোতা ও রাসেলের ভাই পারটেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশফাক আজিজ রুবেল এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন।
যেভাবে প্লট বরাদ্দ পেয়েছিল তারা-
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই দুর্নীতির বীজ রোপণ করা হয়েছিল ২০০১ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে, যখন এই দুই ভাইয়ের বাবা এম এ হাসেম নোয়াখালী-২ আসনের বিএনপির প্রভাবশালী সংসদ সদস্য ও পারটেক্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।
• মূল আবেদন আইনিভাবে বাতিল: শওকত আজিজ রাসেল (চেয়ারম্যান, আম্বার গ্রুপ ও সভাপতি, বিটিএমএ) এবং তাঁর ভাই আশফাক আজিজ রুবেল (এমডি, পারটেক্স গ্রুপ) প্রথমে পূর্বাচল প্রকল্পে ১০ কাঠার দুটি প্লটের জন্য আবেদন করেছিলেন। কিন্তু প্রথম দফায় প্লট না পাওয়ায় তারা ২০০৩ সালের ১৮ই ডিসেম্বর তাদের জামানতের টাকা রাজউক থেকে সম্পূর্ণ উত্তোলন করে নেন। আইন অনুযায়ী, জামানত তোলার সাথে সাথেই তাদের মূল আবেদনটি বাতিল হয়ে যায়।
• নতুন আবেদন ছাড়াই নজিরবিহীন জালিয়াতি:
টাকা তুলে নেওয়ার পর তারা আর কোনো নতুন আবেদন কিংবা নতুন করে কোনো ফি জমা দেননি। কিন্তু ২০০৪ সালের ২রা জুন রাজউকের ৮ম বিশেষ বোর্ড সভায় political ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করা হয়। সিলেকশন কমিটির কোনো সুপারিশ ছাড়াই তাদের সেই বাতিল হয়ে যাওয়া আবেদনের বিপরীতে অবৈধভাবে মোট ২০ কাঠার দুটি মূল্যবান প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়।
ঘটনার নায়ক যারা-
তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, এই নজিরবিহীন জালিয়াতি এককভাবে করা সম্ভব ছিল না। এর পেছনে কাজ করেছে রাজউকের তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তাদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট, যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রকৃত ও বৈধ আবেদনকারীদের বঞ্চিত করেছিলেন। এই অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গের (Criminal Breach of Trust) দায়ে আদালত রাসেল ও তাঁর ভাইয়ের পাশাপাশি রাজউকের তৎকালীন শীর্ষ ৬ কর্মকর্তাকেও সমপরিমাণ সাজা দিয়েছেন। এই চক্রের অন্যতম প্রধানরা হলেন:
• ইকবাল উদ্দিন চৌধুরী (সাবেক চেয়ারম্যান, রাজউক): জালিয়াতি প্রক্রিয়ার মূল অনুমোদনকারী হিসেবে তাঁকে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ২০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
• সদস্য সিন্ডিকেট: রাজউকের সাবেক ৫ জন বোর্ড সদস্য— এস ডি ফয়েজ (উন্নয়ন), এ কে এম ওয়াহেদুল ইসলাম (পরিকল্পনা), এস এম জাফর উল্লাহ (অর্থ), এইচ এম জহুরুল হক (প্রশাসন ও ভূমি) এবং মো. রেজাউল করিম তরফদার (এস্টেট)। অবৈধ প্লট বরাদ্দের নথিপত্র তৈরি ও সিলেকশন কমিটিকে বাইপাস করার মূল কারিগর ছিলেন তারা। অপরাধে সরাসরি অংশ নেওয়ার কারণে তাদের প্রত্যেককে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আদালতের চূড়ান্ত রা-
এই অনিয়মের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তৎকালীন উপ-সহকারী পরিচালক সিলভিয়া ফেরদৌস বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে ২০১৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর দুদকের উপপরিচালক মির্জা জাহিদুল আলম আদালতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেন।
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে গত ১৩ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে আসামিদের অনুপস্থিতিতে আদালত এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন:
• দ্বৈত ধারায় সাজা: আসামিদের ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা এবং দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে দুই ধারায় ৭১ বছর করে মোট ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে উভয় সাজা একসাথে (concurrently) চলবে বিধায় আসামিদের প্রকৃতপক্ষে ৭ বছর কারাভোগ করতে হবে।
