• মঙ্গলবার , ৩ নভেম্বর ২০২৬

পোশাক খাতে তীব্র অসন্তোষ: সংঘাতের পর ৪ শতাধিক কারখানায় ছুটি


প্রকাশিত: ৯:৫২ পিএম, ২ নভেম্বর ২৬ , সোমবার

নিউজটি পড়া হয়েছে ৩৩ বার

 

 

 

 

বিশেষ প্রতিনিধি : ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০,০০০ টাকা করার একদফা দাবিতে গতকাল ১ নভেম্বর ও আজ ২ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে দেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে গার্মেন্টস শ্রমিকদের চলমান বিক্ষোভ এক তীব্র ও সংঘাতময় রূপ নিয়েছে।

জীবনযাত্রার আকাশছোঁয়া ব্যয় ও নিত্যপণ্যের মূল্যস্ফীতির বিপরীতে বেঁচে থাকার রসদ নিশ্চিত করতে ঢাকার মিরপুর, গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জের সড়কগুলোতে গতকাল থেকে শুরু হওয়া দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, মহাসড়ক অবরোধ, কাভার্ডভ্যানে অগ্নিসংযোগ এবং সচল কারখানায় ভাঙচুরের জেরে আজ ২ নভেম্বর চার শতাধিক পোশাক কারখানা সাধারণ ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে।

দেশের তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদনকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলা এই আন্দোলনের নেপথ্যে বহিরাগত ও রাজনৈতিক ইন্ধন রয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে উঠে এসেছে; যার পরিপ্রেক্ষিতে আজ দুপুর পর্যন্ত মিরপুর ও গাজীপুর থেকে অন্তত ৫৯ জনকে গ্রেপ্তার এবং সাড়ে ১০ হাজার অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির নামে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

মিরপুরে পুলিশ-শ্রমিক ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ভাঙচুর
গতকাল ১ নভেম্বরের উত্তেজনার পর আজ ২ নভেম্বর সকাল পৌনে ৯টা থেকেই ঢাকার মিরপুর-১৪ ও কাফরুল এলাকায় নতুন করে জড়ো হতে থাকেন শ্রমিকরা। তারা মিছিল নিয়ে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের গতিরোধ করে। আন্দোলনকারীরা মিরপুর-২ নম্বর বড়বাগ এলাকার ‘সিরাজগঞ্জ ফ্যাশন লিমিটেড’ ও ‘দেশওয়ান অ্যাপারেলস’ নামের দুটি সচল কারখানায় ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ভাঙচুর চালায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জ ও ব্যাপক কাঁদানে গ্যাস (টিয়ারশেল) নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। দুপুরের পর থেকে পুরো মিরপুর এলাকায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও যৌথ বাহিনী কঠোর অবস্থান নেওয়ায় বর্তমানে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।

সাভার-আশুলিয়ায় কাভার্ডভ্যানে আগুন, ২৬৪ কারখানা বন্ধ
সাভার ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে আজ সকাল থেকেই শ্রমিক অসন্তোষ চরম রূপ নেয়। টঙ্গী-আশুলিয়া-ইপিজেড সড়কের নরসিংহপুর ও নিশ্চিন্তপুর এলাকায় শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা সড়কে থাকা একটি কাভার্ডভ্যানে অগ্নিসংযোগ করে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জানমালের নিরাপত্তা বিবেচনায় আজ ২ নভেম্বর দুপুরের মধ্যে সাভার-আশুলিয়া এলাকার ২৬৪টি পোশাক কারখানা সাধারণ ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
গাজীপুরে ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন, মহাসড়ক স্তবির
গাজীপুরের কোনাবাড়ী, মৌচাক, চন্দ্রা ও ভোগড়া এলাকায় গতকাল থেকেই ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে রেখেছিলেন আন্দোলনকারীরা। আজ সকালে বেশ কিছু যানবাহনে ভাঙচুর এবং পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় একটি ঝুট গুদামে অগ্নিসংযোগের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও বিজিবির যৌথ অ্যাকশন শুরু হয়। গাজীপুর ও সাভারের সীমান্ত এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় জরুরিভিত্তিতে ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে গাজীপুর অঞ্চলে প্রায় দেড় শতাধিক কারখানা বন্ধ রাখা হয়েছে।
নতুন মোড় নারায়ণগঞ্জে, লিংক রোড অবরোধ

আন্দোলন এতদিন ঢাকা ও গাজীপুরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও আজ ২ নভেম্বর দুপুর থেকে নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে নারায়ণগঞ্জ। ফতুল্লা ও কুতুবাইল কাঠেরপুল এলাকার বেশ কয়েকটি কারখানার শত শত শ্রমিক সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। তারা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের শিবু মার্কেট এলাকায় টায়ার জ্বালিয়ে আগুন ধরিয়ে দিলে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে বিকেল ৪টার দিকে পুলিশ ও শিল্প পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা শ্রমিকদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরিয়ে দিলে যান চলাচল শুরু হয়।

হতাহত ও জখমের সর্বশেষ পরিস্থিতি
চলতি মাসের ১ ও ২ তারিখের সরাসরি সংঘর্ষে নতুন করে কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। তবে এর আগের দিনগুলোতে মিরপুর ১৪ ও কচুক্ষেত এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে গুরুতর আহত পোশাকশ্রমিক আল আমিন (১৮) ও ঝুমা আক্তার (১৫) বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। এছাড়া আজকের ইটপাটকেলের আঘাতে গাজীপুর ও আশুলিয়ায় বিজিবি ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের বেশ কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছেন।

পুলিশের কঠোর আইনি পদক্ষেপ ও গ্রেপ্তার
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখতে পুলিশ ও যৌথ বাহিনী সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে। মিরপুর ও পল্লবী থানায় সরকারি কাজে বাধা এবং ভাঙচুরের অভিযোগে এ পর্যন্ত ৫টি মামলা করা হয়েছে, যেখানে অজ্ঞাতপরিচয় সাড়ে ১০ হাজার মানুষকে আসামি করা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ ও তদন্তের ভিত্তিতে মিরপুর থেকে ২৯ জন এবং গাজীপুরসহ দেশজুড়ে মোট ৫৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঢাকা জেলা শিল্প পুলিশ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শ্রমিকদের এই যৌক্তিক আন্দোলনের আড়ালে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে সুনির্দিষ্ট কিছু বহিরাগত গোষ্ঠী ও নিষিদ্ধ সংগঠনের সক্রিয় ইন্ধন রয়েছে এবং তদন্ত সাপেক্ষে তাদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে।

বিজিএমইএ-র অনির্দিষ্টকালের লকআউটের হুঁশিয়ারি

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) চলমান এই সহিংসতা ও কারখানায় ভাঙচুরের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে, শ্রমিকদের দাবি পর্যালোচনায় সরকার নতুন ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। এরপরেও যদি কারখানায় হামলা ও ভাঙচুর অব্যাহত থাকে, তবে মালিকপক্ষ শ্রম আইনের ১৩(১) ধারা প্রয়োগ করে ‘কাজ নেই, মজুরি নেই’ নীতিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য সব কারখানা সম্পূর্ণ লকআউট বা বন্ধ করে দিতে হবে।