• রোববার , ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আসিফ লুটেছে ১১ হাজার কোটি


প্রকাশিত: ৬:৫৫ পিএম, ১৩ সেপ্টেম্বর ২৬ , রোববার

নিউজটি পড়া হয়েছে ৫ বার

 

 

 

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এবং ঢাকা ওয়াসা, এলজিইডি ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনে কর্মকর্তা নিয়োগে মোট ১৮৭ কোটি টাকা লেনদেন, ৩৬ জন ডিসি পদায়নে ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও টেন্ডারে কমিশন নেওয়া এবং নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

 

 

আসিফের মানিলন্ডারিং ১১ হাজার কোটি

বিশেষ প্রতিনিধি : সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে বিদেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের নতুন অভিযোগ পাওয়ার কথা বলেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এবং ঢাকা ওয়াসা, এলজিইডি ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনে কর্মকর্তা নিয়োগে মোট ১৮৭ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগও করা হয়েছে।

এর বাইরে ৩৬ জন জেলা প্রশাসক বা ডিসি পদায়নে ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও টেন্ডারে কমিশন নেওয়া এবং নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। নতুন এসব অভিযোগ আসিফের বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক।রোববার দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান সংস্থাটির জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক তানজির আহমেদ।

তিনি বলেন, উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ, ডিসি পদায়ন, বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার, নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে আসিফের বিরুদ্ধে। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, সেতু নির্মাণ, সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার ও শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।

তানজির বলেন, বিদেশে ‘বিপুল অর্থ’ পাচার করে পর্তুগাল, দুবাই, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইস ব্যাংকে সম্পদ গড়ার অভিযোগ রয়েছে। আসিফের বাবা, এপিএস ও পিওর বিরুদ্ধেও ঠিকাদারি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ, ঘুষ লেনদেনে তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এসেছে। এটি নতুন অভিযোগ কিনা জানতে চাইলে তানজির বলেন, আসিফের বিরুদ্ধে আগে থেকেই একটি অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে। নতুন অভিযোগটি সেই চলমান অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করে খতিয়ে দেখা হবে।

আসিফের যত দুর্নীতি-

দুদকের নথি অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে আসিফের বিরুদ্ধে। সারা দেশে ৩৬ জন ডিসি পদায়নে ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগও করা হয়েছে।ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে টেন্ডার বাণিজ্যে আসিফের সম্পৃক্ততা এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনের সময় উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডারেও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ করা হয়েছে।

গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে ‘হাজার হাজার কোটি টাকা’ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে জাতীয় নাগরিক কমিটির (এনসিপি) এই নেতার বিরুদ্ধে ।আসিফের নিজ উপজেলা কুমিল্লার মুরাদনগরের জন্য গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দের বিষয়টি তুলে ধরে প্রকল্পের বরাদ্দ ও গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে অভিযোগে।

ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিকভাবে ব্যয় বাড়ানো এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে জুলাই আন্দোলনের সামনের সারি এই ছাত্রনেতার বিরুদ্ধে।যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে ‘কোটি কোটি টাকা’ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে আব্দুস সালামকে নিয়োগ দিয়ে ১০ কোটি টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।

এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ খানকে নিয়োগে ৫২ কোটি টাকা এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে আব্দুল লতিফ খানকে নিয়োগের বিনিময়ে ৬৫ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগের ৬০ কোটি টাকাসহ এই চার নিয়োগে অভিযোগের অঙ্ক দাঁড়ায় ১৮৭ কোটি টাকা।

হেলিকপ্টারে ভ্রমণ করে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয়ের অভিযোগও আনা হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা আসিফের বিরুদ্ধে।অভিযোগে বলা হয়েছে, আসিফ হোটেল ওয়েস্টিনসহ পাঁচ তারকা হোটেলে নিয়মিত যেতেন, বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে থাকতেন এবং দামি গাড়িতে চলাফেরা করতেন।চার দেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ দুদকের নথিতে দুর্নীতির অর্থ দিয়ে পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের ‘গ্রিন গ্রুপে’ বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ জমার অভিযোগ করা হয়েছে।

পাশাপাশি দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ রয়েছে। চার দেশের এসব অঙ্ক যোগ করলে মোট পরিমাণ দাঁড়ায় ১১ হাজার কোটি টাকা।অভিযোগে বলা হয়েছে, আসিফের দুই বোন জামাই ও এক ভাগ্নের মাধ্যমে বিদেশে কোটি কোটি টাকা পাচারের অভিযোগও রয়েছে।

তার বাবা বিল্লাল হোসেন ও এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ঠিকাদারদের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের ওপর প্রভাব খাটিয়ে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ করা হয়েছে। পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধেও ঘুষ লেনদেনে তদবির ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।দুদক বলছে, এসব অভিযোগ এখনও অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনও প্রমাণিত হয়নি।

যেভাবে অনুসন্ধান শুরু-
এর আগে ২ সেপ্টেম্বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে অনিয়মের অভিযোগে আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক অন্য তিনজন হলেন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, সাবেক যুগ্ম সচিব শেখ মোহাম্মদ জোবায়েদ হোসেন ও উপসচিব মো. মাসুম আহমেদ।

দুদকের উপপরিচালক মো. জাহিদ কালামকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি দল ওই অনুসন্ধান করছে। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে আসিফের দায়িত্বকালে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলির তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট নথিও চেয়েছে দুদক।

৯ সেপ্টেম্বর দুদক সচিব সাইদুর রহমান খান বলেন, আসিফের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগ যাচাই-বাছাইয়ে ‘আমলযোগ্য’ বিবেচিত হওয়ায় অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হয়েছে।তিনি বলেন, “অনুসন্ধান শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে চূড়ান্ত কিছু বলার সুযোগ নেই।”

আসিফ এর অস্বীকার-
আগের অভিযোগগুলো অস্বীকার করে ৯ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলন করেন আসিফ। তিনি দুদকের অনুসন্ধানকে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ ও রাজনৈতিকভাবে হয়রানির অংশ হিসেবে বর্ণনা করেন।

পদোন্নতি নিয়ে একটি অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ১৩৫ সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতির আদেশ হয়েছিল ২০২৬ সালের ১১ মে। তখন তিনি আর সরকারের দায়িত্বে ছিলেন না। ৩৮ কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিলের অভিযোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার দাবি, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের রায় বাস্তবায়ন করতে ১১২ কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিল করা হয়েছিল।

দুদকের উপপরিচালক আকতারুল ইসলামের ‘প্রাথমিক সত্যতা’ পাওয়ার বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবিতে পরে তাকে আইনি নোটিসও পাঠান আসিফ।আসিফ মাহমুদ ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব পান। পরে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পান। ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর তিনি উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগ করেন। পরে জাতীয় নাগরিক পার্টিতে যোগ দিয়ে দলটির মুখপাত্র হন।