• জরিমানা ও খালাস: প্রত্যেক আসামিকে মোট ২০ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে, যা অনাদায়ে আরও ১ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে দণ্ডবিধির ৪২০ ধারার (প্রতারণা) অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আসামিরা উক্ত ধারা থেকে খালাস পেয়েছেন।
• সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত: আদালত জালিয়াতি করে নেওয়া পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের সেক্টর-১, রোড-৪০৫ এর ০১১ এবং ০১৩ নম্বর প্লটসহ তদন্তে উঠে আসা বিতর্কিত ১১১৩ নম্বর প্লটের বরাদ্দ সম্পূর্ণ বাতিল করে তা সরাসরি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দিয়েছেন।
ঋণ খেলাপি ও অফশোর অর্থ পাচার-
অনুসন্ধানে এই জালিয়াতির পেছনে থাকা আরও ভয়ংকর অর্থনৈতিক অপরাধের চিত্র উঠে এসেছে। শওকত আজিজ রাসেল ও আশফাক আজিজ রুবেল একদিকে বাংলাদেশে পারটেক্স গ্রুপ ও আম্বার গ্রুপের বিভিন্ন অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ খেলাপি করে রাখছেন, অন্যদিকে দেশের ব্যাংকিং খাতকে সংকটে ফেলে অবৈধ উপায়ে হুন্ডি ও অফশোর চ্যানেলের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ যুক্তরাজ্য (UK) ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে (USA) পাচার করেছেন।
• যুক্তরাজ্যে ‘শ্যাডো ডিরেক্টর’ নেটওয়ার্ক: আইনি জটিলতা ও ঋণ খেলাপির পরিচয় লুকাতে রাসেল লন্ডনে সরাসরি নিজের নামে সম্পত্তি না কিনে তাঁর পরিবারের সদস্য ও বিশ্বস্ত সহযোগীদের নামে কোম্পানি ও সম্পত্তি রেজিস্ট্রি করেছেন। ব্রিটিশ কোম্পানি হাউজের নথিতে তাঁর নিয়ন্ত্রিত একাধিক শেল কোম্পানির সন্ধান পাওয়া গেছে, যেখানে তিনি মূলত একজন ‘শ্যাডো ডিরেক্টর’ বা নেপথ্যের নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করছেন।
• আমালিকায় রিয়েল এস্টেট সাম্রাজ্য: আমেরিকার নিউইয়র্ক ও ফ্লোরিডায় ব্যাংকিং খাতের পাচারকৃত অর্থ বিভিন্ন ট্রাস্ট ও অফশোর হোল্ডিং কোম্পানির মাধ্যমে স্তরে স্তরে (Layering) ঘুরিয়ে বেনামে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক সম্পত্তি ক্রয় করেছেন বলে প্রমাণ মিলেছে।
বর্তমান পরিস্থিতি ও পরবর্তী আইনি মোড়
গত ১৩ অক্টোবর রায় ঘোষণার সময় শওকত আজিজ রাসেল আদালতে অনুপস্থিত থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে সাজাপ্রাপ্ত গ্রেফতারি পরোয়ানা (Conviction Warrant) জারি হয়েছিল। বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, পলাতক অবস্থায় উচ্চ আদালতে আপিল বা জামিন আবেদন করা যায় না। মূলত হাইকোর্টে আপিল দায়ের করার আইনি যোগ্যতা অর্জনের উদ্দেশ্যেই আজ ১ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে শওকত আজিজ রাসেল নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করেন।
বর্তমানে তিনি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী রয়েছেন। তাঁর আইনজীবীরা সামাজিক ও ব্যবসায়িক সিআইপি (CIP) মর্যাদার ভিত্তিতে কারাগারে প্রথম শ্রেণীর বন্দীর সুবিধা (ডিভিশন) চেয়ে আবেদন করেছেন। বিটিএমএ (BTMA)-এর বর্তমান এই সভাপতির লিগ্যাল টিম জানিয়েছে, তারা দ্রুতই উচ্চ আদালতে (হাইকোর্ট) আপিল দায়ের করবেন।
অন্যদিকে, মামলার অন্যতম প্রধান সাজাপ্রাপ্ত আসামি ও পারটেক্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশফাক আজিজ রুবেল এখনও পলাতক থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। দেশের অন্যতম শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতার এভাবে কারাগারে যাওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের করপোরেট ও ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।




