• বুধবার , ৪ নভেম্বর ২০২৬

আন্দোলনের আড়ালে কোটি টাকার চাঁদাবাজি: পিবিআইর চার্জশিটে রিয়াদ চক্রের চাঞ্চল্যকর তথ্য


প্রকাশিত: ৮:০০ পিএম, ৩ নভেম্বর ২৬ , মঙ্গলবার

নিউজটি পড়া হয়েছে ৭ বার

 লাবণ্য চৌধুরী  : সাবেক নারী সংসদ সদস্য শাম্মী আহম্মেদের গুলশানের বাসায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক পরিচয় দিয়ে চাঁদাবাজির মামলায় আব্দুর রাজ্জাক বিন সোলাইমান ওরফে রিয়াদসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে ৩ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে আদালতে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র দাখিল করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন।
তদন্তে চাঁদাবাজির অর্থ ভাগাভাগি এবং আসামিদের বিপুল পরিমাণ গোপন সম্পদ ও অর্থ লেনদেনের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
পিবিআই-এর তদন্ত প্রতিবেদন এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের অপরাধ অনুসন্ধান শাখার তথ্য বিশ্লেষণ করে এই চক্রের চাঁদাবাজির অর্থের ব্যবহার ও নেপথ্য আদ্যোপান্ত তুলে ধরা হলো:
আদায়কৃত অর্থ ও মালামাল উদ্ধার
তদন্ত নথি ও আসামিদের জবানবন্দি অনুযায়ী, গুলশানের ওই বাসা থেকে ভয় দেখিয়ে আদায় করা নগদ ১০ লাখ টাকা আসামিরা নিজেদের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করে নেন। পরবর্তীতে পুলিশ ও তদন্তকারী সংস্থা আসামিদের গোপন আস্তানা থেকে নিম্নোক্ত মালামাল ও অর্থ উদ্ধার করে:
  • নগদ অর্থ: প্রধান আসামি আব্দুর রাজ্জাক রিয়াদের বাড্ডার বাসা থেকে চাঁদাবাজির ভাগে পাওয়া নগদ ২ লাখ ৯৮ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। অপর সহযোগী জানে আলম অপুর মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে নগদ ১৭ হাজার টাকা উদ্ধার হয়।
  • বিলাসবহুল বাইক ও গ্যাজেট: জানে আলম অপুর বাসা থেকে চাঁদাবাজির টাকায় কেনা একটি ইয়ামাহা এফজেড-এক্স মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়। এছাড়া আসামিদের হেফাজত থেকে আইফোন ১৩, আইফোন ১১ এবং রেডমি নোট ১০ প্রোসহ একাধিক দামি মুঠোফোন উদ্ধার করা হয়।
  • কোটি টাকার ব্যাংক চেক: রিয়াদের অন্য একটি আস্তানা থেকে ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা মূল্যমানের ৪টি ব্লাঙ্ক ব্যাংক চেক উদ্ধার করে ডিবি পুলিশ। তদন্তে দেখা যায়, চক্রটি কেবল এই একটি বাসা নয়, বরং ভয় দেখিয়ে অন্য এক সাবেক আওয়ামী লীগ এমপির কাছ থেকেও প্রায় ৫ কোটি টাকার সমপরিমাণ ব্যাংক চেক জিম্মি করেছিল।
  • সম্পদ বৃদ্ধি: অনুসন্ধানে দেখা যায়, রিয়াদের পারিবারিক আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত সাধারণ হলেও আন্দোলনের পরিচয় ব্যবহার করে রাতারাতি তিনি গ্রামের বাড়িতে বহুতল পাকা ভবন নির্মাণ শুরু করেন এবং বিলাসী জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন।
অপরাধের নেপথ্য কার্যপদ্ধতি
পিবিআই-এর তদন্তে আসামিদের অপরাধের সুনির্দিষ্ট কৌশল প্রমাণিত হয়েছে:
  1. পুলিশকে ব্যবহার করে ফাঁদ: প্রথমে গুলশান থানা পুলিশকে সাথে নিয়ে শাম্মী আহম্মেদের বাসায় অভিযানে যায় চক্রটি। সেখানে সংসদ সদস্যকে না পেয়ে ফেরার সময় বাসা থেকে একটি দামি ইয়ারপড নিয়ে আসেন তারা।
  2. গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে চাঁদা: পরদিন সকালে সেই ইয়ারপড ফেরত দেওয়ার বাহানায় তারা পুনরায় বাসায় প্রবেশ করেন। শাম্মী আহম্মেদের স্বামী সিদ্দিক আবু জাফরকে স্বৈরাচারের দোসর আখ্যা দিয়ে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে প্রথমে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় এবং পরে ১০ লাখ টাকা নগদ আদায় করা হয়।
  3. হাতেনাতে গ্রেপ্তার: বাকি ৪০ লাখ টাকা নিতে চক্রের সদস্যরা পুনরায় ওই বাসায় হানা দিলে বাড়ির মালিক কৌশলে পুলিশে খবর দেন। ঘটনাস্থল থেকে রিয়াদসহ ৫ জনকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে গুলশান থানা পুলিশ।
বর্তমান আইনি পরিস্থিতি
  • অভিযোগপত্র দাখিল: ৩ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই-এর উপপরিদর্শক ফিরোজ আহমেদ মুন্সী তদন্ত শেষ করে রিয়াদসহ ছয়জনের অপরাধের প্রমাণ পেয়ে আদালতে চার্জশিট জমা দেন।
  • আদালতের অবস্থান: মামলার প্রধান আসামি রিয়াদ আদালতে নিজের অপরাধ ও টাকার লোভের কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।
  • অন্যান্য অপরাধ: এই চাঁদাবাজির মামলার বাইরেও রিয়াদের বিরুদ্ধে ঢাকার প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটির এক শিক্ষার্থীকে সুইচ গিয়ার চাকু দিয়ে মুখমণ্ডল ও শরীরে গুরুতর আঘাত করে হত্যাচেষ্টা করার অভিযোগে গুলশান থানায় আরেকটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়, যেটিতেও তাকে পুলিশ রিমান্ডে নিয়েছিল।
রাষ্ট্রপক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি করা এই চক্রের বিরুদ্ধে সব তথ্যপ্রমাণ আদালতে উপস্থাপিত হয়েছে এবং আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।