• শুক্রবার , ৭ আগস্ট ২০২৬

খুনি হাসিনার দোসররা তো চাইবেই আমরা ওই জায়গায় আটকে থাকি: শামা ওবায়েদ


প্রকাশিত: ১১:২৪ পিএম, ৬ আগস্ট ২৬ , বৃহস্পতিবার

নিউজটি পড়া হয়েছে ৫৬ বার

আদালতের দৃষ্টিতে ‘পলাতক আসামি’ শেখ হাসিনা যাতে দিল্লিতে বসে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাতে না পারেন, সেজন্য আগেই ভারত সরকারের সহযোগিতা চেয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু তারপরও তাকে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলার সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বুধবার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানানো হয়

 

 

বিশেষ প্রতিনিধি : মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ফাঁসির দণ্ড পাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতে বক্তব্য রাখার সুযোগ করে দেওয়ায় শামা ওবায়েদ বলেন, “দেখেন, একটা দেশের সাথে একটা সরকার, একটা দেশের সম্পর্কের তো বহুমুখী দিক থাকে। এখন খুনি হাসিনা বা তার দোসররা তো চাইবেই যে, আমরা ওই জায়গায় আটকে থাকি। বাংলাদেশতো একটা জায়গায় আটকে থাকতে পারে না।

“আমি আগেই বলেছি, ভারতের সাথে আমাদের অনেক সংলাপ হওয়া প্রয়োজন, আলোচনার প্রয়োজন আছে, আমাদের বিভিন্ন ইস্যু আছে। জ্বালানি নিয়ে আমাদের সহযোগিতা আছে, আমাদের পানি নিয়ে ওদের সাথে বিরাট বিষয় আছে, সীমান্ত নিয়ে বিষয় আছে—তো এগুলোতো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে মনে করছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক প্রশ্নে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আপনারা আমাদের বিবৃতি দেখেছেন। বিবৃতিতে কূটনৈতিক ভাষায় যতটুকু একটি দেশকে বোঝানো যায়, সেটা আমরা বলেছি, চেষ্টা করেছি। এবং এর আগে আমরা কিন্তু বারবার বলেছি যে, ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে যে, বাংলাদেশের সাথে তাদের সম্পর্ক তারা কেমন চায়।”

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে বুধবার নয়াদিল্লিতে সাউথ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি সাউথ এশিয়া) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অডিও কলে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। তিনি সেখানে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নেরও উত্তর দেন।

শেখ হাসিনা বলেন, তিনি ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন, তবে এখনই সুনির্দিষ্ট কোনো দিন তারিখ ঘোষণা করবেন না।বক্তৃতায় তিনি অভিযোগ করেন, কয়েকটি সংগঠন ২০২৪ সালের ছাত্র বিক্ষোভকে ‘সহিংস আন্দোলনে’ পরিণত করেছিল, তবে এ বিষয়ে তিনি কোনো প্রমাণ দেননি।২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন দমাতে প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে গত নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে তার অনুপস্থিতিতেই মৃত্যুদণ্ড দেয়।

সেই সময়ের হত্যাকাণ্ডের জন্য দুঃখ প্রকাশ বা ক্ষমা চাইবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান শেখ হাসিনা। মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের পাশাপাশি বর্তমান বিএনপি সরকারেরও সমালোচনা করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি হাসিনা। তিনি দাবি করেন, সরকার এখন ঋণ করে চলছে।

আদালতের দৃষ্টিতে ‘পলাতক আসামি’ শেখ হাসিনা যাতে দিল্লিতে বসে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাতে না পারেন, সেজন্য আগেই ভারত সরকারের সহযোগিতা চেয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু তারপরও তাকে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলার সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বুধবার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানানো হয়।

বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, “একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি যখন ভারতের মাটিতে বসে এই ধরনের কথা বলে এবং ভারত সরকার সেটা অনুমোদন করে, তখন অবশ্যই বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের মানুষের জন্য একটা উদ্বেগের জায়গা তৈরি হয় যে, ভবিষ্যতে আমাদের সম্পর্কটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।”

