সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আর্মিতে আধুনিকায়নের ডাক প্রধানমন্ত্রী
বিশেষ প্রতিনিধি, ঢাকা: আগামীর বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য ও অঙ্গীকার হবে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব এবং দেশের আত্মমর্যাদা সমুন্নত রাখা। পারস্পরিক সম্মান ও সমতার নীতি বজায় রেখে বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে চায় বাংলাদেশ।
সকালে সাভার সেনানিবাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৭টি ইউনিট ও রেজিমেন্টকে পেশাগত দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ জাতীয় পতাকা বা ‘ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব কথা বলেন। গুলশানের বাসভবন থেকে সাভার সেনানিবাসে পৌঁছালে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তাঁকে স্বাগত জানান। এরপর সেনাসদস্যদের একটি সুসজ্জিত দল প্রধানমন্ত্রীকে গার্ড অব অনার প্রদান করে।
চেইন অব কমান্ড ও সেনাবাহিনীর মূল শক্তি
একটি আধুনিক সশস্ত্র বাহিনীর মূল শক্তি শুধু তাদের আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র বা বিপুল জনবলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং সামরিক বাহিনীর প্রকৃত শক্তি গড়ে ওঠে সুদৃঢ় শৃঙ্খলা, পেশাগত দক্ষতা, যোগ্য নেতৃত্ব, নৈতিকতা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং সর্বোপরি জনগণের আস্থার ওপর ভিত্তি করে। চেইন অব কমান্ড বা আদেশানুক্রম বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করা সামরিক বাহিনীর অন্যতম প্রধান ভিত্তি। সরকার দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর, দক্ষ, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং আধুনিক একটি বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। দেশের সব স্তরের কর্মকর্তা ও সৈনিকদের সংবিধান, প্রচলিত আইন, সামরিক বিধিবিধান এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানানো হয়।
সশস্ত্র বাহিনীর গৌরবময় ইতিহাস ও জিয়াউর রহমানের ভূমিকা
অতীতে বিভিন্ন সময় সশস্ত্র বাহিনীর সুনাম ও পেশাদার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার নানামুখী অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল। তবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্ম ইতিহাস দেশের স্বাধীনতা ও গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরোচিত আক্রমণের বিরুদ্ধে বাঙালি সেনাসদস্যদের সশস্ত্র প্রতিরোধের ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবময়। চট্টগ্রাম অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের তৎকালীন উপ-অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক বিদ্রোহ ঘোষণার কথা স্মরণ করে বলা হয়, সেই সংকটময় মুহূর্তে বিদ্রোহ ঘোষণা করেই তিনি থেমে যাননি, বরং বাঙালি কর্মকর্তা ও জোয়ানদের একত্রিত করে সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হওয়ার চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁর দেওয়া স্বাধীনতার ঘোষণা দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে, যা বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে এক অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ী ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। দেশপ্রেমিক জনগণ সেনাবাহিনীর যেকোনো সাফল্যকে নিজেদের সাফল্য হিসেবেই গণ্য করে।
আধুনিক যুদ্ধকৌশল ও দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প উন্নয়ন
বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও পরিবর্তিত সামরিক পরিস্থিতিতে সমকালীন যুদ্ধকৌশল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বর্তমান যুগে কেবল প্রথাগত স্থল, জল বা আকাশপথের যুদ্ধই শেষ কথা নয়; বরং সাইবার স্পেসের নিরাপত্তা, ড্রোনের ব্যবহার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধকৌশল এখন জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য ও প্রধান অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে।
এই পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে যুগোপযোগী করার কাজ চলমান রয়েছে। বহির্বিশ্বের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব সামরিক প্রস্তুতিকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে দেশেই প্রয়োজনীয় অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনের লক্ষ্যে একটি শক্তিশালী দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে সরকার। একই সাথে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের সাথে তাল মিলিয়ে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর মধ্যে একটি সমন্বিত ও কার্যকর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলার তাগিদ দেওয়া হয়।
সেনাসদস্যদের কল্যাণ ও পেনশন সংস্কার উদ্যোগ
দেশের প্রতিরক্ষার পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও অগ্নিকাণ্ডের মতো যেকোনো জাতীয় জরুরি পরিস্থিতিতে এবং জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। সরকার সামরিক বাহিনীর সদস্যদের আবাসন, উন্নত চিকিৎসা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, পেশাগত উন্নয়ন এবং অবসর-পরবর্তী সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত আন্তরিকভাবে কাজ করছে।
ইতোমধ্যে জাতীয় পে-স্কেলের আওতায় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের বেতন-ভাতা একশ শতাংশ থেকে একশ আটত্রিশ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। এছাড়া অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্যদের জীবনযাত্রার মান আরও উন্নত এবং সুসংহত করার লক্ষ্যে ওয়ান র্যাংক ওয়ান পেনশন নীতিটি বাস্তবায়নের কাজ বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড লাভকারী ইউনিটসমূহ
অনুষ্ঠানে পেশাগত সাফল্য ও অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সেনাবাহিনীর ৯ম পদাতিক ডিভিশনের অধীনে থাকা মোট ৭টি ইউনিটকে প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড বা জাতীয় পতাকা তুলে দেওয়া হয়। এই সম্মাননা পাওয়া ইউনিটগুলো হলো:
- ৭ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি
- ৩২ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি
- ২৫ এয়ার ডিফেন্স রেজিমেন্ট
- ৯ ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়ন
- ৫৬ ইস্ট বেঙ্গল
- ৫৭ ইস্ট বেঙ্গল
- প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম শামছুল ইসলাম, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর হেলালসহ মন্ত্রিসভার সদস্য ও উপদেষ্টামণ্ডলী, নবম পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং ও সাভার এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল এস এম আসাদুল হক, কূটনৈতিক কোরের প্রতিনিধি এবং সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক ও বর্তমান ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।