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে টানাপড়েনের পর বিএনপি সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার দিকে যাওয়ার কথা তুলে ধরে এক সাংবাদিক জানতে চান, শেখ হাসিনার বক্তব্যের মাধ্যমে সেখান থেকে দুদেশ পিছিয়ে গেল কি-না। উত্তরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “ভারত আর বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নত হোক, আমি বিশ্বাস করি যে দুই দেশের সরকার, দুই দেশের জনগণ সেটা চায়।

“কিন্তু ভারতের মাটিতে বসে স্বৈরাচারী, ফ্যাসিবাদী, সাজাপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের লোকজন এবং আওয়ামী লীগের প্রধান যদি এই ধরনের ষড়যন্ত্রমূলক কাজকর্ম চালিয়ে যেতে থাকে এবং সেটা যদি ভারত সরকার এখনই বন্ধ না করে, এই মুহূর্তে বন্ধ না করে, তাহলে অবশ্যই সেটা বাংলাদেশের জনগণের জন্য একটা উদ্বেগের জায়গা তৈরি করে।”

প্রতিমন্ত্রী বলেন, “প্রথমত কথা হচ্ছে, ভারত তাদের মাটিতে স্বৈরাচারী, ফ্যাসিবাদী, সাজাপ্রাপ্তদের আশ্রয় দিয়ে রেখেছে। তার উপরে এখন এসে তাদের বক্তব্যগুলো তারা চালিয়ে যেতে দেবে কিনা, অনুমোদন করবে কিনা—সেই সিদ্ধান্তটা ভারতকে নিতে হবে।”দিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর কড়া প্রতিক্রিয়া জানানোর ২৪ ঘণ্টা পেরোনোর আগেই বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতের হাই কমিশনারের সাক্ষাতে ভারত থেকে গ্যাস বা বিদ্যুৎ চাওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করেন একজন সাংবাদিক।

উত্তরে শামা ওবায়েদ বলেন, “দেখেন, একটা দেশের সাথে একটা সরকার, একটা দেশের সম্পর্কের তো বহুমুখী দিক থাকে। এখন খুনি হাসিনা বা তার দোসররা তো চাইবেই যে, আমরা ওই জায়গায় আটকে থাকি। বাংলাদেশতো একটা জায়গায় আটকে থাকতে পারে না।

“আমি আগেই বলেছি, ভারতের সাথে আমাদের অনেক সংলাপ হওয়া প্রয়োজন, আলোচনার প্রয়োজন আছে, আমাদের বিভিন্ন ইস্যু আছে। জ্বালানি নিয়ে আমাদের সহযোগিতা আছে, আমাদের পানি নিয়ে ওদের সাথে বিরাট বিষয় আছে, সীমান্ত নিয়ে বিষয় আছে—তো এগুলোতো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে।”

তিনি বলেন, “​এখানে ২৪ ঘণ্টা বা ৩৬ ঘণ্টার ব্যাপার নয়, এই আলোচনাগুলো চলবে, এই সংলাপগুলো চলবে।

“কিন্তু ওইটাওতো একটা বার্নিং ইস্যু, যা জুলাই যোদ্ধাদেরকে আহত করে, যা জুলাই যোদ্ধাদের পরিবারদেরকে আহত করে, যা বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করে, যা বাংলাদেশের ১৭ কোটি গণতন্ত্রকামী মানুষ—যারা যুদ্ধ করেছে, প্রাণ দিয়েছে, রক্ত দিয়েছে—তাদেরকে আহত করে। সেই জায়গাটায় ভারতকে আরও বেশি সংবেদনশীল হতে হবে এবং ভবিষ্যতে তারা কী করতে চায়, সে বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”

ঢাকা থেকে বারবার অবস্থান জানানোর পরও শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন হতে দেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে এক সাংবাদিক জানতে চান, “এরকম যদি চলতে থাকে, তাহলে শীর্ষ পর্যায়ের সফরের মত ভালো সম্পর্ক কি থাকবে? এক্ষেত্রে কতটুকু সীমারেখা বাংলাদেশ টানবে?”

উত্তরে শামা ওবায়েদ বলেন, “ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ। বাংলাদেশকে নিয়ে তাদের পররাষ্ট্রনীতি কী হবে, তা ভারতকে নিজেকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সুতরাং আমরা চাই ভালো সম্পর্ক থাকুক, দুই দেশের জনগণের স্বার্থে।

“কিন্তু সম্পর্কটাতো হতে হবে সমতার ভিত্তিতে, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্মানের জায়গা রেখে এবং নিজেদের স্বার্থটাকে বজায় রেখে। তো সেটা ভারত বুঝতে পারলে সবার জন্য মঙ্গল।”

এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে যাবেন কি না, সে প্রশ্নে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “বর্তমানে বাংলাদেশ বিমসটেকের সভাপতিত্ব করছে। ব্রিকস একটা বহুপক্ষীয় সংস্থা, যেখানে বাংলাদেশ অবশ্যই অংশগ্রহণ করতে আগ্রহী।

“সেই হিসেবে প্রধানমন্ত্রী সেটাতে অংশগ্রহণ করবেন কি, করবেন না, সেটা তার ব্যস্ততা, তার সময় বলে দেবে। সিদ্ধান্তটা উনাকেই নিতে হবে; উনার সময়সূচির ওপর নির্ভর করবে উনি যেতে পারবেন কি, পারবেন না।।”

‘অপরাধ ঢাকতে জঙ্গিবাদ সামনে আনে আওয়ামী লীগ’

দিল্লিতে শেখ হাসিনার অনুষ্ঠানে বাংলাদেশকে জঙ্গিবাদী রাষ্ট্র হিসাবে তুলে ধরার চেষ্টার প্রসঙ্গ টেনে করা এক প্রশ্নে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, “এটা হচ্ছে আওয়ামী লীগের পুরোনো একটা চরিত্র। শেখ হাসিনা যখন বাংলাদেশে ১৭ বছর ধরে দমন-পীড়ন করেছে, তখনও কিন্তু আওয়ামী লীগের সময়ে কোনো ঘটনা ঘটলেই এখানে একটা এক্সট্রিমিজম, টেররিজম—এই ধরনের একটা ন্যারেটিভ তৈরি করার চেষ্টা হয়েছে।

“তাদের খুন, গুম, তাদের এক্সট্রা-জুডিশিয়াল কিলিং, তাদের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড যখন যে সময়ে তারা করেছেন, সেগুলো যখন ঢাকার একটা সময় হয়েছে, তখন সেগুলো ঢাকার জন্য তারা এক্সট্রিমিজম নিয়ে এসেছেন, জঙ্গিবাদ নিয়ে এসেছেন। এই জঙ্গিবাদের তত্ত্বটা আওয়ামী লীগের পুরোনো নোংরা রাজনীতি।”

এখন বিদেশের মাটিতে বসে আওয়ামী লীগ ‘একই কায়দায় চেষ্টা চালাচ্ছে’ অভিযোগ করে তিনি বলেন, “সেটা এখন ভারত অনুমোদন করবে কি, করবে না, আবারও আমি বলতে চাই, আমি পুনারাবৃত্তি করছি, সেটা ভারত সরকারকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

“এবং এই জঙ্গিবাদের তত্ত্ব আন্তর্জাতিকভাবে, জাতীয়ভাবে—আওয়ামী লীগের সময়েও মানুষ এটা বিশ্বাস করে নাই, আন্তর্জাতিকভাবেও সেটা কেউ বিশ্বাস করে নাই, এখনও সেটা বিশ্বাস করার প্রশ্নই ওঠে না।”

প্রতিমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশে এখন জনগণের সমর্থিত, জনগণের দ্বারা নির্বাচিত একটি সরকার আছে, জনগণের দ্বারা নির্বাচিত একটি বিরোধী দল আছে। এখানে কোনোভাবেই জঙ্গিবাদের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। এটা আওয়ামী লীগের একটা পুরোনো তত্ত্ব, আন্তর্জাতিক মহলে মনোযোগ পাওয়ার জন্য এটা করা হচ্ছে।”

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের মুখে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার কথা শুনলে তা অত্যন্ত হাস্যকর একটা ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। যখন বিএনপি নেতা চৌধুরী আলম ও ইলিয়াস আলী এবং যুবদল নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ বহু লোককে গুম করেছিল, তখন মানবাধিকার কোথায় ছিল?

“হেলিকপ্টার দিয়ে ছোট ছোট বাচ্চাদেরকে গুলি করে হত্যা করেছিল (চব্বিশের) জুলাই-অগাস্ট মাসে, তখন মানবাধিকার কোথায় ছিল? সুতরাং এগুলো তো হাস্যকর ব্যাপার।”